খোদাতায়ালার শোকর গুজারী করা মানবজাতির জন্য ওয়াজেব

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ শোকর কি?
বিজ্ঞাপন
'শোকর' আরবী শব্দ। ইহার আভিধানিক অর্থ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বা উপকারীর উপকার স্বীকার করা। ইসলামী পরিভাষায় শোকর হইলঃ খোদাতায়ালার প্রিয় ও পছন্দনীয় কার্যে খোদাপ্রদত্ত নেয়ামত সমূহ ব্যয় করা; মন, মুখ ও অংগ প্রত্যংগের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।
শোকর মানব হৃদয়ের উন্নত এক অবস্থা-যে অবস্থার প্রভাবে মানুষ নেয়ামতদাতা খোদাতায়ালাকে স্মরণ করে, ভালবাসে, মহব্বত করে এবং খোদার আদেশ ও নিষেধ মানিয়া চলিতে ব্রতী হয়।
খোদাতায়ালা আমাদেরকে অফুরন্ত নেয়ামত দান করিয়াছেন। আমাদের দেহ, দৈহিক অংগ-প্রত্যংগ, দেহস্থিত লতিফাসমূহ খোদার নেয়ামত। আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের গুণাগুণ খোদার দান বা অনুকম্পা। আমাদেরকে সৃষ্টি করিয়া নিজের সিফাতসমূহ থেকে আমাদেরকে চিন্তন, দর্শন, কল্পন, শ্রবণ, কথন, বর্ণন ইত্যাদি গুণাবলী দান করিয়াছেন। উক্ত সব গুণ দান না করিলে আমরা অচেতন জড় পদার্থের মত হইতাম।
বিজ্ঞাপন
সকল সৃষ্টি মানবজাতির কল্যাণে সৃষ্টঃ
আসমান জমীন ও তন্মধ্যস্থিত সবকিছু আল্লাহপাক মানুষের কল্যাণার্থে সৃষ্টি করিয়াছেন। রাতের চাঁদ, দিনের সূর্য, নদীর মাছ, গাছের ফল, বনের পশু, জমীনের শস্য, ভূগর্ভস্থ খনি-সবই মানুষের উপকারার্থে সৃষ্টি করা হইয়াছে।
হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব তাহার বোস্তায় বলেন, "হে মনুষ্যজাতী! তোমাদের কল্যাণেই আল্লাহ কাঁটার মাঝে ফুল, মৃগ নাভীতে কস্তুরী, মেশক খনিতে স্বর্ণ, বৃক্ষ ডালে পত্র তৈরী করিয়াছেন।” সমস্ত সৃষ্ট পদার্থই যে মানুষের কল্যাণে সৃষ্ট তাহা বুঝার সুবিধার্থে একটি উদাহরণ তুলিয়া ধরিতেছি। আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাত হয় চাউল থেকে। চাউল আসে ধান থেকে। এই ধান কিভাবে উৎপন্ন হয়? কৃষক জমিতে ধান বীজ বপন করে। উপযুক্ত এক পরিবেশে সেই বীজ অংকরিত হয়। বীজ অংকুরদগমনের জন্য প্রয়োজন হয় আলো, বাতাস, পানি ও মাটি। বীজ আলো পায় সূর্য থেকে, পানি পায় আকাশের মেঘ থেকে। আবার আকাশের মেঘ তৈরী হয় সাগরের পানি থেকে। সুতরাং দেখা গেল, সামান্য ধান বীজ অংকুরিত হইতে যেমন প্রয়োজন হয় আকাশের মেঘ, তেমনি প্রয়োজন হয় কোটি কোটি মাইল দূরে অবস্থিত সূর্যের। যে চাউল আমাদেরকে টিকাইয়া রাখে-সেই চাউল উৎপাদনে খোদাতায়ালার নির্দেশে সহোযোগিতা করে সূর্য, মেঘ, সাগর, পানি, মাটি ইত্যাদি। এই একটি মাত্র উদাহরণ লইয়া চিন্তা করিলেই ইহা বোধগম্য হয় যে, খোদাতায়ালা মানুষেরই কল্যাণার্থে এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করিয়াছেন।
বিজ্ঞাপন
প্রশ্ন জাগে-কেন আল্লাহতায়ালা কেবলমাত্র মানুষের জন্য সবকিছু সৃষ্টি করিলেন? ইহার পিছনে উদ্দেশ্য কি? আর কেনইবা তিনি মানুষ সৃষ্টি করিলেন?
মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে দেখা যায় যে, আল্লাহ বলেন,
كُنْتُ كَنْزًا مَّحْفِيًا فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَعْرَفَ فَخَلَقْتُ الْخَلْقَ لَأُعْرَفَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"আমি গুপ্ত ধনভান্ডারের ন্যায় ছিলাম। আমার পরিচিত হইতে বাসনা জাগিল। তাই সৃষ্ট জগত সৃষ্টি করিলাম।"
খোদাতায়ালা তদীয় পরিচয় দানের উদ্দেশ্যে পরিচয় গ্রহণের যাবতীয় যোগ্যতাসহ মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন।
মানুষ সৃষ্টির আরও একটি উদ্দেশ্য তিনি পবিত্র কুরআনে ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন,
বিজ্ঞাপন
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
অর্থাৎ- "আমি মানুষ ও জিনকে কেবলমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করিয়াছি।" (সূরা জারিয়াতঃ ৫৬)
সৃষ্টির এই দুইটি উদ্দেশ্য লইয়া চিন্তা করিলে বুঝা যায় যে, মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মোতাবেক ইবাদত করিয়া খোদাতায়ালার পরিচয় জ্ঞান অর্জন করুক-ইহাই খোদাতায়ালার ইচ্ছা। আর মানুষের ইবাদত কর্মে সহযোগিতা প্রদানের জন্যই আল্লাহ অপরাপর সৃষ্টসমূহ সৃষ্টি করিয়াছেন।
বিজ্ঞাপন
এক্ষেত্রে আমার জীবনের একটি ঘটনা তোমাদের বলি। একদা সকালের নাস্তা গ্রহণ কালীন সময়ে অর্থাৎ আনুমানিক নয় (৯) টার দিকে তোমাদের আম্মাজান আমাকে খাওয়ার জন্য একটি সুন্দর কলা আমার হাতে দেন। কলাটির সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ হইলাম। কলাটিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে কলা! কে তোমাকে এমন অপরূপ রূপে সৃষ্টি করিয়াছে? চমৎকার মনোমুগ্ধময় হালুয়া, হরিদ্রা বর্ণের কোমল আবরণে আবৃত। কোন্ মহান ব্যক্তির খোরাক হইয়া তুমি দুনিয়ায় আসিয়াছ? আমার প্রশ্নে কলাটি কাঁদিতে শুরু করিল। সে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলিল, মহান খোদাতায়ালা এই পৃথিবীতে মানুষ পাঠানোর পূর্বে পৃথিবীস্থিত গাছপালা, বৃক্ষলতার উদ্দেশ্যে বলিলেন, "হে দুনিয়ায় গাছ-বৃক্ষ, তরুলতা! আমার পেয়ারা সকল দুনিয়ার যাইবেন, বাণীবাহক নবী ও রাসূল (আঃ) গণ দুনিয়ায় তশরীফ রাখিবেন, আমার ওলীগণ দুনিয়ায় আমার গুণগান করিবেন, তাই তোমরা তাহাদের খেদমত করিবার জন্য প্রস্তুত হও, ফল ও ফুলে সুশোভিত হও। তোমাদের সেই উপাদেয় ফল-ফলাদি আহার করিয়া আমার পেয়ারা নবী রাসূল ও ওলীগণ আমার জেকের করিবে, আমাকে চিনিবার জন্য সাধনা করিবে, ইবাদতে মগ্ন থাকিবে। তোমাদের ফল-ফলাদি আহার করিলে তাহাদের দেহে যে কর্মশক্তি পয়দা হইবে- সেই শক্তি দ্বারা তাহারা আমার জেকের করিবে, ইবাদত করিবে; তাহারা জেকের করিবে জিহ্বা দ্বারা, দেল দ্বারা, এমন কি কোটি কোটি লতিফা দ্বারা। কাজেই তোমরা ফলবান হও।" খোদাতায়ালার সেই নির্দেশ আমরা যথাযথ পালন করিলাম। তাই আমগাছে আম, কলা গাছে কলা, কাঠাল গাছে কাঠাল আসিল; নারিকেল গাছ জলসত্রের ন্যায় মস্তকে পানি লইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। এই ধরণী ফুলে-ফলে সুশোভিত হইল।
কলা বলিল যে, আমাদের একান্ত বাসনা-আমরা আল্লাহর পেয়ারাদের আহার হইব: আল্লাহর বন্ধুদের খোরাক হইব। আমাদেরকে আহার পূর্বক তাহাদের দেহে যে শক্তি পয়দা হইবে-সেই শক্তি বলে তাহারা আল্লাহর আনুগত্য করিবে, জেকের করিবে। তাহাদের ইবাদত কর্মে-সামান্য হইলেও সাহায্য করিতে পারিব-ইহাই হইবে আমাদের পৌরুষত্ব।"
উপরে বর্ণিত কলার উক্তি থেকেও বুঝা যায় যে, আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্যই যাবতীয় নেয়ামত সৃষ্টি করিয়াছেন। অপরাপর সৃষ্টসমূহের সাহায্য সহযোগিতা লইয়া খোদাতায়ালাকে চিনিবার উদ্দেশ্যে মানুষ খোদার ইবাদত করিবে-ইহাই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার নিগুঢ় রহস্য।
বিজ্ঞাপন
ইমাম আল গাজ্জালী (রঃ) এই প্রসংগে চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত দেন। তিনি বলেন, কোন এক বাদশাহ তাহার জনৈক দুরবস্থাপন্ন গোলামের প্রতি কৃপা পরবশ হইলেন। গোলামটি অন্যের কুপরামর্শে বাদশাহ হইতে বহুদূরে অবস্থান করিতেছিল। বাদশাহ তাহার মূঢ়তা ও দুরবস্থার প্রতি দয়ার্দ্র হইয়া তাহার জন্য একটি অশ্ব এবং কিছু পাথেয় পাঠাইয়া দিলেন। উদ্দেশ্য এই যে, ভৃত্যটি রাজপ্রদত্ত এই অশ্ব ও পাথেয়কে বাদশার সান্নিধ্য লাভের উপকরণ মনে করিয়া তৎসাহায্যে বাদশাহের দরবারে আগমন পূর্বক তাহার সান্নিধ্য লাভ এবং উচ্চ সম্মান ও মর্যাদা লাভ করিবে। ভৃত্যটি দূরে থাকিলে কিংবা দরবারে আসিলে রাজার কোন লাভ বা লোকসান নাই। সে ফিরিয়া আসিলে রাজার রাজত্ব কিছু মাত্র বাড়িবে না, না আসিলেও কিছুমাত্র হ্রাস পাইবে না; বরং ফিরিয়া আসিলে ভৃত্যেরই মংগল হইবে। রাজসভায় প্রত্যাবর্তন করিয়া ভৃত্যটি উপকৃত হউক ও উচ্চ মর্যাদা প্রাপ্ত হউক-ইহাই বাদশার কাম্য। বাদশাহ দয়ালু হইলে তিনি সাধারণের উপকার ও মংগল সাধনেই আনন্দ পান। তাহার এই হিত কামনা প্রজাবৃন্দের জন্যই হইয়া থাকে। নিজের জন্য তিনি কিছুই করেন না। ভৃত্য যদি রাজ প্রদত্ত পাথেয় দ্রব্য ভোজনে শক্তি সঞ্চয় করিয়া তাহারই প্রদত্ত অশ্বে আরোহনপূর্বক বিপরীত দিকে যাত্রা করে এবং রাজ দরবার হইতে আরও দূরে চলিয়া যায়, তবে বুঝিতে হইবে যে, ভৃত্যটি রাজ প্রদত্ত নেয়ামতের অপব্যবহার করিয়া তাহার প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিল।"
উল্লিখিত এই রাজা-ভূত্যের রূপক কাহিনীর রাজা হইলেন স্বয়ং খোদাতায়ালা এবং ভৃত্য হইল মানুষ, অশ্ব হইল মানুষের দেহ এবং পাথেয় হইল আল্লাহর সৃষ্ট অগণিত নেয়ামত-যথাঃ বৃক্ষের ফল-ফলাদি, জমিনের শস্য, নদীর মাছ, আকাশের মিঠা পানি, বনের পশু, রাতের চাঁদ, দিবসের সূর্য ইত্যাদি। বান্দা মহা মহিম প্রতাপশালী বাদশাহের দরবারে পৌছিবার জন্যে অশ্বরূপী এই দেহের বাহনে চড়িয়া পাথেয়রূপী অসংখ্য নেয়ামতের সাহায্যে খোদার আনুগত্য করিবে: খোদাতায়ালার আদেশ পালন করিবে: নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বিরত থাকিবে-ইহাই যথার্থ শোকর বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। পক্ষান্তরে মানুষ যদি আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত ভোগ করিয়া নাফসের দাসত্ব করে, শয়তানের পায়রবী করে এবং আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়া যায়; তবে তাহা হইবে তাহার "না-শোকরি" বা অকৃতজ্ঞতা। কিন্তু শোকর করা বা না-শোকরি করা মানুষের ইচ্ছাধীন। আল্লাহপাক বলেন,
إِنَّا هَدَيْنَهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَ إِمَّا كَفُورًا
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-'অবশ্যই আমি মানুষকে পথ দেখাইয়া দিয়াছি- চাই সে কৃতজ্ঞ (বা শোকরকারী) হউক; কিংবা না-শোকর বা কাফের হউক।' (সূরা দাহরঃ আয়াত-৩)
খোদাতায়ালার শোকর গুজারী করা মানবজাতির জন্য ওয়াজেবঃ
বুজর্গানে দীন খোদার শোকরগুজারী করাকে ওয়াজেব বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, জানা আবশ্যক যে, আল্লাহতায়ালা শর্তবিহীন যাবতীয় প্রকারের নেয়ামত প্রদানকারী। যদি অস্তিত্ব বলা যায়-তাহাও তাহার দান। যদি স্থায়িত্ব বলা যায়-তাহাও তাহারই প্রদত্ত এবং যদি গুণাবলী বলা হয়-তাহাও তাহারই রহমত হইতে উদ্ভূত। জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, দর্শনশক্তি, শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি সবই আল্লাহর পবিত্র জাত হইতে আহরিত। বিভিন্ন প্রকারের নেয়ামত ও বিভিন্ন ধরণের দান-যাহা সীমা ও গণনার বহির্ভূত-তাহা সবই তাহার পবিত্র জাত হইতে বর্ষিত। কষ্ট ও কাঠিন্য-তিনিই অপসারিত করেন। দু'আ ও প্রার্থনা তিনিই কবুল করেন এবং বিপদ-আপদ তিনিই বিদূরিত করেন। তিনি এমন রাজ্জাক বা প্রচুর আহার্য সামগ্রী প্রদানকারী যে, পাপের কারণে স্বীয় বান্দাগণের রেজেক বা আহার বন্ধ করেন না। তিনি ছাত্তার বা কলংক ও ত্রুটি গোপনকারী; ক্ষমার প্রাচুর্য হেতু বান্দাগণের পাপের কারণে-তাহাদের ইজ্জত সম্মান বিনষ্ট করেন না। তিনি হালীম বা এমন গাম্ভীর্যময় যে, কাহারও ত্রুটির কারণে তাহাকে অবিলম্বে শাস্তি প্রদান করেন না। তিনি করীম বা অনুগ্রহকারী, তাহার সাধারণ অনুগ্রহ হইতে শক্রমিত্র কেহই বঞ্চিত হয় না। তাহার সর্বশ্রেষ্ঠ ও উচ্চ অনুগ্রহ-ইসলামের প্রতি আহবান এবং বেহেশতের দিকে পথ প্রদর্শন ও হযরত রাসুলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণের প্রতি নির্দেশ প্রদান। যেহেতু চিরস্থায়ী জীবন লাভ ও অনন্ত সুখ-শান্তি উপভোগ এবং আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাত লাভ-ইহারই উপর নির্ভরশীল। ফল কথাঃ আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ ও নে'মাত ভাস্কর হইতেও প্রকাশ্য ও শশধর থেকেও উজ্জল। অন্য সকলের অবদান আল্লাহতায়ালার ক্ষমতা প্রদান হইতে হইয়া থাকে। ইহাতে সন্দেহ নাই যে, জ্ঞানের স্বতঃসিদ্ধতা নেয়ামত দাতার শোকর বা কৃতজ্ঞতা পালন ওয়াজেব বলিয়া নির্দেশ প্রদান করে এবং তাহার সম্মান রক্ষা অনিবার্য বলিয়া জানে।" (মকতুব নং-১৭, তৃতীয় খন্ড)।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালাও পাক কুরআনে বার বার তদীয় শোকর গুজারী করার জন্য মানুষের প্রতি নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। তিনি ঘোষণা করেন,
وَ كُنْ مِّنَ الشَّكِرِينَ
অর্থাৎ-“এবং তোমরা কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হও।" (সূরা আরাফ, আয়াতঃ ১৪৪) আল্লাহ আরও বলেন,
বিজ্ঞাপন
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنكُمْ
وَاشْكُرُوا لِلَّهِ
অর্থাৎ-“হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুজী দান করিয়াছি, তন্মধ্যে পবিত্র বস্তু সমূহ হইতে তোমরা ভক্ষণ কর এবং আল্লাহর শোকর কর।" (সূরা বাকারাহ, আয়াতঃ ১৭২) তিনি আরও ঘোষণা করেন,
فَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَلاً طَيِّبًا وَاشْكُرُوا نِعْمَتَ
اللَّهِ إِنْ كُنْ تُمْ إِنَّاهُ تَعْبُدُونَ
অর্থাৎ- "সুতরাং আল্লাহপাক তোমাদের জন্যে যে হালাল ও পবিত্র জিনিস রেজেক হিসাবে রাখিয়াছেন-এই গুলো আহার কর এবং তাহার নেয়ামতের শোকর আদায় কর; যদি তোমরা তাহারই ইবাদত বন্দেগী করিয়া থাক।" (সূরা নাহল, আয়াতঃ ১১৪)
শরীয়তের অনুশীলনে শোকরগুজারীর যথার্থতা নিহিতঃ
খোদাপ্রদত্ত নেয়ামতের শোকর করা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু কিভাবে খোদার শোকর গুজারী করা যায়? খোদাতায়ালা আমাদের বুঝাবুঝির জ্ঞানের বাহিরে। আমরা যাহা কিছু চিন্তা করি, ধারণা করি-খোদা তাহা থেকে পবিত্র। সেই অবর্ণনীয়, অবোধ্যগম্য খোদাতায়ালার শোকর গুজারী করার উপায়ই বা কি?
মহান খোদাতায়ালাই আমাদেরকে সেই পথ নির্দেশনা দান করিয়াছেন। শোকরিয়া আদায়ের নিমিত্তে খোদা প্রদত্ত সেই বিধানই হইল শরীয়ত। আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামত কোন পথে ও কোন কার্যে ব্যবহার করিলে তিনি সন্তুষ্ট হইবেন অথবা অসন্তুষ্ট হইবেন-তাহা বিস্তারিত ভাবে শরীয়ত (জাহেরী ও বাতেনী) এর বিধানে সন্নিবেশিত আছে। তবে কেবলমাত্র জাহেরী শরীয়তের অনুশীলনে শোকরের হক তেমন আদায় হইবে না; ইহার জন্য বাতেনী শরীয়তের অনুশীলনও প্রয়োজন। তবেই খোদাতায়ালার পছন্দনীয় কার্যে খোদাপ্রদত্ত নেয়ামতের ব্যবহার করিয়া শোকর বা কৃতজ্ঞতার পূর্ণ হক আদায় করা সম্ভব হইবে। আল্লাহপাক ঘোষণা করেন,
بَلِ اللَّهَ فَاعْبُدْ وَ كُنْ مِّنَ الشَّكِرِينَ
অর্থাৎ-"অতঃপর তোমরা কেবলমাত্র আল্লাহপাকের বন্দেগী (জাহের ও বাতেনী) কর এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হও।” (সূরা যুমার, আয়াতঃ ৬৬)
শোকরের প্রকারভেদ ও স্তর সমূহঃ
আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের যেমন শেষ নাই, তেমনি শোকর আদায়েরও সীমা-পরিসীমা নাই।
আংগিক শোকরঃ
দেহ এবং দৈহিক অংগ প্রত্যংগ সমূহ খোদাতায়ালার নেয়ামত। এই সকল অংগ প্রত্যংগের মাধ্যমে শোকর গোজারী করাকে আংগিক শোকর বলা হয়। যেমন চক্ষু এক বিশেষ অংগ। এই চক্ষুর সাহায্যে খোদাতায়ালার সৃষ্টি নৈপুণ্য এবং শিল্প ও কারুকার্যকে উপলব্ধি করিয়া খোদার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব সম্পর্কে দেলে অনুভূতি জাগ্রত করাই চক্ষুর শোকর। চোখের সাহায্যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু বা ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ না-শোকরীর নামান্তর। হযরত শেখ সাদী (রঃ) বলেন, "তোমার চোখদ্বয়, ভ্রুযুগল আল্লাহর বিশেষ দান। ইহা এই জন্য নয় যে, তুমি বেগানা নারীকে এগানা বানাইবে।"
জবানী শোকরঃ
জবান আল্লাহতায়ালার আর এক অমূল্য দান। ইহার মাধ্যমে আমরা আমাদের মনের ভাবকে প্রকাশ করি। জবানের শোকরও আদায় করিতে হয়। জবানের মাধ্যমে খোদার মহিমা কীর্তন করা, গুণগান করা বা জেকের করাই জবানী শোকর। মিথ্যা বলা, গীবত করা, নিন্দাবাদ করা, ঝগড়া বিবাদ করা ইত্যাদি নিষিদ্ধ কাজ করার অর্থই জবানের না-শোকরী করা। মহাকবি হাফেজ বলেন,
"যে দিল করুণা করি রসনা লোলিত
কেন নাহি গাও তার মহিমার গীত।"
অর্থাৎ-'যিনি তোমাকে এমন চমৎকার এক জবান তৈরী করিয়া দিলেন-সেই জবান দিয়া তাহাকে ডাকা কি তোমার উচিৎ নয়?'
কালবী শোকরঃ
কালব খোদাপ্রদত্ত আর এক বিশেষ নেয়ামত। কালব বা হৃদয়কে নাফস ও শয়তানের প্রভাব মুক্ত রাখা, হৃদয়ে 'আল্লাহ' নাম অংকিত করা এবং জেকেরে কালবী হাছিল করাই কালবী শোকর। আল্লাহ ভিন্ন অপরাপর সবকিছুর মহব্বত দেল থেকে সম্পূর্ণ ঝাড়িয়া ফেলাও কালবী শোকরের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহতায়ালা বার বার আংগিক শোকর আদায়ের প্রতি তাগিদ দিয়াছেন। পাক কুরআনে তিনি ঘোষণা করেন,
وَ اللهُ اَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُون أمَّهتكُمْ لاَ تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَ جَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْءِدَةَ
لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
অর্থাৎ- "আল্লাহপাক তোমাদেরকে মায়েদের উদর থেকে বাহির করিয়াছেন, যখন তোমরা কিছুই জানিতে না। তাহার পর তোমাদের জন্য শ্রবণেন্দ্রিয়, দর্শনেন্দ্রিয় ও দেলের ব্যবস্থা করিয়াছেন যেন তোমরা যথার্থভাবে শোকর আদায় করিতে পার।" (সূরা নাহলঃ আয়াতঃ ৭৮)
চক্ষু কর্ণ ও দেল সহ অন্যান্য ইন্দ্রিয় ও অংগ-প্রত্যংগকে খোদাতায়ালার আদিষ্ট কাজে নিয়োজিত রাখা এবং নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বিরত রাখা প্রত্যেকের জন্য ওয়াজেব। আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সাজে অংগ প্রত্যংগ সমূহ সজ্জিত করাই আংগিক শোকর।
বিত্তের শোকরঃ
আল্লাহপ্রদত্ত আর এক নেয়ামত বিত্ত বা ধন-সম্পদ। ধনসম্পদ তখনই নেয়ামত হিসাবে বিবেচিত হয়-যখন ইহার যথাযথ শোকর আদায় করা হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন সম্পদ থেকে গরীব-দুঃখী, দুস্থ ও অভাবগ্রস্থদের দান করা ধন দৌলতের শোকর বলা হয়। ধন সম্পদের শোকর আদায়ের বহু তাগিদ কুরআন মজীদে আছে। যেমন আল্লাহ ঘোষণা করেন,
فَكُلُوا مِنْهَا وَ أَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ
অর্থাৎ-"তোমরা (এই সকল জন্তু জানোয়ারের গোশত) ভক্ষণ কর এবং অন্যান্যকেও ভক্ষণ করাও যাহারা একান্ত দুস্থ ও অসহায়। এই ভাবেই আমি এই সকল জানোয়ারকে তোমাদের অধীনস্থ করিয়া দিয়াছি যেন তোমরা শোকর আদায় করিতে পার।" (সূরা হাজ্জ, আয়াতঃ ৩৬)
নিজেদের ধন সম্পদ থেকে গরীব দুঃখীদের দান করা অতি উত্তম কাজ। আল্লাহতায়ালা ইহাকে 'কর্জে হাছানা' বলিয়া পাক কালামে উল্লেখ করিয়াছেন। আল্লাহপাক ঘোষণা করেন,
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا
অর্থাৎ- "এমন কে আছে যে আল্লাহকে 'কর্জে হাসানা' বা উত্তম ঋণ দান করিবে?" (সূরা বাকারাহঃ আয়াত নং ২৪৫) অপর এক আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন,
وَ أَقْرَضُوا اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا يُضْعَفُ لَهُم
অর্থাৎ-"এবং যাহারা আল্লাহকে 'কর্জে হাসানা' দেয় তাহাদিগকে বাড়াইয়া দেওয়া হইবে বহুগুণে।" (সূরা হাদীদঃ আয়াত নং ১৮)
দুস্থ ও অসহায়কে দান করা, অভাবীর অভাব মোচন করা, দুঃখীর দুঃখ মোচন করা, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান, পিপাসার্তকে পানি দান ইত্যাদি কাজ কর্জে হাসানার অন্তর্ভুক্ত।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছেঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করিবেন, হে আদম সন্তান! আমি যখন রুগ্ন ছিলাম, তখন তোমরা আমার সেবাযত্ন কর নাই। বান্দা বলিবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! তুমি তো সারা জাহানের প্রতিপালক। আমি তোমার সেবাযত্ন কিভাবে করিব? আল্লাহ বলিবেন, তবে কি তুমি জানিতে না, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হইয়াছিল? তুমি তাহাকে সেবা যত্ন কর নাই। যদি তাহার সেবাযত্ন করিতে, তাহা হইলে আমাকে অবশ্যই তাহার নিকট পাইতে। আবার আল্লাহপাক বলিবেন, হে আদম সন্তান! আমি তোমার নিকট আহার চাহিয়াছিলাম, তুমি আমাকে তাহা দাও নাই। বান্দাহ আরজ করিবে, হে পাক পরওয়ারদিগার! তুমি তো বিশ্ব জাহানের মালিক! আমি তোমাকে কেমন করিয়া আহার দান করিব? আল্লাহ বলিবেন, তোমার কি জানা নাই, আমার অমুক বান্দা তোমার নিকট আহার্য চাহিয়াছিল? তুমি তাহাকে আহার দাও নাই। যদি তুমি তাহাকে খাবার দিতে, তাহা হইলে তাহার বিনিময় তুমি আজ আমার নিকট পাইতে। পুনর্বার আল্লাহপাক বলিবেন, হে আদম সন্তান! আমি তোমার নিকট পানি চাহিয়াছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করাও নাই। বান্দা বলিবে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি হইলে সমগ্র জগতের পরওয়ারদিগার! আমি তোমাকে কেমন করিয়া পানি পান করাই? আল্লাহ বলিবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার নিকট পানি চাহিয়াছিল, তুমি তাহাকে পানি পান করাও নাই। যদি তুমি তাহাকে পানি দিতে, তাহা হইলে আজ আমার কাছে ইহার উত্তম বিনিময় পাইতে। (সহীহ মুসলিম শরীফ)
আংগিক শোকর, কালবী শোকর, জবানী শোকর ও বিত্তের শোকর সম্পর্কে যাহা কিছু ব্যক্ত হইল-তাহা সবই শোকর বা কৃতজ্ঞতার প্রাথমিক স্তর। শোকরের আরও দুইটি স্তর আছে।
শোকরের দ্বিতীয় ও উন্নত স্তরঃ
শোকরের উন্নত পর্যায়ের গুণ অর্জিত হয় তাজাল্লীয়াতে আয়ালের নূরে সিফাতে এজাফিয়ার জগতে। সিফাতে এজাফিয়ার জগতে আল্লাহপাকের সিফাতযুক্ত বা গুণবিশিষ্ট বহু নাম আছে। যেমন, খালেক, মালেক, রহমান, রহীম ইত্যাদি। শাকের (বা কৃতজ্ঞ) আল্লাহপাকের একটি গুণবিশিষ্ট নাম-যাহা সিফাতে এজাফিয়াতে বর্তমান। যেমন আল্লাহপাক বলেন,
وَ اللَّهُ شَكُورٌ حَلِيمٌ
অর্থাৎ-'এবং আল্লাহ অত্যন্ত শোকরগুজার (কৃতজ্ঞ), অত্যন্ত সহনশীল।' (সূরা তাগ্বাবুনঃ ১৭)
বেলায়েত ছোগরাস্থিত সাধকের উপর অন্যান্য সিফাতে এজাফিয়ার সহিত শোকর সিফাতের নূরও আসিতে থাকে। সেই নূরে সাধকের চরিত্র পরিবর্তিত হইয়া খোদাতায়ালার গুণে গুণান্বিত হইতে থাকে। বহু মূল্যবান গুণাবলীর মধ্যে শোকরের গুণও সে লাভ করে এবং নিজের দেহ ও দেহস্থিত প্রত্যেক অণু পরমাণুতে আল্লাহ নাম অংকিত করিয়া এবং আল্লাহ নামের স্পন্দন সৃষ্টি করিয়া খোদাপ্রদত্ত নেয়ামতের শোকর গুজারী করে। এই অবস্থায় সাধকের দেহের আগুন পানি, মাটি, বাতাস-জড় জগতস্থিত আগুন, পানি, মাটি, বাতাসের সহিত মিশিয়া অসংখ্য কোটি মুখে আল্লাহ আল্লাহ জেকের করিয়া খোদার নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করে। শোকরের এই স্তরের গুণ সমৃদ্ধ সাধক আল্লাহপাকের বন্ধুত্বের মর্যাদা প্রাপ্ত হয়।
শোকরের তৃতীয় ও শ্রেষ্ঠতম স্তরঃ
শোকরের শ্রেষ্ঠতম স্তরের গুণ সাধক অর্জন করে মারেফাতের মূল কারখানায় সিফাতে হাকীকীর নূর ও জাতি নূরের মাধ্যমে। মূল মারেফাত কারখানায় বেলায়েতে উলিয়া
ও কামালাতে নবুয়ত নামক দুইটি দায়েরা আছে। বেলায়েতে উলিয়াতে জাত মিশ্রিত সিফাতি নূর এবং কামালাতে নবুয়তে জাতি নূরের কারেন্ট পাওয়া যায়। দায়েরায়ে কামালাতে নবুয়তে প্রাপ্ত জাতি নূরের অবিরাম প্রবাহে সাধকের দেহস্থিত উপাদান আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস পরিপূর্ণ পবিত্রতা লাভে সক্ষম হয়। এই স্তরের সাধকের ভিতর ও বাহির-সবই পবিত্র হয়। পবিত্র সে সাধক তাকওয়ার প্রভাবে যেমন ক্রন্দন করে, তেমনি শোকরের প্রভাবেও অশ্রুপাত করে। শোকরের এই উচ্চতম অবস্থার গুণে গুণী ছিলেন, নবী রাসূল (আঃ) গণ ও উচ্চস্তরের ওলী আল্লাহ সকল।
শোকরের উচ্চ স্তরের গুণ অর্জনকারীর হালঃ
রাসূলে পাক (সাঃ) এর মধ্যে শোকরের উচ্চ স্তরের গুণ পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। নিম্নের ঘটনা থেকে যার কিঞ্চিত প্রমাণ মিলে।
হযরত আতা (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেনঃ একদিন আমি উম্মুল মো'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) ছাহেবার সমীপে নিবেদন করিলাম-হে উম্মুল মুমিনীন! হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর বিস্ময়কর ও অলৌকিক অবস্থা সমূহের যৎকিঞ্চিত বিবরণ দান করুন। ইহা শুনিয়া তিনি রোদন করিতে লাগিলেন। কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন, রাসূলে পাক (সাঃ) এর যাবতীয় অবস্থাই আশ্চর্যজনক এবং অলৌকিক। পুনরায় তিনি বলিতে লাগিলেন, এক রজনীতে তিনি আমার সংগে শয়ন করিবার উদ্দেশ্য আমার গৃহে আসিয়া আমার বিছানায় শুইয়া পড়িলেন। তাহার পবিত্র ও জ্যোতির্ময় দেহখানি আমার দেহের সহিত সংলগ্নও হইল। কিন্তু হঠাৎ তিনি শয্যা হইতে গাত্রোত্থান পূর্বক বলিলেনঃ হে আয়েশা! আমাকে মুক্তি দাও, আমি আপন প্রভুর ইবাদত করিতে যাই। আমি নিবেদন করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদিও আমার প্রবল ইচ্ছা এই যে, আপনার পবিত্র সংসর্গে আরও কিছু সময় অতিবাহিত করি। তথাপি আমি আপনাকে আল্লাহতায়ালার ইবাদত কার্যে বাধা দিব না। আপনি গমন করুন। অতঃপর তিনি শয্যা ত্যাগ পূর্বক মশক হইতে পানি লইয়া অযু করিয়া নামাজে দন্ডায়মান হইলেন। নামাজে তিনি প্রচুর কাঁদিলেন।
কান্নাকাটির মধ্যেই রজনী প্রভাত হইল। ফজরের নামাজের সময় হযরত বেলাল (রাঃ) তাহাকে নামাজে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করিলেন। তখন রাসূলে পাক (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আল্লাহতায়ালা আপনার সমস্ত গুনাহতো ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন। আপনি নিস্পাপ, তথাপি আপনি এমন রোদন করিতেছেন কেন? উত্তরে তিনি প্রতি শোকর গোজারী না করি? আমি কেমন করিয়া কান্না সংবরণ বলিলেন, আয়েশা! তুমি কি বলিতে চাও যে, আমি আল্লাহতায়ালার করিতে পারি! নিম্মোক্ত এই আয়াতটি আমারই উপর অবতীর্ণ হইয়াছে।
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ الَّيْلِ وَ النَّهَارِ لَيْتَ لأُولِي الأَلْبَابِ الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قيمًا وَقُعُوداً وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ
অর্থাৎ-"নিশ্চয়ই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টির মধ্যে এবং দিবা-রাত্রি পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানবান লোকদের জন্য জ্বলন্ত প্রমাণসমূহ বিদ্যমান রহিয়াছে। যাহারা দাঁড়াইয়া, বসিয়া এবং পার্শ্বোপরি শয়ন করিয়া আল্লাহতায়ালার জেকের করিয়া থাকে। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৯০-১৯১)
অর্থাৎ-"সেই সমস্ত লোকই বুদ্ধিমান যাহারা দাঁড়াইয়া, বসিয়া ও শয়ন করিয়া তথা সকল অবস্থায় আল্লাহতায়ালার কার্যাবলী ও গুণাবলীর স্মরণে ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকে এবং পৃথিবী ও আকাশের বিচিত্র ক্রিয়া কৌশল নিরীক্ষণ করে ও ধ্যান করে এবং মর্যাদা লাভের আনন্দে রোদন করে।” দেখ আয়েশা! বিশ্ব জগতের প্রত্যেকটি অণু-পরমাণু আল্লাহতায়ালার অপার অনুগ্রহে পরিপূর্ণ। ইহা দেখিয়া আমি কি রোদন না করিয়া থাকিতে পারি? সৃষ্টি জগতের প্রত্যেকটি পদার্থে স্রষ্টার বিচিত্র সৃষ্টি কৌশল দর্শন করিলে তাহার অপার ভক্তি অন্তরের মধ্যে উদ্বেলিত হইয়া ওঠে। প্রত্যেক পদার্থে তাহার অসীম অনুগ্রহের চিহ্ন দর্শন করিলে কৃতজ্ঞতায় বা শোকরের প্রভাবে আনন্দাশ্রু আপনাতেই ঝরিতে থাকে। এই রোদন, এই ক্রন্দন আনন্দের-ভয়ের নহে।"
কিতাবে দেখা যায়ঃ একদা একজন পয়গম্বর একখন্ড ছোট পাথরের পার্শ্ব দিয়া কোথাও যাইতেছিলেন। দেখিলেন, পাথরের গাত্র হইতে পানি ঝরিতেছে। ইহা দেখিয়া তিনি খুবই আশ্চর্য হন। এমন সময়ে আল্লাহর কুদরতে পাথরের বাকশক্তি আসিল। পয়গম্বর (আঃ) পাথরটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার এই অবস্থা কেন? পাথর বলিল, যেইদিন আমি এই কথাটি শুনিলাম যে, দোযখের আগুনের ইন্ধন হইবে মানুষ করিতেছি। পয়গম্বর (আঃ) পাথরের মুখে রোদনের কারণ শুনিয়া তাহার ও পাথর: আমি সেইদিন হইতে ভয়ে আল্লাহর দরবারে রোনাজারী মুক্তির জন্য খোদার দরবারে দু'আ করিলেন। আল্লাহতায়ালা স্বীয় নবীর দু'আ কবুল করিলেন। পাথরটি মুক্তি পাইল। আল্লাহর নবী খুশী হইয়া সেই স্থান ত্যাগ করিলেন।
আর একদিন ঘটনাক্রমে পয়গম্বর পূর্বের সেই রাস্তা দিয়া কোথাও যাইতে সময় দেখিলেন, সেই পাথরটি পূর্বাপেক্ষা অধিক পরিমানে অশ্রুপাত করিতেছে। এইবার আর তাহার রহস্যের সীমা রহিল না। পাথরটিকে পুনরায় তাহার রোদনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। আজও আল্লাহতায়ালা পাথরের জবান খুলিয়া দিলেন। পাথর বলিল, হে আল্লাহর নবী (আঃ)! ঐদিন যে আপনি আমাকে কাঁদিতে দেখিয়াছিলেন, আমার সে কান্না ছিল আল্লাহতায়ালার ভয়ে এবং আমার নিজের চিন্তায়। কিন্তু আজ আমার এই কান্না শোকর বা কৃতজ্ঞতার কান্না; ভয়ের কান্না নহে।
শোকরের মধ্যম ও উচ্চ পর্যায়ের গুণ অর্জনকারী সাধক বিপদে আপদে বালা-মুছিবতেও খোদার শোকর আদায় করেন। কারণ, তাহারা জানেনঃ
★ খোদাতায়ালা বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবতের মাধ্যমে বান্দার পাপরাশিকে ঝারিয়া ফেলেন।
★ বিপদের মাধ্যমে বান্দার ঈমান দৃঢ় করেন।
★ দুনিয়ায় বিপদ-আপদে ফেলাইয়া বান্দার পারলৌকিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
হাদীসে বর্ণিত আছেঃ বেহেশতের মধ্যে মর্যাদার তারতম্যানুসারে আবাসস্থলের বহু শ্রেণীভেদ আছে। তন্মধ্যে কতকগুলো এত উন্নত ও উচ্চ পর্যায়ভুক্ত যে মানুষ স্বীয় সাধনা ও পরিশ্রমের বলে সে সমস্ত স্থান লাভ করার উপযোগী হইবে না। তবে করুণাময় আল্লাহতায়ালা নিজ প্রিয় বান্দাগণকে বিপদের মাঝে ফেলিয়া আকর্ষণ করতঃ তদ্রুপ স্থানে উন্নীত হওয়ার উপযোগী করিয়া থাকেন।
তবে এই স্তরের শাকের বা কৃতজ্ঞদের সংখ্যা খুবই কম। তাই আল্লাহপাক বলেন,
وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِي الشَّكُورُ
অর্থাৎ-"আমার বান্দাগণের মধ্যে অতি অল্প সংখ্যক লোকই শোকরকারী।" (সূরা সাবাঃ আয়াত নং ১৩)
যারা শোকরকারী বা শাকের তাহাদের বিনিময় সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, অবশ্যই কৃতজ্ঞ বান্দা বা শাকেরদের বিনিময় প্রদান করিব। (সূরা আলে ইমরান)
সকল নবী-রাসূল ও ওলীয়ে কামেল শোকরের উচ্চ পর্যায়ের গুণে গুণী ছিলেন। আমার পীর কেবলাজানও একজন উচ্চস্তরের শাকের বা (কৃতজ্ঞ ব্যক্তি) ছিলেন। কিন্তু আমি আল্লাহর নেয়ামতের যথাযথ শোকর আদায় করিতে পারি নাই। তাই মাঝে মাঝে নিশীথে খোদাতায়ালার শাহী দরবারে রোদন করি। বলি, হে খোদা! আজ বিরাশি বছর যাবৎ তুমি আমাকে খাওয়াইতেছ, কত কি নেয়ামত দান করিতেছ, কিন্তু এই জীবনে একটি সেজদাওতো মন মত করিতে পারি নাই। আমার মনে হয়, একটি সেজদাও তোমার দরবারে কবুল হয় নাই। আমাকে তুমি ক্ষমা কর। হে খোদা! আমার পীর কেবলাজান আমাকে তোমার রাস্তার মোসাফির হিসেবে রাখিয়া গিয়াছেন। তুমি তোমার এই একজন মাত্র নাদান মোসাফিরকে খাওয়ানোর জন্য আরও কত হাজার হাজার লোককে খাওয়াইতেছ, কিন্তু আমি নাদান সেই অফুরন্ত নেয়ামতের সামান্য মাত্রও শোকর আদায় করিতে পারিলাম না। আমাকে দয়া করিয়া তুমি মাফ কর।" এমনিভাবে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করিয়া খোদার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা চাই।
হে জাকেরান ও আশেকানসকল! তোমরা শোকরের সংজ্ঞা, তাৎপর্য, ফজিলত এবং যোগ্য শাকেরদের মর্যাদা সম্পর্কে কিছু বুঝিতে পারিলে। তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে চাও, তবে শোকরের গুণ অর্জনের চেষ্টা কর। খোদাপ্রাপ্তির পথে তওবা, যোহদ, তাকওয়া ও ছবরের মত শোকরের গুণও একান্ত প্রয়োজন। তোমরা চেষ্টা কর যেন শোকরের শ্রেষ্টতম গুণ অর্জন করিতে পার। আল্লাহতায়ালা তোমাদের দয়া করুন। আমীন!








