Logo

খোদাতায়ালাকে চেনার পথে খওফের গুণ অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৮:৫৪
খোদাতায়ালাকে চেনার পথে খওফের গুণ অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন
ছবি: সংগৃহীত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ 'খওফ' ও 'রেজা'র আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

খওফ-এর আভিধানিক অর্থ ভয় এবং রেজার অর্থ আশা। খোদাপ্রাপ্তির পথে খওফ ও রেজা-উভয় গুণই খোদাঅন্বেষীর দেলে থাকিতে হইবে। অর্থাৎ খোদাঅন্বেষীর দেল খোদার ভয়ে যেমন উদ্বেলিত থাকিতে হইবে: তেমনি খোদাতায়ালার রহমত বা করুণার আশাতেও দেল পরিপূর্ণ থাকিতে হইবে। মহান খোদাতায়ালা কালামুল্লাহ শরীফে বান্দাকে যেমন খোদার ভয় দেলে পয়দা করার তাগিদ দিয়াছেন: তেমনি তদীয় রহমত হইতে নিরাশ হইতেও বারণ করিয়াছেন। পাক কালামে আল্লাহতায়ালা ফরমান,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَتِهِ وَ لَا تَمُوْتُنَّ اَلا وَأَنْتُمْ مُّسْلِمُونَ

অর্থাৎ-"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে তোমরা যথাযোগ্য ভয় কর। মরিও না তোমরা মুসলমান না হইয়া।" (সূরা আলে ইমরানঃ ১০২)

বিজ্ঞাপন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ

অর্থাৎ-“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।” (সূরা মায়েদাহঃ ৩৫) আল্লাহতায়ালা আরও বলেন,

فَلَا تَخْشَوُا النَّاسُ وَاخْشَوْنِ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-'তাই তোমরা লোকদেরকে ভয় করিও না; ভয় আমাকেই কর।" (সূরা মায়েদাহঃ ৪৪)

খোদার ভয় দেলে পয়দা করার তাগিদপূর্ণ আরও বহু আয়াত কুরআন শরীফে দৃষ্ট হয়। আল্লাহপাক চানঃ বান্দা তাহাকে যথাযথ ভয় করুক, খওফের গুণ অর্জন করুক। কোন বান্দার অন্তরে খওফের গুণ পয়দা হইলে সেই বান্দা খওফ (আল্লাহর ভয়) এর প্রভাবে যাবতীয় পাপ ও গোনাহ হইতে নিজেকে হেফাজত করিতে প্রয়াস চালায়। খওফের গুণ পর্ণ মাত্রায় বিকশিত হইলে সেই বান্দা বা খোদাঅন্বেষী সর্ববিধ পাপ হইতে নিজেকে হেফাজত করিতে সক্ষম হয়। কারণ খোদার ভয়ে সেই ছালেক বা খোদাঅন্বেষী সর্বদাই ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে; সদা শংকিত থাকে। এই খওফই তাহাকে পরহেজগারীর পোশাক দান করে। কাহারো দেলে খোদার ভয় বা খওফ পর্ণ মাত্রায় জমা হইলে তাহার মধ্যে নিম্নলিখিত অবস্থাদি পরিলক্ষিত হয়।

☆ খোদাভীরু ছালেক কম কথা বলে; মিথ্যা, বানোয়াট, গীবত, পরনিন্দা, পরচর্চা, অপবাদ, অপ্রীতিকর কথাবার্তা ও অহেতুক বাক্যালাপ থেকে বিরত থাকে। তাহার জিহ্বা সর্বদাই আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর গুণগানে সিক্ত থাকে।

বিজ্ঞাপন

☆ খোদার ভয়ে উদ্বেলিত ছালেকের অন্তর বা কালব সর্বদাই আল্লাহর জেকেরে রত থাকে, দুনিয়ার মহব্বতমুক্ত থাকে। হিংসা, বিদ্বেষ, অহেতুক শত্রুতা পোষণ তথা যাবতীয় ব্যাধি হইতে তাহার দেল পবিত্র থাকে।

☆ উক্ত ব্যক্তি তাহার দৃষ্টিকে নিষিদ্ধ বিষয়াদির প্রতি নিক্ষেপ করা হইতে বিরত রাখে। অধিকন্ত আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি ও কুদরতের প্রতি দৃষ্টি করিয়া শিক্ষা বা তালিম গ্রহণ করে।

☆ খোদাভীরু ব্যক্তি নিজ উদরকে হারাম পন্থায় উপার্জিত রিযিক হইতে হেফাজত করে। হারাম খাদ্য ভক্ষণ মহাপাপ।

বিজ্ঞাপন

☆ উক্ত ছালেক (মুত্তাদী) তাহার হাতকে কখনও হারাম ও নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি প্রসারিত করে না। বরং সাধ্যানুযায়ী সর্বদা সে তাহার হাতকে আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করে।

☆ সে তাহার পদদ্বয়কে আল্লাহতায়ালার নাফরমানি ও অবাধ্যতার কাজে ব্যবহার করে না।

☆ সে সর্বদাই আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকিতে চেষ্টা করে।

বিজ্ঞাপন

☆ ইবাদতে ভুল-ত্রুটি হইলে অনুতপ্ত হৃদয়ে খোদার শাহী দরবারে অঝরে ক্রন্দন করে।

☆ সে নির্জনে নীরবে ক্রন্দন করিতে বেশী পছন্দ করে।

☆ খোদার সন্তুষ্টি বা রেযা লাভের আশায় কঠোর রেয়াযত করিতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

☆ খোদাভীরু ব্যক্তি অল্প নিদ্রা যায়। কম আহার করে।

☆ আল্লাহর শাস্তি প্রদান সম্পর্কীয় আয়াত শ্রবণে উক্ত ছালেকের হৃদয় ও দেহ কম্পিত হয়।

যথার্থ খোদাভীরু বা খওফের গুণ হাছিলকারীর মধ্যে উল্লিখিত অবস্থাদি নিশ্চয়ই দৃষ্ট হইবে।

বিজ্ঞাপন

খোদাতায়ালাকে চেনার পথে খওফ-এর গুণ অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। খওফ-এর গুণ বিবর্জিত ব্যক্তি পাপ হইতে নিজেকে রক্ষা করিতে পারে না, নাফস ও শয়তানের আক্রমণ প্রতিহত করিতে পারে না। নাফস ও শয়তানের আক্রমণের মোকাবেলায় খওফ ও তাকওয়া ঢাল স্বরূপ কাজ করে।

খওফের গুণ অর্জনের উপায়ঃ

খওফের গুণ হাছিল করিতে হইলে আল্লাহপাকের সিফাতের নূর অর্জন করিতে হইবে। আসমা (নাম) ও সিফাতের (গুণের) বৃত্তে আল্লাহপাকের বহু গুণ (সিফাত) ও গুণবাচক নাম (আসমা) বর্তমান। তন্মধ্যের বেশ কিছু গুণ ও গুণবাচক নাম আছে যাহা আল্লাহতায়ালার অসীম ক্ষমতা, প্রতাপ, মুখাপেক্ষীহীনতা, বেপরোয়া ইত্যাদি গুণের প্রকাশক ও পরিচায়ক। যেমন, আযীয (পরাক্রমশালী), জব্বার (মহা ক্ষমতাশালী), কাহ্হার (মহা শাস্তিদাতা), ছামাদ (অভাবহীন), কাদীর (সর্বশক্তিমান), মুক্তাদীর (মহা ক্ষমতাশালী), মাতীন (দৃঢ়, অটল) ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন

কোন ছালেক বা খোদাঅন্বেষী যখন আত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে খোদাতায়ালার সিফাত রাজ্যে প্রবেশ করিয়া উল্লিখিত গুণ ও গুণবাচক নামসমূহের মধ্যে ছায়ের (ভ্রমণ) করিয়া সিফাতি নূর লাভ করে বা তাজাল্লীয়াতে সিফাতের কারেন্ট অর্জন করিতে সক্ষম হয়-সেই ছালেকের দেলে খোদাতায়ালার যথার্থ খওফ বা ভয় পয়দা হয়। যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ পরিত্যাগ করিতে সে সক্ষম হয়। বাইন মাছ যেমন কাঁদায় বাস করিয়াও কাঁদা হইতে বাঁচিয়া থাকিতে পারে; তেমনি উল্লিখিত সিফাতসমূহের নূরপ্রাপ্ত সাধক আল্লাহতায়ালার অসীম ক্ষমতা, দোর্দন্ড প্রতাপ, অভাবশূন্যতা, শাস্তিদানে কঠোরতা ইত্যাদি সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞানপ্রসূত খোদার ভয়ে বা খওফের প্রভাবে পাপের আবিলতা পূর্ণ দুনিয়াতে পাপ মুক্ত থাকিতে পারে।

খওফের সাথে রেজাও প্রয়োজনঃ

কেবলমাত্র খওফের গুণ অর্জন করিলেই চলিবে না। একই সাথে রেজা (আশা)-এর গুণও হাছিল করিতে হইবে। কেবলমাত্র খওফের মাকাম হাসিলকারী সাধকের দেলে কখনও কখনও নৈরাশ্য বা আশা শূন্যতা সৃষ্টি হইতে পারে-যে আশাশূন্যতা সাধকের ঈমানশূন্যতার কারণও হইতে পারে। কারণ নিরাশ ব্যক্তিদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। তাই নৈরাশ্য অনেক সময় খোদাঅন্বেষীর মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করিয়া তাহাকে খোদা হইতে দূরে সরাইয়া দিতে পারে। তাই আল্লাহপাক রহমতের আশাশূন্য ব্যক্তিদেরকে বা রেজার গুণ বর্জিত মানুষদেরকে অবিশ্বাসীদের সম্প্রদায়ভুক্ত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কালামুল্লাহ শরীফে প্রকাশঃ

বিজ্ঞাপন

إِنَّهُ لَا يَأَيْنَسُ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَفِرُونَ

অর্থাৎ-"কাফেররা ব্যতীত কেহই আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ হয় না।" (সূরা ইউসুফঃ ৮৭)

পাক কুরআন শরীফে প্রকাশঃ

وَمَنْ يَقْنَطُ مِنْ رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ

অর্থাৎ-“এবং পথভ্রষ্ট ছাড়া কে আর রবের রহমত হইতে নিরাশ হয়?" (সূরা হিজ্বরঃ ৫৬) আল্লাহপাক অন্যত্র আরও ফরমান,

قُلْ يُعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ - إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّه هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

অর্থাৎ-"ঘোষণা কর এই বাণীঃ হে আমার বান্দারা! তোমরা নিজেদের প্রতি যাহারা যুলুম করিয়াছ, তাহারা যেন আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ না হও, আল্লাহ যাবতীয় গোনাহ মাফ করিয়া দিবেন; তিনি ক্ষমাকারী ও করুণাময়। (সূরা যুমারঃ ৫৩)

অর্থাৎ-খওফের গুণের সংগে রেজার গুণও অর্জন করিতে হইবে খোদাতায়ালার ভয় দেলে পয়দা করার সংগে সংগে আল্লাহতায়ালার রহমতের আশাও হৃদয়ে পোষণ করিতে হইবে।

রেজার গুণ অর্জনের উপায় কি? রেজার গুণ বা মাকাম হাছিল করিতে

হইলে সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূর অর্জন করিতে হইবে। সিফাতের নূর লাভ করিতে হইলে সিফাতের জগত ছায়ের পূর্বক সিফাতের জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে। সিফাতের জগতে আল্লাহতায়ালার দয়া ও করুণা প্রকাশক ও নির্দেশক বহু গুণ ও গুণ বাচক নাম বর্তমান। যেমন, রহমান (পরম করুণাময়), রাহীম (পরম দয়াময়), সালাম (শান্তিময়), গাফ্ফার (মহা ক্ষমাশীল), হালীম (করুণাময়, সহিষ্ণু), গাফুর (ক্ষমাশীল), রাউফ (অত্যন্ত দয়ালু), মান্নান (অত্যন্ত অনুগ্রহশীল) ইত্যাদি।

কোন ছালেক যখন জাগ্রত রূহের মাধ্যমে উল্লিখিত নাম ও গুণ সমূহের মধ্যে ছায়ের করিয়া জ্ঞান অর্জন করিতে থাকে ও সিফাতি নূর লাভকরিতে থাকে, সেই ছালেক সিফাতি নূরের প্রভাবে আল্লাহতায়ালার অসীম দয়া, সীমাহীন করুণা, নিঃশর্ত ক্ষমা ইত্যাদি গুণের পরিচয় লাভকরিয়া যথার্থ রেজার গুণ হাছিল করে; খোদার রহমতের আশায় তাহার দেল পূর্ণ হয়। ফলে একদিকে খোদার ভয় (খওফ) ও অন্যদিকে খোদাতায়ালার রহমতের আশা (রেজা) ছালেককে খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে দ্রুত আগাইয়া নেয়। খওফ ও রেজাকে পাখীর দুই ডানার সাথে তুলনা করা যায়। পাখী যেমন তাহার ডানাদ্বয়ে ভর করিয়া দূর হইতে দূরে গমন করে, তেমনি ছালেক খওফ ও রেজার পাখার উপর ভর করিয়া মারেফাতের আকাশে দ্রুত উডডয়নের মাধ্যমে খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি (রেযা) ও সান্নিধ্যের মাকাম পর্যন্ত পৌছাইতে পারে।

রেজার পরিচয়ঃ

খওফের যথার্থ পরিচয় তাকওয়ার অধ্যায়ে দেওয়া হইয়াছে। এই স্থলে রেজার পরিচয় দেওয়া হইতেছে। রেজার আভিধানিক অর্থ ভবিষ্যতের কল্যাণ কামনায় হৃদয়ে আশা পোষণ করা।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, কোন কৃষক উত্তম বীজ সংগ্রহপূর্বক সময়মত উর্বর জমিতে তাহা বপন করে। অতঃপর পানি সিঞ্চন করে। আগাছা পরিচ্ছন্ন করে। পোকামাকড়ের আক্রমণ হইতে বীজ বা অংকুরিত চারা গাছ রক্ষার জন্য কীটনাশক ঔষধ প্রয়োগ করে। অধিক ফসল উৎপন্নের জন্য সার প্রয়োগ করে। অর্থাৎ একজন আদর্শ কৃষক চেষ্টা ও তদবীরের যতটুক সম্ভব ততটুক চেষ্টা-তদবীর বা উপায় অবলম্বন করে। অতঃপর উত্তম ফসলের আশায় খোদার উপর নির্ভর করিতে থাকে। এই অবস্থায় কৃষকের আশাকে রেজার পর্যায়ভুক্ত বলা যায়। একজন মানুষের জন্য এই দুনিয়াবী জীবন হইল আখেরাতের ফসল উৎপাদনের উপযুক্ত সময়, কালব হইল উর্বর জমি, ঈমান হইল উত্তম বীজ, পানি সেচন করার অর্থ আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশিত পথে নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগী করা, আগাছা পরিস্কারের করার অর্থ দুনিয়ার মহব্বত দেল হইতে ঝাড়িয়া ফেলা, কীটনাশক ঔষধ প্রয়োগ করার অর্থ নাফস ও শয়তানরূপ পোকার আক্রমণ হইতে দেলকে হেফাজত করার জন্য রেয়াযতের গুণ হাছিল করা।

কোন খোদাঅন্বেষী যদি তাহার কালবরূপ উর্বর জমিতে ঈমানরূপ বীজ বপন করিয়া দুনিয়াবী মহব্বতরূপ আগাছা পরিচ্ছন্ন করিয়া নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগীরূপ পানি সিঞ্চন করিতে থাকে এবং নাফস ও শয়তানরূপ পোকার আক্রমণ হইতে দেলকে হেফাজতের জন্য রেয়াযত করিতে থাকে, অতঃপর উত্তম ফসলরূপ খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে খোদার রহমতের আশা করিতে থাকে-তবে তাহার এই 'আশা'কে বলা হইবে রেজা। কিন্তু কেহ যদি জমিতে বীজ বপন অন্তে আগাছা পরিচ্ছন্নসহ কীট নাশকও প্রয়োগ করে, অথচ পানি সেচের ব্যবস্থা না করিয়া বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকিয়া উত্তম ফসলের আশা করে তবে তাহার আশাকে বলা হইবে 'তামান্না' বা অস্বাভাবিক আশা। তেমনি কোন ঈমানদার ঈমান আনয়নের পরে যদি আমল না করিয়া আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা করে, তবে তাহার আশা আর রেজার পর্যায়ভুক্ত থাকিল না, তাহার এই আশাকে বলা হইবে তামান্না বা অস্বাভাবিক আশা। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,

لَيْسَ الدِّينُ بِالتَّمَنَّى

অর্থাৎ- 'অস্বাভাবিক আশা করিয়া বেকার বসিয়া থাকিলে ধর্মীয় কর্তব্য সম্পন্ন হয় না।' তবে যে আশার কথা তোমাদিগকে বলিতেছি তাহা তামান্না নহে-তাহা রেজা। যথাসাধ্য চেষ্টা ও তদবীর অন্তে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য আল্লাহর রহমতের আশা করা। যে ছালেক যথাযথ ইবাদত-বন্দেগী ও রেয়াযত করিতে থাকে এবং খোদার সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভের ইচ্ছায় খোদার রহমতের আশা করিতে থাকে-তাহার মধ্যে রেজার গুণ আছে বলিয়া মনে করিতে হইবে।

রেজার গুণ অর্জনের উপায়ঃ

পূর্বেই বলিয়াছি, রেজার গুণ অর্জিত হয় তাজাল্লীয়াতে সিফাতি নূরের কারেন্টে। যতক্ষণ পর্যন্ত বেলায়েতে ছোগরাকে অতিক্রম করিয়া আকরাবিয়াত (প্রেমের হেরেম)-এ উপনীত হওয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত যথাযথ সিফাতি নূর সাধকের ভাগ্যে জোটে না। অবশ্য বেলায়েতে ছোগরার দায়েরাতে সিফাতে এজাফিয়ার নূর পাওয়া যায়। বেলায়েতে ছোগরা ও বেলায়েতে কোবরার দায়েরায় প্রাপ্ত সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূরে খোদা অন্বেষীর মধ্যে রেজার (আশার) যথাযথ গুণ উৎপন্ন হয়। কিন্তু সিফাতের জগত পর্যন্ত উপনীত হওয়াতো সহজ কথা নয়। পথিমধ্যে বহু শত্রুর শত্রুতা ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করিয়া খোদাঅন্বেষীকে আল্লাহময় জগতের দিকে অগ্রসর হইতে হয়। তরিকতের রাস্তায় প্রত্যেক মোড়ে মোড়ে নাফস ও শয়তান সত্য পথের পথিককে লাইনচ্যুত করার জন্য ওঁৎ পাতিয়া বসিয়া আছে। নাফসের ধোকা ও শয়তানের ওয়াসওয়াসা হইতে নিজেকে হেফাজতে রাখা অত্যন্ত কঠিন। এই বন্ধুর রাস্তায় চলিতে সকল খোদাঅন্বেষীই কিছু না কিছু ভুল-ত্রুটি করিয়া ফেলে। তেমন ক্ষেত্রেও আল্লাহপাক নিরাশ হইতে বারণ করিয়াছেন। আল্লাহপাক বলিয়াছেন,

لا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ

অর্থাৎ- '(তোমরা) আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ হইও না।' (সূরা ঘুমারঃ ৫৩)

ছালেকের কর্তব্যঃ যখনই ভুল-ত্রুটি হয়, অন্যায় বা পাপ হয়, তখনই মহান খোদাতায়ালার নিকট অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা। অনুতাপের হাত আল্লাহতায়ালা ফেরত দেন না। হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলেন,

"অনুতাপ-নিপীড়িত ব্যথিত জনের

শক্তি ধরে অস্ত্রধারী শত সিপাহের।"

অর্থাৎ- 'একশত সিপাহী ঢাল-তলোয়ারসহ যে শক্তি না রাখে, অনুতাপের হাত তাহার চেয়েও বেশী শক্তি রাখে।'

ফলে অনুতপ্ত ছালেক তখন খোদাতায়ালাকে গাফ্ফার (মহা ক্ষমাশীল) হিসাবেই দেখিতে পাইবে। আল্লাহতায়ালার গাফ্ফারিয়াত (ক্ষমা)-এর নূরে ছালেকের দেলে প্রেম পয়দা হইবে। সেই প্রেমই ছালেককে সিফাতি জগতে উপনীত করিবে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছেঃ রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন, মানুষ যখন কোন পাপ কার্য করিবার পরক্ষণেই অনুতপ্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করিতে থাকে, তখন করুণাময় আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলেন, "হে ফেরেশতাগণ! তোমরা দেখ, আমার বান্দা একটি পাপ কার্য করা মাত্রই বুঝিতে পারিয়াছে যে, আমি ভিন্ন আর কেহ তাহার মালিক নাই যে তাহাকে পাপের জন্য পাকড়াও করিতে পারে এবং পরিশেষে ক্ষমা করিয়া দিতে পারে। আমি তোমাদিগকে সাক্ষী করিয়া বলিতেছি যে, আমি তাহার পাপ ক্ষমা করিয়া দিলাম।"

আল্লাহপাকের ক্ষমা সম্পর্কীয় বহু বাণী হাদীসের কিতাবসমূহে দেখা যায়, রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন যে, আল্লাহতায়ালা বলেন, "আসমান পরিপূর্ণ হইয়া যায় এত পরিমাণ পাপ কার্য করিয়াও যদি আমার বান্দা আমার দরবারে ক্ষমার প্রত্যাশী হয়, তবে আমি তাহাকে ক্ষমা করিয়া থাকি। আবার যদি আমার বান্দা ভূমন্ডল পূর্ণ হইয়া যাওয়ার পরিমাণ গুণাহ করিয়া আমার নিকট অনুতপ্ত হয়, তবে আমিও তাহার জন্য ভূমন্ডল পরিপূর্ণ হওয়ার পরিমাণ দয়া প্রকাশ করিয়া থাকি।"

রাসূলে পাক (সাঃ) আরও বলিয়াছেন, "বান্দা পাপ কার্য করিলে ফেরেশতা উহা তাহার আমলনামায় লিপিবদ্ধ করিয়া থাকে।" সভাস্থ একজন বেদুইন তখন জিজ্ঞাসা করিল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! যদি উক্ত পাপী লোকটি পরে সেই পাপ হইতে তওবা করে, তবে তাহার কি অবস্থা হইবে?" রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন, "তওবা করিলে সে পাপ মুছিয়া ফেলা হইবে।" বেদুইন লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করিল, "সে ব্যক্তি যদি আবার পাপ করে?" হুজুর (সাঃ) বলিলেন, "আবার লিপিবদ্ধ হয়।" সে জিজ্ঞাসা করিল, "যদি সে আবার তওবা করে?" তিনি বলিলেন, "আবার মুছিয়া ফেলা হয়।" বেদুইন বলিল, "এই রূপে কতবার মুছিয়া ফেলা হইবে?" রাসূলে করীম (সাঃ) বলিলেন, "যতবার পাপী ব্যক্তি পাপ করিয়া পরে অনুতাপের সহিত তওবা করিবে, ততবারই পাপ মুছিয়া ফেলা হইবে। পাপী ব্যক্তি যতক্ষণ তওবা করিয়া পরিশ্রান্ত বা বিরক্ত না হইবে, ততক্ষণ করুণাময়ও অনুগ্রহ পূর্বক ক্ষমা করিতে বিরক্ত হইবেন না।" আর বান্দা সৎকার্য করিবার ইচ্ছা করিলে কার্যে পরিণত করার পূর্বেই কেবলমাত্র ইচ্ছা করার জন্য ফেরেশতাগণ তাহার আমলনামায় একটি নেকী লিখিয়া ফেলে, বান্দা উক্ত কার্যটি করিলে ফেরেশতাগণ তজ্জন্য দশটি নেকী লিপিবদ্ধ করে। নিয়ত ও কার্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই পুণ্য ফেরেশতাগণ সাতশতগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করিতে থাকে। পক্ষান্তরে মানুষ কোন পাপ কার্যের ইচ্ছা করিলে-এই ইচ্ছা করার জন্য কোন পাপ লিখিত হয় না। কার্যটি সমাধা করিলে ফেরেশতাগণ একটি মাত্র পাপ লিপিবদ্ধ করিয়া থাকেন। তাহাও আল্লাহ ইচ্ছা করিলে সমূলে ক্ষমা করিতে পারেন।

আল্লাহপাক অসীম দয়ালু ও অপার করুণাময়। তাহার দয়া ও করুণার কোন পারাপার নাই। হাদীস শরীফে প্রকাশঃ দয়াল নবী (সাঃ) বলেন, "অপার করুণাসিন্দু আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি জগতকে সৃষ্টি করিবার পূর্বেই নিজের সম্বন্ধে এই কথা লিখিয়া লইয়াছেন যে, আমার করুণা ও অনুগ্রহ চিরদিনই আমার ক্রোধের উপর প্রবল জয়ী থাকিবে।"

একদা কোন এক বেদুইন লোক রাসূলে পাক (সাঃ) খেদমতে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কাল কিয়ামতের মাঠে হিসাব নিকাশ কে লইবেন? তিনি উত্তর করিলেন, "আল্লাহতায়ালা"। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করিলেনঃ আল্লাহতায়ালা নিজেই কি হিসাব নিকাশ গ্রহণ করিবেন? হুযুর (সাঃ) বলিলেন, 'হ্যা'। বেদুইন লোকটির মুখখানা ইহা শ্রবণে প্রফুল্ল হইয়া উঠিল। হুযুর (সাঃ) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "ইহাতে তোমার এত প্রফুল্ল হওয়ার কারণ কি?" সে উত্তর করিল, "আমার বেশ জানা আছে যে, কোন দয়ালু বিচারক যখন কোন অপরাধীকে কাবুতে পান, তখন তাহাকে দন্ডিত না করিয়া ক্ষমা করিয়া থাকেন। আবার বিচার আরম্ভ করিলেও সদয় হইয়া নিতান্ত সহজভাবে বিচার করিয়া থাকেন। আল্লাহতায়ালা করুণাময়, তিনি স্বয়ং বিচারের ভার গ্রহণ করিলে পাপী লোকদের যথেষ্ট আশা আছে।" ইহা শ্রবণে উপস্থিত লোকদিগকে লক্ষ্য করিয়া হুযুর (সাঃ) বলিলেন, এই বেদুইন লোকটি সত্য বলিয়াছে। আল্লাহতায়ালার চেয়ে দয়ালু আর কেহ নাই। এই লোকটি নিশ্চয় একজন ধী-শক্তি সম্পন্ন বিচক্ষণ জ্ঞানবান লোক।"

রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেনঃ করুণাসিন্দু আল্লাহতায়ালা তাহার করুণার সাগরকে একশতভাগে বিভক্ত করিয়া তাহা হইতে নিরানব্বই ভাগ কিয়ামতের দিন মহা সংকট কালে বান্দাগণের মধ্যে বিতরণের জন্য রাখিয়া দিয়া বাকী একভাগ মাত্র ইহলোকে সমগ্র জগতের মধ্যে প্রকাশ করিতেছেন, সেই মাত্র এক ভাগ দয়ার প্রভাবে পৃথিবীর সমস্ত অন্তর দয়ালু হইয়া পড়িয়াছে। মাতার দয়া সন্তানের উপর, ইতর প্রাণীর দয়া উহাদের বাচ্চার উপর সেই একভাগ হইতে আসিয়া থাকে। সেই এক ভাগ দয়াও কিয়ামতের মহা বিচার কালে গচ্ছিত নিরানব্বই ভাগের সহিত একত্র করত পূর্ণ একশত ভাগ দয়াই আল্লাহতায়ালা সে দিন মানুষের উপর প্রকাশ করিতে থাকিবেন। পৃথিবী ও আকাশের যে বিস্তৃতি ও উচ্চতা রহিয়াছে, আল্লাহতায়ালার দয়ার প্রত্যেকটি শতাংশ তাহা অপেক্ষা বহুগুণে অধিক উচ্চ ও বিস্তৃত হইবে। সে দিন কোন মানুষেরই সর্বনাশ এবং বিনাশ ঘটিবে না, তবে আযলে অর্থাৎ সৃষ্টির পূর্বে যাহার অদৃষ্টে যেরূপ লিপিবদ্ধ হইয়াছে, তাহারও ব্যতিক্রম ঘটিবে না।

কিতাবে দেখা যায়, রাসূলে পাক (সাঃ) এর সময়ে কোন এক যুদ্ধে জনৈক বালক তাহার মাতাসহ বন্দী হইয়া মুসলিম শিবিরে আনীত হয়। বালকটি শিবিরের বাহিরে ছিল। সেই দিন রোদ্রের তাপ অত্যন্ত প্রচন্ড থাকায় প্রখর রৌদ্রের উত্তাপে বালকটি ছটফট করিতে লাগিল। বালকটির দুরবস্থার প্রতি দৃষ্টি পতিত হওয়া মাত্র তাহার মাতা নিতান্ত

ব্যাকুল ও বিহবল হইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে শিবির হইতে দৌড়াইয়া বালকের নিকট পৌঁছিল। রমণীর বিহবলতা দেখিয়া পার্শ্ববর্তী লোকেরাও তাহার সহিত দৌড়াইয়া গেল। রমণী নিতান্ত স্নেহাবেগে বালকটিকে উঠাইয়া স্বীয় বক্ষের সহিত মিলাইয়া এবং বালকটিকে রৌদ্রের তাপ হইতে রক্ষা করার জন্য নিজের শরীরের ছায়ায় রাখিয়া সস্নেহে তাহার ঘর্মাক্ত মুখের ঘাম বস্ত্রাঞ্চলে মুছিতে মুছিতে বলিতে লাগিলঃ "এইটি আমার পুত্র।" পুত্রের দুরবস্থার জন্য স্নেহের আবেগে স্ত্রী লোকটির চক্ষু হইতে অশ্রুধারা নামিয়া আসিল। উপস্থিত দর্শকবৃন্দও মাতার স্নেহব্যাকুলতা ও কাতরতা দর্শনে রোদন করিতে লাগিল। ইতিমধ্যে তথায় দয়াল নবী (সাঃ) আসিয়া উপস্থিত হইলেন। লোকজন স্ত্রী লোকটির সমস্ত ঘটনা তাঁহাকে জানাইলে তিনি রমণীর পুত্রস্নেহে এবং দর্শকবৃন্দের কান্দাকাটির কথা শ্রবণ করিয়া সন্তুষ্ট হইলেন এবং বলিতে লাগিলেনঃ তোমরা পুত্রের প্রতি এই মাতার স্নেহের আতিশয্যে ও দয়ার আধিক্য দেখিয়া বিস্ময় বোধ করিতেছ কি? লোকেরা উত্তর করিলঃ জ্বী হ্যা! এমন আশ্চর্য ও বিচিত্র সন্তান বাৎসল্য আমরা আর কখনও দেখি নাই। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলিলেন, নিজ সন্তানের প্রতি এই স্ত্রী লোকটির যেরূপ স্নেহ ও দয়া, মহান করুণাময় আল্লাহতায়ালার দয়া ও করুণা তোমাদের প্রতি তদপেক্ষা বহুগুণে অধিক!"

আর এক হাদীস পাকে প্রকাশঃ রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন, কিয়ামতের ময়দানে আমার উম্মতমন্ডলীর মধ্য হইতে এক ব্যক্তিকে সমস্ত মানুষের সম্মুখে উপস্থিত করা হইবে এবং তাহার পাপ-পুণ্যের হিসাব-নিকাশ আরম্ভ হইবে। তাহার পাপরাশি লিখিত নিরানব্বই খানা খাতা তাহার সম্মুখে স্তূপাকারে পেশ করিয়া বলা হইবেঃ দেখত, এই খাতাসমূহে লিখিত পাপগুলির মধ্যে কোন একটিও পাপ কি তুমি অস্বীকার করিতে পার? এই পাপ কার্যগুলি লিপিবদ্ধ করিতে ফেরেশতাগণ কোন ত্রুটি বা অন্যায় করিয়াছে কি? সে ব্যক্তি নিবেদন করিবে, হে প্রভু! ইহার মধ্যে আপত্তি বা অস্বীকার করিবার কিছুই নাই। আল্লাহতায়ালা পুনরায় বলিবেন, তোমার আর কিছু বলিবার আছে কি? সে নিবেদন করিবে, হে দয়াময়! আমার কিছুই বলিবার নাই। তখন তাহার পূর্ণ বিশ্বাস হইবে যে এখনই তাহাকে দোযখের দিকে যাইতে বলা হইবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে করুণাময় আল্লাহতায়ালা বলিবেন, হে বান্দা! আমার নিকট তোমার একটি মাত্র পুণ্য বা নেকী আছে। আমি তোমার প্রতি যুলুম করিব না। অতঃপর একখন্ড কাগজ বাহির করা হইবে-তাহাতে লিখিত থাকিবে কলেমায়ে শাহাদাত- "আশহাদু আল্লাইলাহা ইল্লাল্লাহু অ'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু অ রাসূলুহু"-অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই এবং ইহাও সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুহাম্মদ (সাঃ) তাহার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল।

কাগজের টুকরাখানি দেখিয়া লোকটি বলিবে, "আমার পাপরাশি লিখিত এত বড় বড় নিরানব্বই খানা খাতার মোকাবেলায় এই ক্ষুদ্র কাগজখানী কি কাজে আসিবে?" আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে বলা হইবেঃ হে বান্দা! তোমার প্রতি বিন্দু পরিমাণ যুলুম করা হইবে না। অতঃপর দাড়ীপাল্লা কায়েম করিয়া এক পাল্লায় তাহার পাপরাশি লিখিত নিরানব্বই খানা খাতা এবং অপর পাল্লায় কলেমায়ে শাহাদাত লিখিত সেই ক্ষুদ্র কাগজ খানা রাখা হইবে। আল্লাহতায়ালার দয়া ও করুণায় সেই ক্ষুদ্র কাগজখন্ড সমস্ত পাপরাশির স্তুপীকৃত খাতাগুলি অপেক্ষা ভারী হইবে। ইহার কারণ এই যে, আল্লাহতায়ালার তওহীদ অর্থাৎ একত্বে বিশ্বাস দৃঢ়রূপে অন্তরে জাগ্রত থাকিলে কোন পাপই তাহার বিরুদ্ধে টিকিতে পারে না। অতঃপর লোকটিকে বেহেশতে লইয়া যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হইবে।

হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছেঃ রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন, আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদিগকে আদেশ করিবেন, যে ব্যক্তির অন্তরে মাত্র এক রতি পরিমাণ নেকী তথা পুণ্য আছে তাহাকে দোযখ হইতে বাহির করিয়া আন। তঅনুসারে ফেরেশতাগণ উক্তরূপ বহু লোককে দোযখ হইতে বাহির করিয়া আল্লাহতায়ালার সমীপে নিবেদন করিবে, "ইয়া আল্লাহ! অন্তরে বা কালবে এক রতি পরিমাণ পুণ্য বিশিষ্ট একজন লোকও আর দোযখে অবশিষ্ট নাই।" পুনরায় আল্লাহতায়ালা বলিবেন, "যাহাদের অন্তরে অর্ধ রতি পরিমান পুণ্য আছে তাহাদিগকে বাহির করিয়া আন।" ফেরেশতাগণ তনুসারে বহু লোককে বাহির করিয়া আনিলে পুনরায় আদেশ হইবেঃ "যাহাদের অন্তরে এর রেণু পরিমানও পুণ্য আছে তাহাদিগকেও বাহির করিয়া আন।” ফেরেশতাগণ হুকুম মোতাবেক বহু লোককে বাহির করিয়া আনিয়া নিবেদন করিবেন, "এখন দোযখের মধ্যে এমন একজন লোকও অবশিষ্ট নাই যাহার অন্তরে এক রেণু পরিমান পুণ্য আছে।"

অনন্তর আল্লাহতায়ালা বলিবেন, "পয়গম্বরগণের সুপারিশে ফেরেশতাদের সুপারিশে এবং নেককারদের সুপারিশে অনেক কিছুই করা হইয়াছে এবং বহু লোককে দোযখ হইতে মুক্তি দেওয়া হইয়াছে। অতঃপর যাহাদের অন্তরে রেণু পরিমাণ পুণ্য ছিল তাহারাও মুক্তি পাইয়াছে। এখন আমার করুণা ও দয়া ভিন্ন আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। এই বলিয়া তিনি স্বীয় পূর্ণ করুণার হস্ত প্রসারণ পূর্বক স্বীয় মুষ্টিতে

ভরিয়া এমন লোকদিগকে উঠাইয়া লইবেন যাহারা জীবনে এক রেণু পরিমাণ নেকীও করে নাই, যাহারা দোযখের আগুনে পুড়িয়া অংগারের ন্যায় কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করিয়া থাকিবে, তাহাদিগকে বেহেশতের 'নহরুল হায়াত' নামক নহরের পানিতে নিক্ষেপ করা হইলে তথা হইতে তাহারা এমন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হইয়া বাহিরে আসিবে যে, বন্যার স্রোতে বিধৌত পলি মাটি হইতে সদ্য উদ্‌গত উদ্ভিদরাজির ন্যায় তাহাদের দেহে চাকচিক্য ফুটিয়া উঠিবে। স্বর্গীয় উজ্জল ও দীপ্তিমান মহামূল্য রত্ন রাজির মালা তাহাদের গলদেশে ঝুলিতে থাকিবে। বেহেশতীরা তাহাদিগকে দেখিয়া চিনিতে পারিয়া পরস্পর বলাবলি করিতে থাকিবেঃ ইহারা পৃথিবীতে কোন দিন বিন্দু পরিমাণ নেকীও করে নাই, কেবল করুণাময়ের অপার করুণায় আজ ইহারা এমন সৌভাগ্য লাভ করিয়াছে। দয়াময় খোদাতায়ালা পাপীদেরকে বেহেশতে ছাড়িয়া দিয়া বলিবেনঃ যাও, যাহাকিছু তোমাদের দৃষ্টিগোচর হইতেছে-সবকিছু তোমাদের জন্য। তাহারা অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যের সুখ দর্শন করতঃ আনন্দ আতিশয্যে নিবেদন করিবেন, হে দয়াময়! তুমি আমাদিগকে যে নেয়ামত দান করিলে এই রূপ নেয়ামত বোধ হয় আর কাহাকেও দান কর নাই। উত্তর আসিবে, তোমাদের জন্য আমার নিকট ইহা অপেক্ষা আরও উৎকৃষ্ট নেয়ামত নির্ধারিত রহিয়াছে। তাহারা বলিবে, "হে করুণাময়! ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আর কি হইতে পারে?” উত্তর আসিবে, "তাহা আমার সন্তুষ্টি। অতঃপর আমি তোমাদের প্রতি এমন সন্তুষ্ট থাকিব যে, আর কখনও তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হইব না।"

কোন ছালেক যখন আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও রেয়াযতের মাধ্যমে দায়েরায়ে এমকান অতিক্রম করিয়া বেলায়েতে ছোগরার নূরময় জগতে পৌছায়, তখন নূরময় জগতস্থিত আল্লাহতায়ালার বহু এজাফি সিফাতযুক্ত নাম যেমন রহমান (করুণাময়), রহীম (দয়াময়), সালাম (শান্তিময়), গাফ্ফার (ক্ষমাশীল) ইত্যাদি ছায়ের পূর্বক সিফাতি নূর লাভ করিয়া আল্লাহতায়ালার অপার করুণা ও দয়া সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান অর্জন করে এবং রেজার গুণ হাছিল করে। আরও একটু ঊর্ধ্বে আকরাবিয়াতে পৌঁছাইয়া ছালেক সিফাতে হাকীকীর নূর লাভ করে। ফলে বেলায়েতে ছোগরায় অর্জিত রেজার গুণ তথায় পূর্ণতা লাভ করে।

তেমনিভাবে ছালেক বেলায়েতে ছোগরার নূরময় জগতস্থিত আল্লাহতায়ালার ক্ষমতা ও প্রতাপ সম্পন্ন বহু গুণবাচক নাম যথা জব্বার (মহা ক্ষমতাশালী), আযীয (পরাক্রমশালী), কাহ্হার (শাস্তিদাতা) ইত্যাদিতে ছায়ের পূর্বক নূর লাভ করিয়া খোদাতায়ালার অসীম ক্ষমতা, দোর্দন্ড প্রতাপ, শাস্তি দান ক্ষমতা ইত্যাদি সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করিয়া খোদাতায়ালার ভয়ে সদা শংকিত থাকে ও খওফ (ভয়ে)-এর গুণ হাছিল করে। মূল মারেফাত কারখানাতে পৌঁছাইলে ছালেকের খওফ পূর্ণতা পায়। অতঃপর ছালেক খওফ ও রেজা অর্থাৎ খোদার ভয় ও রহমতের আশা নামক দুই শক্তিশালী পাখায় ভর করিয়া দ্রুত ছায়ের করিয়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্যের মাকাম পর্যন্ত পৌঁছায়।

পয়গম্বর (আঃ) গণের মধ্যে 'খওফ' ও 'রেজা'র গুণ পূর্ণমাত্রায় ছিল। তাঁহারা সর্বদাই ভয় ও আশাসহ আল্লাহর ইবাদত করিতেন। আল্লাহপাক বলেন,

إِنَّهُمْ كَانُوا يُسْرِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا

অর্থাৎ-"তাহারা সকলে ধাবমান থাকিতেন নেক কাজের প্রতি এবং আশা ও ভয় সহ আমার ইবাদত করিতেন।" (সূরা আম্বিয়াঃ ৯০)

যাহারা মোমিন, যাহারা হক্কুল ইয়াকীনের অধিকারী তাহাদের মধ্যেও উক্ত দুই গুণ (খওফ ও রেজা) পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। তাহাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহপাক বলেন,

تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُور يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وطَمَعًا وَ مِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُونَ

অর্থাৎ- "তাহাদের পাঁচরসমূহ শয্যা হইতে পৃথক থাকে, এই প্রকারে (পৃথক থাকে) যে, তাহারা আশায় ও ভয়ে স্বীয় রবকে ডাকিতে থাকে, আর আমার প্রদত্ত বস্তুসমূহ হইতে ব্যয় করে।" (সূরা সেজদাঃ ১৬)

হাকীকী ঈমানের অধিকারী হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেব বলিতেন, "কাল কিয়ামতের মাঠে যদি অদশ্য জগত হইতে আওয়াজ দেওয়া হয়ঃ একজন মানুষ ব্যতীত অপর কেহ বেহেশতে যাইতে পারিবে না, তখন আমি ধারণা করি ও প্রবল আশা রাখি যে, সে ব্যক্তি আমিই হইব। আর যদি অদৃশ্য জগতের বাণী এই হয় যে, একটি মাত্র লোক দোযখে যাইবে, তবে আশংকা করিতেছি যে, না-জানি সেই লোক আমিই হই।"

কাজেই, হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালার সান্নিধ্য ও রেযামন্দি লাভ করিতে চাও, তবে অন্যান্য গুণের মত খওফ ও রেজার গুণ অর্জনের চেষ্টা কর। তোমরা হয়তো লক্ষ্য করিয়াছ যে, তাজাল্লীয়াতে সিফাতের কারেন্ট ব্যতীত খওফ ও রেজার গুণ লাভকরা যায় না। আবার যতক্ষণ পর্যন্ত বেলায়েতের মাকাম হাছিল না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তাজাল্লীয়াতে সিফাতের নূর আসে না। আবার ফানা ও বাকা ব্যতীত বেলায়েত সিদ্ধ হয় না। আবার আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু যতক্ষণ না ভুলিয়া যাইবে ততক্ষণ ফানা ও বাকা হাছিল হইবে না। আবার যতক্ষণে নাফসের ধোকা ও শয়তানের প্ররোচনা হইতে মুক্ত হইতে না পারিবে, ততক্ষণ আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু বিস্মৃত হইতে পারিবে না। কিন্তু নাফসের ধোকা ও শয়তানের প্ররোচনা হইতে বাঁচা তো সহজ কথা নয়। সে জন্য প্রয়োজন পীরে কামেলের কদমে একনিষ্ঠ খেদমত ও পীরের তালিম মোতাবেক কঠোর রেয়াযত। তাই হয়তো মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিলেন,

"হিসনা কুশাদ মারো রাজো জাল্লে পীর

দামনে আ নাফসরে কোগ্রা সাগীর"।

অর্থাৎ-'তুমি যদি নাফসরূপী কাল সাপের ছোবল হইতে বাঁচিতে চাও, তবে নাফস হন্তা মোর্শেদে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর।'

তোমরা খেদমত করিতে থাক। আমি দু'আ করি যেন তোমরা সফল হইতে পার। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD