Logo

খোদাতালাশী খোদার হাতে মুর্দার মত পড়িয়া থাকে

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২১:২৩
খোদাতালাশী খোদার হাতে মুর্দার মত পড়িয়া থাকে
ছবি: সংগৃহীত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ তাওয়াক্কুল ও ইহার শর্তাবলীঃ

বিজ্ঞাপন

"তাওয়াক্কুল" আরবী শব্দ। ইহার আভিধানিক অর্থ ভরসা করা। ইসলামী পরিভাষায় সর্ববিধ কাজ ও অবস্থায় খোদাতায়ালার উপর ভরসা করাই তাওয়াক্কুল। তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ-ভরসার কতকগুলো শর্ত আছে। যথাঃ

* উদ্দেশ্য সাধনে চেষ্টা-তদবীর করা বা উপায় অবলম্বন করা।

* আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি, সামর্থ্য ও উপকরণাদিকে উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করা।

বিজ্ঞাপন

* ফলাফল বা পরিণতি খোদাতায়ালার হাতে ন্যস্ত করা। এবং

* ফলাফল যাহাই আসুক না কেন, অর্থাৎ উদ্দেশ্য সাধনে যথাসাধ্য চেষ্টা তদবীর অন্তে সফলতা বা ব্যর্থতা-যাহাই আসুক না কেন; উভয় অবস্থাতে খোদাতায়ালার উপর সন্তুষ্ট থাকা।

দুনিয়াবী অথবা পারলৌকিক-যে কোন কাজেই হউক না কেন; যিনি উল্লিখিত শর্তসমূহ পালন করিতে সক্ষম, তাহাকেই খোদাতায়ালার উপরে ভরসাকারী বা "মুতাওয়াক্কিল" বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

চেষ্টা-তদবীর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নহেঃ

একজন কৃষক উত্তম ফসলের আশায় আগাছা পরিচ্ছন্ন করে, জমি কর্ষণ করে, সার প্রয়োগ ও বীজ বপন করে; বীজ অংকুরিত হওয়ার পর পুনরায় সার প্রয়োগ ও আগাছা পরিস্কার করে। কৃষিকার্যে উল্লিখিত বিধান পালন করা কৃষকের দায়িত্ব। কৃষক যথাসাধ্য চেষ্টা ও পরিশ্রম করিবার পরও ফসলের উৎপাদন সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হইতে পারে না। কারণ তখনও অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি বা বন্যায় ফসল নষ্ট হইতে পারে। তাই বুদ্ধিমান কৃষক সাধ্যমত চেষ্টা তদবীর করিয়া ফলাফল খোদাতায়ালার উপরে ন্যস্ত করে। ইহাই তাওয়াক্কুল।

আমাদের এই দেহ আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সমন্বয়ে সৃষ্ট। পরস্পর বিরোধী উপাদানে সৃষ্ট বিধায় মানুষের এই দেহে রোগ-ব্যাধি হওয়া স্বাভাবিক। মানুষের কর্তব্যঃ রোগাক্রান্ত বা ব্যাধিগ্রস্ত হইলে ঔষধ সেবন করা। ইহা শরীয়তের বিধান ও নবী করীম (সাঃ) এর সুন্নত। দয়াল নবী (সাঃ) অসুস্থ হইলে নিজে ঔষধ সেবন করিতেন এবং উম্মতদেরকেও রোগাক্রান্ত হইলে ঔষধ সেবনের নির্দেশ দিয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা রোগের ঔষধ সেবন কর। তিনি আরও বলিয়াছেনঃ জগতে মৃত্যু ভিন্ন এমন কোন রোগ নাই যাহার ঔষধ নাই। তবে মানব কখনও সেই ঔষধের সন্ধান জানিতে পারে, কখনওবা জানিতে পারে না। এই সময়ে সাহাবাগণের কেহ রাসূলে করীম (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঔষধ কি আল্লাহতায়ালার বিধান উল্টাইয়া দিতে পারে? তিনি বলিয়াছিলেন, ঔষধও আল্লাহর বিধান।

এমতাবস্থায় অসুস্থ হইলে কেহ যদি বলে, আমার ঔষধ প্রয়োজন নাই, ডাক্তারের দরকার নাই; আল্লাহপাক রোগ দিয়াছেন, আল্লাহপাকই সুস্থ করিবেন; তবে তাহার এই বক্তব্য হইবে, আল্লাহর বিধান ও তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী। কেননা, তাওয়াক্কুল শরীয়তের বিধান বহির্ভূত কোন বিষয় নহে।

অসুস্থ অবস্থায় রোগীর কর্তব্য চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ঔষধ সেবন করা এবং সুস্থতার আশায় পরিপূর্ণভাবে খোদাতায়ালার উপরে নির্ভর করা। ঔষধ বা ডাক্তারের উপর ভরসা করার কোন অর্থই নাই। ডাক্তারকে রোগ নির্ণয়ের ক্ষমতা প্রদান এবং ঔষধের মধ্যে রোগ নিরাময়ের গুণ প্রদান-উভয়ই যেমন খোদাতায়ালার কর্ম; তেমনি রোগীর সুস্থতা দানও খোদাতায়ালার কাজ। এক্ষেত্রে ঔষধ বা ডাক্তারের নিজস্ব কোন কৃতিত্ব নাই; কৃতিত্ব সবটুকুই খোদাতায়ালার নিজস্ব। তাই সর্বক্ষেত্রেই রোগীকে রোগমুক্তির জন্য চেষ্টা তদবীর যেমন করিতে হয়; তেমনি খোদাতায়ালার উপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল করিতে হয়।

বিজ্ঞাপন

একবার হযরত মুসা (আঃ) কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হইলে বনী ইসরাইলী বংশীয় অভিজ্ঞ লোকেরা তাহাকে বলিয়াছিলেনঃ অমুক দ্রব্য এই রোগের অমোঘ ঔষধ; আপনি তাহা সেবন করুন। তিনি বলিয়াছিলেনঃ আমি ঔষধ সেবন করিব না। আল্লাহতায়ালা রোগ দিয়াছেন, আল্লাহপাকই আরোগ্য করিবেন। তাহার পীড়া ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইয়া ভীষণ আকার

ধারণ করিল। সকলে তাহাকে পুনঃপুনঃ ঔষধ সেবনে অনুরোধ করিতে লাগিল। তাহারা বলিল, সেই ঔষধটি এই রোগের বিখ্যাত ঔষধ এবং বহু রোগীকে সেবন করাইয়া বিশেষ ফল পাওয়া গিয়াছে। আপনি ব্যবহার করুন। তিনি উত্তর করিলেন, আমি কিছুতেই ঔষধ সেবন করিব না। আল্লাহতায়ালাই আমার রোগ নিরাময় করিবেন। কিন্তু তাহার পীড়া বাডিয়াই চলিল। ইতিমধ্যে আল্লাহপাক ওহী প্রেরণ করিলেনঃ হে মুসা! আমি আমার ইজ্জতের শপথ করিয়া বলিতেছি; যতদিন তুমি ঔষধ সেবন না করিবে, ততদিন আমি কিছুতেই তোমার রোগ নিরাময় করিব না। অতঃপর মুসা (আঃ) ঔষধ সেবন করিয়া পূর্ণ স্বাস্থ্য ফিরিয়া পাইলেন। এই ব্যাপারটি মুসা (আঃ) এর অন্তরে বিষম খঙ্কা সৃষ্টি করিল। তিনি খটকা দূর করনার্থে খোদাতায়ালার নিকট ইহার কারণ জানিতে চাহিলেন। ওহী আসিলঃ হে মুসা! তুমি কি নিজের তাওয়াক্কুল দ্বারা আমার সৃষ্টি প্রতিপালনের হেকমত বিনষ্ট করিয়া দিতে চাহিয়াছিলে? ঔষধসমূহের মধ্যে রোগ নিরাময় করার গুণ আমি ভিন্ন আর কে স্থাপন করিয়াছে?

সুতরাং বুঝা গেল, উদ্দেশ্য সাধনে চেষ্টা তদবীর করা বা খোদাপ্রদত্ত শক্তি সামর্থ্য ও উপকরণাদির ব্যবহার করিয়া ফলাফল বা পরিণতি খোদাতায়ালার উপর ন্যস্ত করাই তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ ভরসা।

বিজ্ঞাপন

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, একদা নবী (সাঃ) মসজিদে বসিয়াছিলেনঃ এক গ্রাম্য ব্যক্তি তাহার সাক্ষাতের জন্য আসিয়া মসজিদ অঙ্গনে তাহার উটকে বসাইল এবং উহাকে না বাঁধিয়া শুধু মাত্র এই বলিয়া মসজিদ পানে অগ্রসর হইল যে, আলাহর উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করিলাম। রাসূলে পাক (সাঃ) তাওয়াক্কুল সম্পর্কীয় জ্ঞান দান উদ্দেশ্যে লোকটিকে উচ্চঃস্বরে বলিলেন, "উটকে বাঁধিয়া আল্লাহর উপর ভরসা কর।"

এক্ষেত্রে উট বাঁধার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হইলঃ মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছানোর জন্য সাধ্যমত বা শক্তি ও সামর্থ্যমত চেষ্টা ও পরিশ্রম করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা যেন সফলতা অর্জন করা যায়। অর্থাৎ উপায় অবলম্বন করিয়া সেই উপায় ফলবান হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর উপর ভরসা করা। তাই মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় মছনবীতে বলেন,

বিজ্ঞাপন

"গুফত পয়গাম্বর ব আওয়াযে বলন্দ

বা তাওয়াক্কোল যানুয়ে উশতর বন্দ।"

অর্থাৎ- 'নবী (সাঃ) সুস্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেন, তাওয়াক্কুলের সংগে উটের পাঁ অবশ্যই বাঁধিয়া রাখ।'

বিজ্ঞাপন

কেহ কেহ মনে করে, তাওয়াক্কুল অর্থ যেহেতু ভরসা করা; কাজেই চেষ্টা তদবীরের প্রয়োজন নাই। উপায় অবলম্বনের দরকার নাই। হাত পা গুটাইয়া নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া থাকাই তাওয়াক্কুল। আসলে তাহা নহে। এমন চিন্তা অবান্তর। এমন অমূলক চিন্তা ভাবনা যাহারা লালন করে-তাহারা মূলতঃ মূর্খ বা পথভ্রষ্ট। শয়তান ও নাফস তাহাদের হৃদয়ে এমন ভ্রান্ত ভাবনা চিন্তার তীর নিক্ষেপ করে। ফলে তাহারা সত্য পথচ্যুত হয়, নিজেদের বিনাশ নিজেরাই ডাকিয়া আনে।

বলা হইয়াছেঃ চেষ্টা তদবীর করা বা উপায় অবলম্বন করা তাওয়াক্কুলের শর্ত। কার্য উদ্ধারে শক্তি সামর্থ্য প্রয়োগ করাও তাওয়াক্কুলের শর্ত। কিন্তু লক্ষ্য বা দৃষ্টি সব সময়ই এক আল্লাহর দিকে থাকিতে হইবে। কেহ কেহ ভুলবশতঃ নিজের কর্মশক্তি, চেষ্টা তদবীর বা অবলম্বনকৃত কারণ সমূহের উপর ভরসা করে, যাহা মূর্খতা বা পথভ্রষ্টতা ভিন্ন কিছু নহে। যেমন কারুনকে আল্লাহপাক অগাধ ধন-সম্পদ দান করিয়াছিলেন। সম্পদ ও বিত্তবান কারুনকে বলা হইয়াছিলঃ

وَ أَحْسِنْ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-'তুমি (আল্লাহর বান্দাদের) উপকার কর, যেমন আল্লাহ তোমাকে উপকার করিয়াছেন (অর্থাৎ তোমাকে অপরিমিত ধন সম্পদ দান করিয়াছেন)।' (সূরা ক্বাছাছঃ ৭৭)

কিন্তু পথভ্রষ্ট ও মূর্খ কারুন আল্লাহর দানকে অস্বীকার করিল। সে বলিল, "এই সব ধন সম্পদতো একমাত্র আমার নিজস্ব হুনর-হেকমত, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বদৌলতে লাভ করিয়াছি।"

কারুন তাহার নিজের বুদ্ধিবল, বাহুবল ও কৌশল বা হেকমতের উপর ভরসা করিল; আল্লাহ-ভরসাকে অস্বীকার করিল, আল্লাহকে বিস্মৃত হইল। সে বুঝিল না যে, বুদ্ধিবল, বাহুবল, অর্থবল-সবই খোদাতায়ালার দান। সবই খোদাতায়ালার নেয়ামত। যদি বুঝিত, তবে ধ্বংস হইত না।

বিজ্ঞাপন

কোন কাজে চেষ্টা তদবীর করা বা উপায় অবলম্বন করার জন্য প্রয়োজন দৈহিক শক্তি, বুদ্ধি-বিবেক এবং কৌশল। ইত্যাকার উপকরণাদি না হইলে উদ্দেশ্য সাধনে চেষ্টা বা পরিশ্রম করা সম্ভব নহে। কিন্তু উল্লিখিত উপকরণাদি যেহেতু সবই খোদাতায়ালা থেকে বর্ষিত; সেহেতু প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য খোদাতায়ালারই শোকর করা, খোদাতায়ালার উপরই তাওয়াক্কুল করা। এই শিক্ষাই আল্লাহপাক আমাদিগকে দান করিয়াছেন। পাক কুরআনে ইরশাদ হইতেছেঃ কাজে (যুদ্ধে) তাহাদের পরামর্শ গ্রহণ কর। তারপর যদি দৃঢ় ইচ্ছা করিয়া ফেল, তাহা হইলে আল্লাহর উপর ভরসা কর। অবশ্যই আল্লাহপাক ভরসাকারী বা মুতাওয়াক্কিলদের ভালবাসেন। যদি আল্লাহপাক তোমার সহায় হন, তবে কেহ তোমাকে পরাভূত করিতে পারিবে না। যদি আল্লাহ তোমাকে ছাড়িয়া দেন, তাহা হইলে এমন কে আছে যে, আল্লাহর পরে তোমাকে সাহায্য করিবে? আর মুমিনের কর্তব্য হইতেছে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৫৯-১৬০)

পয়গম্বরগণের তাওয়াক্কুলঃ

পৃথিবীতে যত নবী ও রাসূল আবির্ভূত হইয়াছেন-তাহাদের সকলের উপরই আল্লাহভোলা মানুষদের হেদায়েত ও সংস্কারের দায়িত্ব ছিল। সকলেই আপন আপন দায়িত্ব পালনে ঐকান্তিক চেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রম করিয়াছেন। খোদার নির্দেশ প্রতিপালনে তাহাদের ত্যাগ তিতিক্ষা ছিল অতুলনীয়। প্রত্যেককেই কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করিতে হইয়াছে। তাহারা কত যে অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করিয়াছেন-তাহার হিসাব কে দিবে? হযরত নূহ (আঃ) এবং আমাদের পয়গম্বর রাসূলে পাক (সাঃ) অসংখ্য পাথরের আঘাত সহ্য করিয়াছেন। পাথরের আঘাতে তাহাদের দেহ ফাটিয়া রক্ত নির্গত হইত। দুই হাতে দেহ-নির্গত রক্ত কাচিতেন আর খোদাতায়ালাকে বলিতেন, "হে খোদা! ওরা অজ্ঞ। ওদের তুমি ক্ষমা কর।" যেমনি অপূর্ব ছবরের গুণে তাহারা বিভূষিত ছিলেন, তেমনি তাওয়াক্কুলের গুণেও তাহারা গুণান্বিত ছিলেন। পাক কুরআনে ইহার বহু প্রমাণ মিলে।

হযরত নূহ (আঃ) এর উপর তাহার কাওমের অত্যাচার যখন সীমাকে অতিক্রম করিল, তখন তিনি তাহাদেরকে বলিয়াছিলেন, “হে আমার কাওমের লোকসকল! যদি আমার অবস্থান, আমার নির্দশনাবলীসহ আমার নসিহত প্রদান তোমাদের নিকট বোকা মনে হয়, তাহা হইলে জানিয়া রাখ, আমি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করিয়াছি। খুব মজবুত করিয়া লও, তাহার পরও যেন তোমাদের নিকট তদবীর ও সুতরাং তোমরা নিজেদের প্রচেষ্টাকে এবং নিজেদের সংগী সাথীদেরকে চেষ্টার কথা প্রচ্ছন্ন না থাকে; তারপর ইহাকে আমার উপর পুরা কর এবং আমাকে অবকাশ দিও না।" (সূরা ইউনুসঃ ৭১)

তেমনি হযরত শোয়াইব (আঃ) স্বীয় অত্যাচারী কাওমকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, আমি তোমাদের বিরোধিতায় ভয় করি না; সংস্কার ও হেদায়েতের যে কাজ আমাকে করিতে হইবে, আমি তাহা অবশ্যই করিব, আমার ভরসা কেবলমাত্র আল্লাহর উপর। আল কুরআনের ঘোষণাঃ "আমি আমার সামর্থ্য অনুসারে সংস্কার ও হেদায়েতের কাজ করিয়া যাইব; আমার আশ্রয়স্থল একমাত্র আল্লাহ। আমি তাহারই উপর ভরসা করিয়াছি এবং তাহারই দিকে প্রত্যাবর্তন করিতেছি।” (সূরা হুদঃ ৮৮)

তাওয়াক্কুলের গুণ অর্জনের উপায়ঃ

যে কোন কাজে বা উদ্দেশ্য সাধনে খোদাতায়ালার উপর ভরসা করা বা তাওয়াক্কুলের গুণ অর্জন করা প্রত্যেক ঈমানদারের কর্তব্য। পাক কুরআনের ঘোষণানুযায়ী ইহা প্রত্যেকের উপর ওয়াজেব বলিয়া পরিগণিত হয়। আল্লাহপাক ইরশাদ করেনঃ

فَتَوَكَّلْ عَلَ الله

অর্থাৎ-"অতঃপর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা কর।" (সূরা আলে ইমরানঃ ১৫৯) তিনি আরও বলেন, وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوْتُ

অর্থাৎ-“সেই চিরঞ্জীব মহান সত্তার উপর তাওয়াক্কুল কর, যিনি মৃত্যুবরণ করিবেন না।” (সূরা ফুরকানঃ আয়াত-৫৮)

আল্লাহপাকের নির্দেশ মোতাবেক তাওয়াক্কুলের গুণ বা অবস্থা দেলে পয়দা করা প্রত্যেকের জন্য একান্ত কর্তব্য। কিন্তু মানুষ তাওয়াক্কুলের গুণ অর্জন করিবে কেমন করিয়া?

সেই বিষয়ে আলোচনার পূর্বে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আরও দুই একটি কথা বলিতেছি। তাওয়াক্কুকুলের সাথে ঈমান বা বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ক। ঈমানের গভীরতা যাহার যত বেশী; তাওয়াক্কুলের গুণ ও জ্ঞান তাহার ততবেশী। ঈমানের মূল মন্ত্র হইলঃ কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মদ আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ-এই কলেমাকে দেলে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা। ঈমানের শাখা সত্তরেরও বেশী। শ্রেষ্ঠতম শাখা হইল-"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-অর্থাৎ আল্লাহর একত্ব সম্পর্কীয় জ্ঞান বা তৌহিদের জ্ঞান।

আল্লাহর একত্ববাদ সম্বন্ধীয় জ্ঞানের মূল তিনটি স্তর আছে, যথাঃ

প্রথম স্তরঃ

কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" কে মনে প্রাণে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা। সাধারণ শ্রেণীর মুসলমান সকলেই এই স্তরের তৌহিদের জ্ঞানে জ্ঞানী। তাহারা মনে ও মুখে কলেমাকে বিশ্বাস করে; কিন্তু দেলে ও দেহে ইহা সাবেত বা প্রতিষ্ঠা করিতে পারে না। তাই তাহারা খোদাতায়ালার আদেশ-নিষেধ যথাযথ পালন করিতে পারে না। সততঃই তাহারা আমলে ভুল করিয়া থাকে। এই শ্রেণীর মুসলমান তাহাদের বিশ্বাসের বদৌলতে আল্লাহপাক ইচ্ছা করিলে কেহবা বিনা শাস্তিতে, কেহবা ভুল ত্রুটির পরিমানানুযায়ী শাস্তি ভোগ শেষে বেহেশতে যাইবে।

তৌহিদ-জ্ঞানের দ্বিতীয় স্তরঃ

কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-কে দেলে প্রতিষ্ঠিত করা। ইহা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কলেমার "লা" এর তলোয়ারে প্রকাশ্য ও গুপ্ত উপাস্যতুল্য উদ্দেশ্য সমূহকে কাতেল করিতে হয়। বুঝিবার সুবিধার্থে এই কথার বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তরিকতের পরিভাষায় উদ্দেশ্যকে উপাস্য বলা হয়। যাহার উদ্দেশ্য দুনিয়ার যশ, খ্যাতি, কর্তৃত্ব অর্জন; তরিকতের দৃষ্টিকোনে তাহার উপাস্য এই দুনিয়া। যে ব্যক্তি নাফসের পায়রবী করে, তাহার উপাস্য দুষ্ট নাফস। যে ব্যক্তি শয়তানী চক্রান্তে পতিত হইয়া শয়তানসুলভ কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকে-অর্থাৎ হিংসা, কিনা, হানাহানি, ঝগড়া-বিবাদ, গীবত, কুৎসা রটনা ইত্যাদি কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকে-তাহার উপাস্য শয়তান।

খোদাতায়ালাকে চেনার পথে যে সাধক দুনিয়াবী আকর্ষণ, নাফসের শৃংখল ও শয়তানের প্ররোচনা মুক্ত হইতে পারেন, তাহার দেলে আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুই থাকে না। তাহার দেলে কলেমা ছাবেত বা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাহার দেলে আল্লাহ অবস্থান করেন। হাদীস শরীফে প্রকাশঃ

قُلُوبُ الْمُؤْمِنِينَ عَرْشِ اللَّهِ

অর্থাৎ- 'মোমেনের দেল আল্লাহর আরশ।'

যে মোমেনের দেলে কলেমা "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ছাবেত হইয়াছে-তাহার সম্পর্কেই উক্ত হাদীস ব্যক্ত হইয়াছে।

একত্ববাদ সম্পর্কীয় জ্ঞানের দ্বিতীয় স্তরের সাধক যে দিকেই তাকায় সে দিকেই খোদাতায়ালাকে দেখিতে পায়। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ঘোষণা করেনঃ

فَأَيْنَمَا تُوَلُّوْا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّه

অর্থাৎ-"পূর্ব-পশ্চিম আল্লাহর, সুতরাং যে দিকেই তুমি মুখ ঘুরাও, সেই দিকেই আল্লাহর চেহারা আছে।"-(সূরা বাকারাঃ ১১৫)

তৌহিদ-জ্ঞানের তৃতীয় স্তরঃ

তৌহিদ জ্ঞানের যে স্তরে সাধকের দেল এবং দেহ-উভয়তেই কলেমা "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ" ছাবেত হয়-তাহাই একত্ববাদের শ্রেষ্ঠতম স্তর। এই স্তরে সাধকের দেলে যেমন কলেমা অংকিত থাকে, তেমনি দেহের প্রত্যেক অণু-পরমাণুতে কলেমা অংকিত হয়। সাধকের দেহে সর্বদা জাতি নূরের কারেন্ট প্রবাহিত হইতে থাকে। তৌহিদ জ্ঞানের উচ্চতম এই স্তর অর্জিত হয় কামালাতে নবুয়তের মাকামে। কামালাতে নবুয়তের মাকাম তয়কারী বিধায় সকল নবী-রাসূল তৌহিদের উচ্চতম স্তরের জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন।

পূর্বেই বলিয়াছি, তাওয়াক্কুলের সাথে সম্পর্ক আছে ঈমানের। আল্লাহপাক ঘোষণা করেন,

وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ

অর্থাৎ-“এবং তোমরা একমাত্র আল্লাহর প্রতিই তাওয়াক্কুল কর-যদি তোমরা মোমিন হইয়া থাক।" (সূরা মায়েদাঃ ২৩)

ঈমান তথা তৌহিদ জ্ঞানের তিনটি স্তরের প্রথম স্তরের ঈমানদারগণের মধ্যে তাওয়াক্কুলের গুণ থাকে না। তাওয়াক্কুলের শর্তসমূহ এই স্তরের ঈমানদারগণ যথাযথ পালন করিতে পারে না। কিন্তু তৌহিদ জ্ঞানের দ্বিতীয় স্তরে ঈমানদার ব্যক্তি মোমিনের মর্যাদা পায়। কারণ তাহার দেলে কলেমা সাবেত থাকে। ফলে এই স্তরে সাধকের মধ্যে তাওয়াক্কুলের গুণ আসিতে থাকে। তবে এই গুণের পূর্ণতা আসে তৌহিদ জ্ঞানের তৃতীয় স্তরে।

তাওয়াক্কুলের গুণ অর্জনের জন্য প্রয়োজন আল্লাহপাকের সিফাত সম্পর্কীয় জ্ঞান। আল্লাহতায়ালার গুণাগুণ সম্পর্কে যদি কাহারো মধ্যে জ্ঞান না থাকে; অন্ততঃপক্ষে আল্লাহপাকের অসীম ক্ষমতা ও অপার করুণা সম্পর্কে যদি কোন বান্দা জ্ঞান অর্জন করিতে না পারে; তবে সে কিভাবে খোদাতায়ালার উপর তাওয়াক্কুল করিবে? কাজেই তাওয়াক্কুলের গুণ অর্জনের জন্য প্রথম শর্তই আধ্যাত্বিক অনুশীলনপূর্বক আত্মিক বিকাশের মাধ্যমে খোদাতায়ালার গুণাগুণ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। কিতাবী জ্ঞানের মাধ্যমে তাওয়াক্কুলের গুণ অর্জন করা যায় না। কারণ মানুষের দেলের চারিপার্শ্বে নাফস ও শয়তান অতি মজবুত এক দেওয়াল তৈরী করিয়া রাখিয়াছে। কিতাবী জ্ঞানের মাধ্যমে সেই দেওয়াল ভাংগা সম্ভব নয়। সেখানে প্রয়োজন আত্মিক অনুশীলন এবং বাতেনী জ্ঞান চর্চা। আধ্যাত্বিক অনুশীলনের মাধ্যমে সাধক খোদাতায়ালার আফ্যাল (ক্রিয়াকলাপ) ও সিফাত (গুণাবলী) সম্পর্কে সহজেই জ্ঞান অর্জন করিতে পারে।

যেহেতু কিতাবী জ্ঞান বা শিক্ষকের নিকট থেকে শোনা জ্ঞানে মুখ ও অন্তরে বিশ্বাস ব্যতীত দেলে বা দেহে কলেমাকে ছাবেত করা যায় না; তাই-ই তৌহিদ জ্ঞানের প্রথম স্তরে তাওয়াক্কুলের গুণ মানুষের মধ্যে আসে না।

তাওয়াক্কুলের তিনটি স্তরের বিবরণঃ

তাওয়াক্কুলের তিনটি স্তর আছে। যথাঃ

প্রথম স্তরঃ-

তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ ভরসার প্রথম স্তরে সাধক তাওয়াক্কুল

সম্পর্কে কিঞ্চিত গুণ ও জ্ঞান অর্জন করিতে পারে। ইহা অর্জিত হয় আধ্যাত্মিক জগতের প্রথম বৃত্ত-দায়েরায়ে এমকানে। আত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে সাধক ধীরে ধীরে প্রকাশ্য ও গুপ্ত উপাস্য তুল্য উদ্দেশ্যসমূহকে "লা" এর তলোয়ারে কাতেল করিতে থাকে। সাধনার প্রাথমিক পর্যায়ে সে দেল থেকে আল্লাহ ব্যতীত সবকিছুকে ঝাড়িয়া ফেলে। ফলে সে দুনিয়ার আকর্ষণমুক্ত হয়, নাফসের প্রভাবমুক্ত হয় এবং শয়তানের ধোকা মুক্ত হয়। এই পর্যায়ের খোদাঅন্বেষীর দেলে আল্লাহর সিফাত (এজাফিয়া) ও আয়ালের নূর আসিতে থাকে। দেলের আয়নায় সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে সে দেখিতে পায়। এই স্তরে খোদাঅন্বেষীর দেলে আল্লাহতায়ালার আফ্যাল ও সিফাত বা গুণাগুণ সম্পর্কে কিছু জ্ঞান আসিতে থাকে। সে বুঝিতে পারে যে, আল্লাহপাকই সমস্ত কাজের স্রষ্টা। এই পৃথিবীতে যাহা কিছু হইতেছে-তাহা সবই খোদাতায়ালার একক ইচ্ছায় সংঘটিত হইতেছে। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাতেই গ্রহ-নক্ষত্র সমূহ লাটিমের মত ঘুরিতেছে। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হইতেছে। গাছে ফল, জমিনে শস্য, পানিতে মাছ হইতেছে। ঋতুর পরিবর্তন হইতেছে। প্রাণী জগতেও নতুন সৃষ্টি হইতেছে। অর্থাৎ পরিচ্ছন্ন কালবে প্রতিফলিত আফয়ালী নূরের সাহায্যে খোদাঅন্বেষী খোদাতায়ালার ক্ষমতার কিছু পরিচয় পাইয়া নিজেকে খোদার হাতে সোপর্দ করে। একই সংগে তাহার দেলে খোদাতায়ালার এজাফি সিফাতের নূর তথা আল্লাহতায়ালার অপার দয়া ও করুণা গুণদ্বয়ের কিঞ্চিত পরিচয় জমা হয় অর্থাৎ দায়রায়ে এমকানে খোদাঅন্বেষী খোদাতায়ালার অসীম ক্ষমতা ও অপার করুণার কিছু পরিচয় পাইয়া নিজেকে খোদার হাতে ন্যস্ত করে এবং আল্লাহ-ভরসার কিছুটা প্রভাব দেলে পয়দা করিতে পারে। ইহাই তাওয়াক্কুলের প্রথম স্তর। এই স্তরে সাধক খোদার উপর ভরসা করিয়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে উপনীত হওয়ার জন্য নিরলস চেষ্টা করিতে থাকে।

তাওয়াক্কুলের দ্বিতীয় স্তরঃ

বেলায়েতে ছোগরার দায়রাতে ছালেক বা খোদাঅন্বেষী আল্লাহপাকের সকল এজাফি সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। এজাফি সিফাত হইল সিফাতে হাকীকীর প্রতিবিম্ব। এজাফি সিফাত ও সিফাতযুক্ত আল্লাহর বহু নাম বেলায়েতে ছোগরার মাকামে (প্রতিপালক), রাজ্জাক (রুজি দাতা), সালাম (শান্তিদাতা) ইত্যাদি। আছে। যেমন খালেক (স্রষ্টা), রহমান (দয়াময়), রাহীম (দয়ালু), রব খালেকের কাজ সুজন করা, রহমান ও রাহীমের কাজ দয়া ও করুণা করা। রবের কাজ পালন করা। রাজ্জাকের কাজ রুজি দান করা। খোদাতায়ালা একক। একক খোদাতায়ালার বহু গুণ আছে। বিভিন্ন গুণের মাধ্যমে একক খোদাতায়ালার বিভিন্ন প্রকাশ আছে। বেলায়েতে ছোগরার দায়েরাতে ছালেক খোদাতায়ালার প্রত্যেকটি গুণের জগতে পথক পৃথক ভাবে ছায়ের করিয়া পথক পৃথক নূর প্রাপ্ত হয়। রহমান ও রাহীম নামের নূর লাভ করিয়া এই স্তরে খোদাঅন্বেষী খোদাতায়ালার দয়া ও করুণা সম্পর্কে সম্যক পরিচয় লাভ করে। ছালেক বুঝিতে পারে যে, একজন মা তাহার সন্তানকে যতখানী ভালবাসেন-খোদাতায়ালা তাহার চাইতে সত্তরগুণ অধিক মহব্বত করেন তাহার সৃষ্টিকে।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবনীতে দেখা যায়ঃ তিনি বলেন, আমি যখন খোদাতায়ালার সান্নিধ্যের স্তর পর্যন্ত পৌছাইলাম, তখন আল্লাহপাক আমাকে বলিলেন, কি চাহিবার আছে চাও। আমি আরয করিলাম, এলাহী! সমগ্র মখলুকের প্রতি রহম করুন। এরশাদ হইলঃ গভীরভাবে দৃষ্টি করিয়া দেখ। আমি গভীরভাবে দৃষ্টি করিয়া দেখিলাম, প্রত্যেক মখলুকের সংগে এক একজন করিয়া সুপারিশকারী রহিয়াছেন এবং প্রত্যেক বান্দার প্রতি আল্লাহপাক আমার চেয়েও বেশী মেহেরবান।

বেলায়েতে ছোগরাস্থিত সমস্ত সাধকই হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের অনুরূপ খোদাতায়ালার অপার করুণা সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জন করে। আলাহতায়ালার রাজ্জাক বা রুজিদান সিফাতে ছায়ের করিয়া এবং রাজ্জাক নামের নূর লাভ করিয়া এই স্তরের সাধক বুঝিতে পারে যে, সকল সৃষ্টির রুজির জিম্বাদার স্বয়ং খোদাতায়ালা। আল্লাহ পাক ঘোষণা করেনঃ

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا

আর্থাৎ- "ভূ-পৃষ্ঠের উপর যত প্রাণী বিচরণ করিতেছে তাহাদের প্রত্যেকের রেখেকের দায়িত্বই আল্লাহতায়ালার উপর রহিয়াছে। (সূরা হুদঃ ৬)

আল্লাহপাকের রাজ্জাক নাম বা রুজিদান গুণে ছায়েরপূর্বক নূর লাভকরিয়া খোদাঅন্বেষী উল্লিখিত আয়াতের মর্মার্থ বা তাৎপর্য উপলব্ধি করে এবং রেজেকের ব্যাপারে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠামুক্ত হয়।

এমনিভাবে বেলায়েতে ছোগরাস্থিত সাধকের উপর আল্লাহপাকের ৯৯ নামের ঝলক আসিয়া সাধককে খোদার গুণে গুণান্বিত করে। সাধকও সর্বোতভাবে খোদাতায়ালার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করে, খোদার হাতে নিজেকে সোপর্দ করে, সর্বক্ষেত্রে ও সর্ব ব্যাপারে খোদার আশ্রয় প্রার্থনা করে।

দ্বিতীয় স্তরের মুতাওয়াক্কিল বা ভরসাকারীর অবস্থা হয় ছোট্ট শিশুর মত। সর্বক্ষেত্রে ও সর্বাবস্থায় শিশুর লক্ষ্য থাকে মায়ের দিকে। ক্ষুধা-তৃষ্ণা হউক অথবা যে কোন বিপদের আশংকা থাকুক; শিশু তাঁহার মায়ের আঁচলে আশ্রয় নেয়, মায়ের কাছেই তাহার অভাব ব্যক্ত করে। ঠিক তেমনি দ্বিতীয় স্তরের মুতাওয়াক্কিল বা বেলায়েতে ছোগরান্তরের ছালেক সর্বক্ষেত্রে খোদাতায়ালার উপরে ভরসা করে। এই স্তরের মুতাওয়াক্কিলের সাথে খোদাতায়ালার কথোপকথোনও হয়।

একদা হযরত আবু হামজা খোরাসানী (রঃ) এক রজনীতে এক জনশূন্য প্রান্তর পাড়ি দেওয়ায় সময় হঠাৎ কূপে পড়িয়া গেলেন। তখন ছিল শীতকাল। প্রচন্ড শীতে তিনি কূপের মধ্যে ঠান্ডা পানিতে পড়িয়া রহিলেন। তাহার দৃষ্টি রহিল খোদাতায়ালার দিকে। কিছুক্ষণ বাদে তথায় একজন পথচারী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি উন্মুক্ত কূপটি দেখিয়া ভাবিলেনঃ ইহা পথিকের জন্য বিপদের কারণ হইতে পারে। তাই পথচারীদের সুবিধার্থে বেশ কিছু কাঁটা গাছ সংগ্রহ করিয়া কূপটির উন্মুক্ত মুখে রাখিলেন। মুখটিকে কোন রকমে ঢাকিয়া দিলেন। হযরত আবু হামজা খোরাসানী (রঃ) কূপের তলদেশ হইতে সবই দেখিতেছেন-তাহার নাফস লোকটির নিকট সাহায্য চাওয়ার জন্য পুনঃপুনঃ চাপ সৃষ্টি করিতেছিল; কিন্তু তথাপিও তিনি তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ ভরসার বন্ধন ছিন্ন করিলেন না। পথিক চলিয়া যাওয়ার খানিক পরেই সেখানে এক প্রচন্ড বাঘ আসিয়া উপস্থিত হইল। সে কূপের মুখ হইতে কন্টকযুক্ত ডাল-পালা ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া থাবা দ্বারা কূপের পাড় আকড়াইয়া ধরিয়া পিছনের পদদ্বয় কূপের ভিতরের দিকে প্রসারিত করিয়া দিল। হযরত হামজা খোরাসানী (রঃ) ইহা দেখিয়া মনে মনে বলিলেনঃ আমি একটি নগন্য বিড়ালের সাহায্য গ্রহণ করিব না। সে মুহূর্তে আল্লাহপাকের তরফ হইতে এলহাম হইল-তুমি বাঘটির পিছনের পা আকড়াইয়া ধর এবং ওপরে উঠিয়া আস। তিনি উপরে উঠিয়া আসিলে আল্লাহপাক বলিলেন-"যখন তুমি আমার উপর তাওয়াক্কুল করিয়াছ, তখন তোমার প্রাণ সংহারকারী দ্বারাই মৃত্যুর হাত হইতে তোমাকে রক্ষা করিলাম।"

তাওয়াক্কুলের দ্বিতীয় স্তর সম্পর্কেই আলোচনা হইতেছে। ইহার ঊর্ধ্বে মারেফাতের মূল দফতরে উপনীত হইলে হাকীকী সিফাতের নূর এবং জাতি নূরের কারেন্টে ছালেক তাওয়াক্কুলের শ্রেষ্ঠতম স্তরের গুণ অর্জন করে। কিন্তু সেই স্তরে উপনীত হওয়ার যোগ্যতা দ্বিতীয় স্তরের বা মধ্যম স্তরের মুতাওয়াক্কিলের আছে কিনা, তাহা খোদাতায়ালা যাচাই করিয়া দেখেন। যাচাইয়ের স্বার্থে কখনওবা পরীক্ষা করেন, কখনওবা কড়া শাসন করেন ইত্যাদি।

একদা আব্দুল্লাহ খফিফ (রঃ) হজ্জে রওয়ানা হইয়া এক বিশাল মরু প্রান্তর অতিক্রম করিবার সময় তাহার ভয়ানক পিপাসা পাইল। তাহার সংগে ছিল একটি লোটা ও রশি। কিছুদূর গমনের পর তিনি একটি কূপ দেখিতে পাইলেন। আরও দেখিলেনঃ একটি হরিণ উহা হইতে পানি পান করিতেছে। তিনি পানি পান উদ্দেশ্যে কূপের নিকটে গেলেন। হরিণ পানি পান করিয়া চলিয়া যাইতেই কূপের পানিও কূপের তলদেশে চলিয়া গেল। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন, হে আল্লাহ! একি ব্যাপার, হরিণের চাইতেও কি আমার মর্যাদা কম? এলহাম হইলঃ হরিণের নিকট লোটা ও রশি নাই; কিন্তু তোমার নিকট তাহা আছে। তিনি লজ্জিত হইয়া লোটা ও রশি ছুড়িয়া ফেলিয়া চলিতে আরম্ভকরিলেন। তখন আল্লাহপাক এলহাম প্রেরণ করিলেনঃ হে খফিফ! আমি তোমাকে পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম। কূপের নিকটে ফিরিয়া যাও এবং পিপাসা নিবারণ কর। তিনি কূপের নিকটে পৌঁছাইতেই কূপের পানি তলদেশ হইতে উপরে উঠিল। তিনি পানি পান করিয়া মক্কা শরীফের দিকে রওয়ানা হইলেন। হজ্জ সমাপনের পর তিনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের সহিত দেখা করিবার জন্য বাগদাদের দিকে রওয়ানা হইলেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তাহাকে দেখিয়া মুচকি হাসিয়া প্রথমেই বলিলেন, যদি সংগে লোটা ও রশি না রাখিতে, তবে কূপ অন্বেষণ করিতে হইত না; পানি তোমার পদতল হইতেই প্রবাহিত হইত।

ইহা মূলতঃ দ্বিতীয় স্তরের মুতাওয়াক্কিলের উপর আল্লাহপাকের পরীক্ষা, যেন সর্বক্ষেত্রে তাহার একমাত্র ভরসা আল্লাহতায়ালাই থাকে।

শিশুর লক্ষ্য মা। শিশুর আশ্রয়স্থল বা ভরসাস্থল মা। কিন্তু কখনোও যদি শিশু তাহার মায়ের নিকট থেকে একটু দূরে সরিয়া পড়ে, অগ্নি বা পানির ধারে যায়; তবে সম্ভাব্য ক্ষতির আশংকায় শংকিত মা দ্রুত শিশুকে ধরিয়া দুই গালে দুই চপেটাঘাত মারে। অতঃপর শিশুকে বুকে জড়াইয়া ধরে। উদ্দেশ্য শিশু যেন পুনরায় আগুন বা পানির নিকটে না যায়, সম্ভাব্য ক্ষতির শিকার না হয়।

শিশু যেমন ভুলবশতঃ বিপদ-আপদের সম্মুখীন হয়, তেমনি দ্বিতীয় স্তরের মুতাওয়াক্কিল কখনও কখনও ক্ষণিকের জন্য নাফসের বৈধ বাসনার উপর নিজেকে ছাড়িয়া দেয়। মা যেমন শিশুকে শাসন করে, তেমনি উক্ত সাধককে কড়া শাসন করেন খোদাতায়ালা। উদ্দেশ্যঃ সাধক যেন মুহূর্তের জন্যও নিজেকে নাফসের হাতে না ছাড়ে।

হযরত আবু তোরাব বখসী (রঃ) বলিয়াছেনঃ যে কোন অবস্থায় খোদার উপর তাওয়াক্কুল করিয়া থাকাই আমার প্রকৃতি। কিন্তু একবার ছফরে রত থাকা কালে আমার নাফস গরম রুটি ও ডিমভাজা খাওয়ার জন্য আমাকে উত্যক্ত করিতে লাগিল। অনেক চেষ্টা করিলাম; কিন্তু নাফসের এই ইচ্ছাকে প্রশমিত করিতে পারিলাম না। এই অবস্থাতে আমি পথ ভুলিয়া একদল অপরিচিত লোকের নিকট উপস্থিত হইলাম। আমাকে দেখামাত্রই তাহারা সমস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিল-এই তো চোরকে পাইয়াছি। এই বেটাই আমাদের জামা কাপড়গুলো চুরি করিয়াছে। অতঃপর তাহারা আমার বিচারের আয়োজন করিল এবং আমাকে অপরাধী সাব্যস্থ করিয়া দুইশত বেত্রাঘাতের আদেশ দিল। আদেশ পাওয়া মাত্রই এক ব্যক্তি উঠিয়া আসিয়া আমাকে বেত মারিতে আরম্ভকরিল। ঠিক সেই সময় তাহাদের মধ্যের একজন প্রবীন লোক কোথা হইতে ছুটিয়া আসিয়া বলিলেন, হায়, তোমরা করিতেছ কি? হযরত আবু তোরাব বখসী (রঃ) ছাহেবের নাম কি তোমরা কখনও শুন নাই? ইনিই সেই খ্যাতনামা ওলী-আল্লাহ। তাহার মুখে ইহা শুনামাত্রই লোকগুলো বারবার কাতরকণ্ঠে আমার নিকট ক্ষমা চাইতে লাগিল। আমি তাহাদিগকে আশ্বস্ত করিয়া পুনরায় রওয়ানা হওয়ার সময় প্রবীণ লোকটি আমাকে তাহার বাড়ীতে লইয়া গেলেন এবং সামান্য কিছু খাদ্য গ্রহণের জন্য অনুরোধ করিলেন। আমি রাজী হইলে তিনি আমার সামনে সদ্য সেকা রুটি এবং গরম ডিমভাজা পরিবেশন করিলেন। আমি বিছমিল্লাহ বলিয়া রুটি ও ডিমের প্রতি হাত বাড়াইতেই এলহাম হইল-ওহে আবু তোরাব! একবার আশা করিয়াছ-দুইশত বেত্রাঘাতের পর তাহা মঞ্জুর করা হইয়াছে। আবার কিছু আশা করিলে তাহাও মঞ্জুর করা হইবে, তবে অদ্যকার মত দুইশত বেত্রাঘাতের পর।

তাওয়াক্কুলের তৃতীয় এবং শ্রেষ্ঠতম স্তরঃ

তাওয়াক্কুলের শ্রেষ্ঠতম স্তরের গুণ অর্জিত হয় মারেফাতের প্রধান দফতরে হাকীকী সিফাতের নূর ও জাতি নূরের অবিরাম প্রবাহে। সেখানে ঈমানের পূর্ণতা আসে। তৌহিদ জ্ঞানের কামালাত অর্জিত হয়। দেল ও দেহে কলেমা ছাবেত হয়। শ্রেষ্ঠতম স্তরের মুতাওয়াক্কিল খোদার ইচ্ছার হাতে তেমন থাকে, যেমন ধৌতকারীর হাতে মুর্দা থাকে। ধৌতকারীর নিকটে মুর্দারের যেমন কোন ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে না, তেমনি শ্রেষ্ঠ মুতাওয়াক্কিলের বা ভরসাকারীরও খোদার নিকট কোন ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে না। তাহারা প্রত্যেকটি কাজ খোদাতায়ালার নির্দেশে (ওহী বা এলহামের মাধ্যমে প্রাপ্ত নির্দেশে) সম্পন্ন করেন। তাহারা যে চেষ্টা তদবীর বা উপায় অবলম্বন করেন, তাহাও ওহী বা এলহামের নির্দেশে করেন।

যেমন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে যখন নমরুদের নির্দেশে কর্মচারীবৃন্দ চড়কে বাঁধিয়া অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করিতেছিল, তখন তিনি বলিয়াছিলেনঃ "আল্লাহই আমার সাহায্যের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই আমার উত্তম কার্য নির্বাহক।” চড়ক হইতে নিক্ষিপ্ত হইয়া হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন শূন্যমন্ডলে ছিলেন, তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) আসিয়া তাহাকে বলিলেন, আপনি যদি প্রয়োজন মনে করেন, তবে আমি আপনাকে সাহায্য করি। তিনি বলিলেন, আপনার সাহায্যের আমার কোন দরকার নাই। তাই আল্লাহপাক হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর প্রশংসায় পাক কুরআনে ঘোষণা করিলেন, "আর ইব্রাহিম তাহার বাক্য পূর্ণ করিয়াছিলেন অর্থাৎ স্বীয় কথার সত্যতা রক্ষা করিয়াছিলেন।"

অর্থাৎ বিপদের চরম মুহূর্তেও তিনি জিব্রাইলের সাহায্যকে প্রত্যাখান করিয়া আল্লাহর উপর নির্ভরশীল থাকিলেন। আল্লাহপাক তাহার জন্য অগ্নিকে শান্তিপ্রদ করিয়া দিলেন। আসল কথা হইলঃ তাওয়াক্কুলের শ্রেষ্ঠতম স্তরের গুণার্জনকারী মুতাওয়াক্কিলবর্গ খোদার ইচ্ছার নিকট মৃতবৎ পড়িয়া থাকেন। খোদাতায়ালাও তাহাদের কার্যগুলো নিজ হইতে সমাধা করিয়া দেন। তাহারা খোদার নির্দেশেই আহার করেন, খোদার নির্দেশেই পোশাক পরিধান করেন। হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেব তাহার "ফতুহুল গায়েবে" বলেন, আমি তো পানাহারও করি না, যতক্ষণ না আমাকে বলা হয়, হে আব্দুল কাদের! তোমাকে পানাহার করিতে হইবে। আমি পোষাক পরি না, যতক্ষণ না বলা হয় যে, এক হাত পরিমান এক দীনার দামের কাপড় তোমাকে পড়িতে হইবে। আমি কথা বলি না, যতক্ষণ না আমাকে বলা হয়, তোমাকে কথা বলিতে হইবে।"

ইহাই হইল উচ্চস্তরে মুতাওয়াক্কিলগণের স্বভাব। তাহাদের সমুদয় কর্মকান্ড আল্লাহতায়ালাই সম্পন্ন করেন। ইহাদের সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন,

وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

অর্থাৎ-"যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভরশীল, তাহার জন্য তিনিই যথেষ্ট।" (সূরা তালাকঃ ৩) তিনি আরও বলেন,

أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَه

অর্থাৎ-"আল্লাহ কি তাহার বান্দার জন্য যথেষ্ট নহে?” (সূরা জুমারঃ ৩৬)

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছেঃ "যে ব্যক্তি সবকিছু থেকে পৃথক হইয়া একমাত্র আল্লাহতায়ালার আশ্রয় প্রার্থনা করে, তিনিই তাহার সমস্ত কার্য নির্বাহ করিয়া দেন এবং সর্ববিষয়ে তিনিই তাহার জন্য যথেষ্ট হন, আর এমন স্থান হইতে তাহার রেজেক সরবরাহ করেন, যাহা কোন সময় তাহার কল্পনায়ও আসে নাই।

এতক্ষণের আলোচনায় তাওয়াক্কুলের সংজ্ঞা, তাৎপর্য এবং ইহার বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে আলোকপাত করা হইল। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, তাওয়াক্কুলের গুণ অর্জন করিতে হইলে সর্বাগ্রে খোদার সিফাত ও আফয়াল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত জাহেরী বা বাতেনী উপাস্যতুল্য উদ্দেশ্যসমূহকে কাতেল করা না যাইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আফ্যাল (ক্রিয়াকলাপ) বা সিফাত (গুণাবলী) এর নূর

লাভ করা কাহারো পক্ষেই সম্ভব নহে। ফলে তাওয়াক্কুলের গুণ অর্জনও সম্ভব নয়। আর প্রকাশ্য এবং গুপ্ত-উভয়ক্ষেত্রেই উপাস্য তুল্য যত উদ্দেশ্য আছে, তাহা ধ্বংস করিতে হইলে নাফসকে গ্রেফতার করা প্রয়োজন; প্রয়োজন শয়তানকে বিতাড়িত করার ক্ষমতা অর্জন করা। কিন্তু পীরে কামেলের সান্নিধ্য ও নেকদৃষ্টি ছাড়া নাফসের বন্ধন মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন, “তুমি যদি নাফসরূপী কাল সাপের ছোবল থেকে বাঁচিতে চাও, তবে নাফস হস্তা মোর্শেদে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর।"

পীরে কামেলের খেদমতের মাধ্যমে তাহার নেক দৃষ্টি অর্জন করিলে তবেই একজন খোদাঅন্বেষী নাফস, শয়তান ও দুনিয়ার বেড়ীমুক্ত হইয়া আধ্যাত্মিক জগতে ছায়ের করিয়া তাওয়াক্কুলের উচ্চতম স্তরের গুণ অর্জন করিয়া শ্রেষ্ঠতম স্তরের মুতাওয়াক্কিলের মর্যাদা প্রাপ্ত হইতে পারে।

এই জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে খোদাতালাশীকে পীরের হাতে তেমন থাকিতে হয়, যেমন ধৌতকারীর হাতে মুর্দা থাকে। তেমন থাকিলে পীর মুরীদকে রাসূলে পাক (সাঃ) এর কদমে সোপর্দ করেন। যাহা ফানা-ফির-রাসূলের স্তর। এখানে মুরীদ দয়াল নবী (সাঃ) এর সান্নিধ্যে আসহাবগণের মতই অবস্থান করিতে থাকে। অতঃপর মুরীদ বা খোদাতালাশীকে দয়াল নবী (সাঃ) খোদাতায়ালার হাতে সোপর্দ করেন। যেখানে ফানাফিল্লার স্তর হাছিল হয়। এখান থেকেই খোদাতালাশী খোদার হাতে (ধৌতকারীর নিকট) মুর্দার মত পড়িয়া থাকে। যাহা তাওয়াক্কুলের উচ্চতম স্তর।

হে জাকেরান! তোমরা যদি তাওয়াক্কুলের উচ্চতম স্তরের গুণে বিভূষিত হইতে চাও, তবে পীরের হাতে শবদেহের মত থাক। চেষ্টা কর-নাফস ও শয়তানের প্রভাব মুক্ত হওয়ার। আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD