এখলাসের পরিচয় এবং ইহার গুরুত্ব সম্পর্কীয় আলোচনা

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ এখলাসের পরিচয় এবং ইহার গুরুত্ব সম্পর্কীয় আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
এখলাসের আভিধানিক অর্থ বিশুদ্ধ সংকল্প বা অকপট নিয়ত। যেহেতু সংকল্প বা নিয়তের বিশুদ্ধতাই এখলাস, সেহেতু নিয়ত বা সংকল্পের সংজ্ঞা এখানে সর্বাগ্রে প্রয়োজন। নিয়ত কি? নিয়ত হইল হৃদয়স্থিত এক আলোড়ন যাহা মানুষকে কাজে অনুপ্রাণিত বা উৎসাহিত করে এবং কাজে রত রাখে। হৃদয়ে সৃষ্ট সেই আলোড়নের পশ্চাতে এক বা একাধিক কারণ বা উদ্দেশ্য থাকিতে পারে। যদি একটি মাত্র উদ্দেশ্যে মানব হৃদয়ে সৃষ্ট আলোড়নে মানুষ কাজে রত হয়; তবে সেই উদ্দেশ্য বা নিয়তকে বলা হয় খালেছ নিয়ত। আর যদি একের অধিক উদ্দেশ্য কাজের পশ্চাতে থাকে তবে তাহাকে বলা হইবে মিশ্রিত উদ্দেশ্য বা নিয়ত। একটি উদ্দেশ্যে কাজ সম্পাদন করা এগ্লাসের শর্ত।
ইসলামী পরিভাষায় ইবাদত-বন্দেগীসহ সমুদয় কর্মকান্ড একমাত্র আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে সম্পাদন করাই এখলাস।
হযরত মুজাহিদ (রঃ) ছাহেব বলেনঃ এক ব্যক্তি দয়াল নবী (সাঃ) এর খেদমতে আসিয়া উপস্থিত হইয়া আরজ করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! আমি শুধু আল্লাহ ওয়াস্তেই দান-খয়রাত করিয়া থাকি। অবশ্য তাহার সাথে এই আশাও অন্তরে থাকে যে, ঐ কাজের কারণে যেন মানুষ আমার প্রশংসা করে। লোকটির এই উক্তির উপরেই আল্লাহতায়ালা এরশাদ করিলেনঃ "যে কেহ তাহার প্রতিপালকের সাক্ষাত লাভের আশা করে, সে যেন সৎকর্মশীল হয় এবং তাহার প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাহাকেও অংশীদার না করে।"
বিজ্ঞাপন
ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেব তদীয় বিভিন্ন কিতাবে একটি কাহিনীর উল্লেখ করিয়াছেন। কাহিনীটি হইলঃ ইসরায়ীল বংশে একজন আবেদ লোক ছিলেন। লোকে আসিয়া তাহাকে বলিলেন যে, অমুক স্থানে একটি বৃক্ষ আছে। মানুষ উহাকে দেবতা বলিয়া পূজা করে এবং খোদা বলিয়া বিশ্বাস করে। দরবেশ ইহা শুনিয়া ক্রোধে অধির হইয়া পড়িলেন এবং একখানি কঠার কান্দে ঝুলাইয়া বৃক্ষটি কর্তন করিয়া ফেলার জন্য যাত্রা করিলেন। পথিমধ্যে ইবলিস শয়তান এক বৃদ্ধের আকৃতি ধরিয়া দরবেশের সামনে আসিয়া বলিতে লাগিলঃ তুমি কোথায় যাইতেছ? দরবেশ উত্তর করিলেন, অমুক বৃক্ষটি কর্তন করিবার জন্য যাইতেছি। শয়তান বলিল, তুমি স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন পূর্বক আল্লাহর ইবাদতে ও জেকেরে মশগুল হও। একটি তুচ্ছ বৃক্ষ কর্তনে সময় নষ্ট করার চেয়ে ইবাদতে মশগুল থাকাই তোমার পক্ষে উত্তম কার্য। বৃদ্ধের যুক্তি শ্রবণে দরবেশ বলিলেন, এই বৃক্ষটির কারণে বহু লোক আল্লাহকে ভুলিয়া বিপথগামী হইতেছে। নির্জনে বসিয়া ইবাদত-বন্দেগী করার চেয়ে এই বৃক্ষটিকে কর্তন করতঃ শিরকের মূল উৎপাটন করিয়া ফেলা আমার পক্ষে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। আমি এই কার্য হইতে কোন মতেই নিরস্ত হইতে পারি না। বৃদ্ধরূপী ইবলিস দরবেশের এখলাস বা বিশুদ্ধ সংকল্প দেখিয়া বলিলঃ তুমি বৃক্ষটি কখনই কর্তন করিতে পারিবে না। আমি তোমাকে এক পাও সেই দিকে অগ্রসর হইতে দিব না। এই বলিয়া শয়তান দরবেশের সহিত লড়াইয়ে লিপ্ত হইল। শেষ পর্যন্ত দরবেশ শয়তানের সহিত যুদ্ধে জয়ী হইয়া তাহাকে ভূতলে নিক্ষেপ করিলেন এবং তাহার বুকের উপর চড়িয়া বসিলেন। শয়তান পরাজিত হইয়া কাতর স্বরে দরবেশকে বলিলঃ আমার প্রাণ রক্ষা কর। আমি তোমাকে কয়েকটি মূল্যবান কথা বলিতেছি। ইহা শ্রবণ করিয়া দরবেশ তাহাকে ছাড়িয়া ছিলেন।
শয়তান বলিল, হে দরবেশ! মানবের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ হাজার হাজার পয়গম্বর প্রেরণ করিয়াছেন। যদি এই বৃক্ষটিকে ধ্বংস করা আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা বা অভিপ্রেত হইত, তবে সেই পয়গম্বরগণের মধ্যেই কাহারো দ্বারা ইহা কর্তন করাইয়া ফেলিতেন। অথচ তিনি কোন পয়গম্বরকে ইহা কাটিবার জন্য কোন নির্দেশ দেন নাই। তোমাকেও তিনি এতদসম্বন্ধে কোন আদেশ প্রদান করেন নাই। অতএব আমার পরামর্শ গ্রহণ কর। তুমি বৃক্ষ কর্তনে ক্ষান্ত হও। দরবেশ বলিলেন, আল্লাহতায়ালা আমাকে এই সম্বন্ধে আদেশ করুন আর নাই করুন, আমি বৃক্ষটি কাটিয়া ফেলিব। ইবলিস পুনরায় বলিল, আমি কোন ক্রমেই তোমাকে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হইতে দিব না। এই রূপে কথা কাটাকাটি করিয়া তাহারা উভয়ে পুনরায় যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল। এবারেও দরবেশ শয়তানকে ভূতলে ফেলাইয়া বুকের উপর চড়িয়া বসিল। ইবলিস গত্যন্তর না দেখিয়া কাতর স্বরে পুনরায় বলিতে লাগিলঃ আমি তোমাকে আর একটি মূল্যবান কথা বলিব, তুমি আমাকে ছাড়িয়া দাও। কথাটি তোমার মনমত না হইলে তুমি আমাকে যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারিবে। দরবেশ এতদশ্রবণে তাহাকে ছাড়িয়া দিলে সে বলিতে লাগিলঃ হে দরবেশ! তুমি একজন দরিদ লোক। পরের সাহায্যে তোমার সংসার যাত্রা নির্বাহ করিতে হয়। তুমি উক্ত বৃক্ষটি কর্তনের সংকল্প ত্যাগ করিলে আমি তোমাকে কিছু অর্থ প্রদান করিব। সেই অর্থের সাহায্যে তোমার সংসার খরচও চলিবে এবং উদ্ধৃত্তাংশ দ্বারা অন্যান্য দরবেশদিগকেও সাহায্য করিতে পারিবে। বৃক্ষ কর্তন অপেক্ষা ইহা তোমার পক্ষে অধিক হিতকর হইবে। বৃক্ষ কাটিয়া তোমার কোন ফল হইবে না। কেননা, তুমি এই বৃক্ষটি কার্টিয়া ফেলিলে বৃহ্মপূজকগণ আর একটি নূতন বৃক্ষ উৎপাদন করিয়া উহার পূজা করিবে। তোমার এই বৃক্ষ কর্তনে তাহাদের কোনই ক্ষতি হইবে না। তুমি এই উদ্ভট কল্পনা পরিত্যাগ কর। আমি প্রত্যহ রজনী শেষে তোমার বালিশের নীচে দুইটি করিয়া স্বর্ণ মুদ্রা রাখিয়া আসিব। তুমি উহা দ্বারা নিজের নিত্য প্রয়োজনীয় কার্যাদি নির্বাহ করিতে পারিবে এবং গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ পূর্বক প্রচুর সওয়ারও লাভ করিতে পারিবে।
ইহা শুনিয়া দরবেশ মনে মনে ভাবিলেন, এই লোকটি তো সত্যই বলিতেছে। প্রত্যহ যদি দুইটি করিয়া স্বর্ণ মুদ্রা পাওয়া যায়, তবে একটি মুদ্রা গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করিতে পারিব। অপর মুদ্রাটি দ্বারা নিজ সংসারের ব্যয় নির্বাহ করিতে পারিব। এই বৃক্ষটি কর্তন করা অপেক্ষা ইহাই আমার জন্য অধিক লাভজনক হইবে। এদ্ব্যতীত আরও ভাবিবার বিষয় এই যে, এই বৃক্ষটি কাটিবার জন্য আল্লাহতায়ালা আমাকে নির্দেশ প্রদান করেন নাই। আমি কোন পয়গম্বর নহি; সুতরাং বৃক্ষটি কর্তন করা আমার জন্য ওয়াজেবও নহে। যাহা হউক, এই রূপ কল্পনা করিয়া দরবেশ লোকটি বৃক্ষ ছেদনের সংকল্প পরিত্যাগ পূর্বক স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। পরবর্তী প্রত্যুষে বালিশের নীচে দুইটি স্বর্ণ মুদ্রা দেখিতে পাইয়া মহানন্দে তাহা উঠাইয়া লইলেন।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় দিনের প্রাতঃকালেও অনুরূপভাবে দুইটি স্বর্ণমুদ্রা পাইয়া মনে মনে বলিলেন, "আমি বৃক্ষটি না কাটিয়া ভালই করিয়াছি।" তৃতীয় দিন প্রত্যুষে বালিশ উল্টাইয়া তথায় কিছুই দেখিতে পাইলেন না। ইহাতে দরবেশ পুনরায় কুঠার হস্তে বৃক্ষ কাটিবার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন। ইবলিস তাহার পথ আগলাইয়া পূর্ববত বাধা প্রদান করিয়া জিজ্ঞাসা করিলঃ হে দরবেশ! তুমি কোথায় যাইতেছ? উত্তর হইলঃ সেই বৃক্ষটি কাটিবার জন্য। ইবলিস বলিল, তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহর শপথ, তুমি বৃক্ষটি আর কখনও কাটিতে পারিবে না। ইত্যাকার বাক-বিতন্ডার পর পুনরায় উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়া গেল। এবার শয়তান দরবেশকে ভূতলে ফেলিয়া তাহার বক্ষে চাপিয়া বসিল। বাজ পাখীর কবলে পতিত হইলে ক্ষুদ্র পাখীর যে অবস্থা হয়-শয়তানের কবলে দরবেশের অবস্থাও তদ্রুপ হইয়া দাঁড়াইল। কাবুতে পাইয়া এবার শয়তান দরবেশকে বলিলঃ "মংগল চাও তো বৃক্ষ কর্তনের সংকল্প পরিত্যাগ পূর্বক গৃহে প্রত্যাবর্তন কর। অন্যথায় তোমাকে বকরীর ন্যায় যবাই করিয়া ফেলিব।"
দরবেশ বলিলেন, আচ্ছা আমাকে ছাড়িয়া দাও। শয়তান তাহাকে ছাড়িয়া দিল। যে শয়তানকে দরবেশ দুইবার পরাস্ত করিয়াছিল, আজ তাহারই হস্তে পরাজিত হইয়া সে বিস্ময়ের সহিত তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলঃ আচ্ছা বলত! দুইবার আমি তোমাকে পরাজিত করিয়াছি। তখন তুমি আমার সহিত আটিয়া উঠিতে পারিলে না কেন? আর আজ তুমি আমাকে পরাস্ত করিয়া দিলে। আমার সেই বল, সেই শক্তি কোথায় চলিয়া গেল? শয়তান ঈষৎ হাস্যে উত্তর দিলঃ প্রথম দুইবার তুমি একমাত্র আল্লাহতায়ালার জন্য বৃক্ষ পূজার প্রতি রাগান্বিত হইয়াছিলে। তোমার এখলাসের গুণে তুমি এত বলবান হইয়াছিলে যে, আমি তোমার নিকট পরাজিত হইয়াছি। যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে কোন কাজ করিতে আরম্ভ করে, তাহার উপর আমার ক্ষমতা চলে না। এইবার তোমার স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটার কারণে তুমি ক্রুদ্ধ হইয়াছ; তদসংগে আল্লাহতায়ালার জন্য বৃক্ষটি কাটার সংকল্প করিয়াছ। অতএব তোমার সংকল্প নিজের স্বার্থের দ্বারা মিশ্রিত হওয়ায় তুমি আমার নিকট পরাজিত হইয়াছ। যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তি ও স্বার্থের বশীভূত হইয়া কার্য করে; সে আমার সংগে জয়লাভ করিতে পারে না।
বর্ণিত কাহিনীতে এখাসের পরিচয় বিধৃত আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বৃক্ষ ছেদনের পিছনে লোকটির উদ্দেশ্য কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তোষ বা প্রসন্নতা অর্জন ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত শয়তান তাহাকে পরাজিত করিতে পারে নাই; কিন্তু যখনই তাহার একক উদ্দেশ্য শয়তানের প্ররোচনা ও নাফসের ধোকা তথা স্বর্ণ মুদ্রার লোভ কর্তৃক প্রভাবিত হইল, অর্থাৎ আরও কিছু উদ্দেশ্য আসিয়া সন্নিবিষ্ট হইল, তখনই
বিজ্ঞাপন
শয়তান দরবেশকে পরাজিত করিতে সক্ষম হইল। যতক্ষণ এপ্লাসের গুণ মানুষের মধ্যে থাকে, ততক্ষণ শয়তান তাহার কোন ক্ষতি করিতে পারে না। এখলাস বিনষ্ট হইলেই কেবল শয়তান বা নাফস মানুষকে পথ ভ্রষ্ট করে।
আদমকে সেজদা না করিবার অপরাধে বিতাড়িত হওয়ার পর শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করিবার ব্যাপারে আল্লাহর সাথে চ্যালেঞ্জ করিয়াছিল। সে বলিয়াছিল,
ربِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لأزَيَّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَ لأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلِصِينَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ "হে রব! তুমি যে আমাকে সর্বনাশ করিয়াছ, তাহার কছম! পৃথিবীতে মানুষের কাছে পাপকর্মকে শোভন করিয়া ধরিব এবং সর্বনাশ করিব সকলকে, তবে তোমার মোখলেস (এস্পাসের গুণ সমৃদ্ধ) বান্দা ছাড়া।" (সূরা হিজ্বরঃ আয়াত- ৩৯ ও ৪০)
এখলাস বিহীন ইবাদত গ্রহণযোগ্য নহেঃ
এখলাস বা বিশুদ্ধ সংকল্প না থাকিলে যে কোন ইবাদতই করা হউক না কেন, তাহা আল্লাহর দরবারে কবুলিয়াতের যোগ্যতা পায় না। আল্লাহতায়ালা সেই ইবাদত গ্রহণ করেন না।
বিজ্ঞাপন
কিতাবে দেখা যায়, এক ব্যক্তি কোন এক বুযুর্গ লোককে স্বপ্নে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, পরলোক গমনের পর মহা প্রভু আপনার সহিত কিরূপ ব্যবহার করিয়াছেন? তিনি বলিলেনঃ পৃথিবীতে যে সকল কাজ খাঁটি নিয়তে কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালার জন্য করিয়াছিলাম, তৎসমুদয়কে নেকীর পাল্লায় দেখিতে পাইলাম। এমন কি, একদিন পথ চলিবার কালে রাস্তার উপরে পতিত একটি আনারের দানা অপচয় হওয়ার ভয়ে আল্লাহর ওয়াস্তে উহা কুড়াইয়া লইয়াছিলাম এবং একটি গৃহপালিত বিড়াল আমার গৃহে মরিয়াছিল, আল্লাহতায়ালার সন্তোষের জন্য আমি উহাকে যথাস্থানে ফেলিয়াছিলাম। এই দুইটি নিতান্ত নগন্য কাজও আমার নেকীর পাল্লায় দেখিলাম। আমার টুপির মধ্যে এক টুকরা রেশমের সুতা লাগাইয়াছিলাম-তাহা পাপের পাল্লায় দেখিলাম। কিন্তু একশত দীনার মূল্যে একটি গর্দভ খরিদ করিয়াছিলাম এবং তাহা আমার ঘরেই মরিয়াছিল। উহাকে আমার নেকীর পাল্লায় দেখিতে পাইলাম না। তখন আমি খোদাতায়ালাকে জিজ্ঞাসা করিলামঃ হে খোদাতায়ালা। বিড়ালটিকে নেকীর পাল্লায় দেখিতেছি, কিন্তু গর্দভটিকে তথায় দেখিতেছি না-ইহার কারণ কি? আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে জবাব আসিল। গর্দভটিকে তুমি যেখানে পাঠাইয়াছ, সেই খানেই যাইয়া পৌছিয়াছে। কেননা, গর্দভটির মৃত্যু সংবাদ শুনিয়া তুমি বলিয়াছিলে, আল্লাহর লানতের দিকে পাঠাইলাম। যদি তুমি বলিতে, "আল্লাহর রাস্তায় পাঠাইলাম" তবে গর্দভটিকে আজ নেকীর পাল্লায় দেখিতে পাইতে।" পার্থিব জীবনে একবার আমি কিছু ছদকার মাল আল্লাহ ওয়াস্তে বিতরণ করিতেছিলাম। তখন কিছু সংখ্যক লোক একটু দূর হইতে আমার বিতরণ কার্য দেখিতেছিল। আমার দান তাহাদের গোচরীভূত হওয়া আমার ভাল লাগিতেছিল। সেই দানে আমার কোন উপকারও হয় নাই, ক্ষতিও হয় নাই। হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) এই স্বপ্ন বৃত্তান্ত শুনিয়া বলিয়াছিলেনঃ সেই দান যে তাহার কোন ক্ষতি করে নাই অর্থাৎ পাপের পাল্লায় স্থাপিত হয় নাই, ইহা তাহার পরম সৌভাগ্য।
সুতরাং বুঝা গেল, ইবাদত বন্দেগী হউক, অথবা অন্য যে কোন সৎকর্মই হউক-যদি কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তোষ বা প্রসন্নতা অর্জনই ইহার উদ্দেশ্য হয়, তবে সে ইবাদত বা সৎকর্ম আল্লাহপাক কবুল করেন, কারণ তাহা বিশুদ্ধচিত্তে কেবল আল্লাহর জন্য নিবেদিত থাকে। কিন্তু যদি আল্লাহর সন্তোষ লাভের পাশাপাশি ইহাতে লোক দেখানো ইচ্ছা বা রিয়া, যশ বা খ্যাতি অর্জনের লিপ্সা, অহংবোধ ইত্যাদি মিশ্রিত থাকে; তবে তাহাতে আর এখলাস থাকে না; ফলে সে ইবাদত কবুলও হয় না। তাই বলা হয়, এগ্লাস বা খালেস সংকল্প ইবাদত কবুলিয়াতের পূর্বশর্ত। পাক কুরআনে আল্লাহপাক বলেন,
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"মনে রাখিও, কেবলমাত্র খালেস ধর্ম-কর্মই আল্লাহতায়ালার জন্য।" (সূরা যুমারঃ ৩) অর্থাৎ যে ইবাদত-বন্দেগীতে বা সৎকর্মে কপটতা, প্রবঞ্চনা বা ছলনা আছে; যে ইবাদতে লোক দেখানো ভাব, প্রশংসা লিন্সা ইত্যাদি মিশ্রিত থাকে-তাহা আল্লাহতায়ালার জন্য নহে। নাফস ও শয়তানের প্রভাবমুক্ত, কপটতাশূন্য খালেস ইবাদতই কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে তাই বলেন,
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّيْنَ
অর্থাৎ-"আল্লাহতায়ালার প্রতি বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে অর্থাৎ এপ্লাসসহ ইবাদত করুক-ইহা ভিন্ন তাহাদিগকে আর কিছুই আদেশ করা হয় নাই।" (সূরা বাইয়্যেনাহঃ আয়াত-৫)
বিজ্ঞাপন
এখলাসের গুণ অর্জনের ইশারা পাক কুরআনের বহু জায়গায় মহান খোদাতায়ালা আমাদেরকে দান করিয়াছেন। আল্লাহপাক বলেন,
وَأَقِيمُوا وَجُوهَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَّ ادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّيْنَ
অর্থাৎ-'এবং তোমরা প্রত্যেক নামাজে নিজেদের মুখ কেবলার দিকে ঠিক রাখো এবং আল্লাহকে এখাসের সহিত ডাক।' (সূরা আ'রাফঃ ২৯)
বিজ্ঞাপন
এখলাসের গুণ অর্জনে বাঁধা বা প্রতিবন্ধকতাঃ
এখলাসের সহিত খোদাতায়ালাকে ডাকা বা খালেছ হৃদয়ে আল্লাহতায়ালার ইবাদত-বন্দেগী করা সহজ কথা নয়। কারণ শয়তান ও নাফস সর্বদাই মানুষের পিছনে লাগিয়া আছে। কোন ক্রমেই উক্ত শত্রুদ্বয় মানুষকে খোদামুখী হইতে দিবে না। তাই মানুষ যখনই বিশুদ্ধ সংকল্পে বা এখলাসসহ ইবাদতে মশগুল হয়, তখনই শয়তান ও নাফস তাহার এখলাসকে নষ্ট করিবার জন্যে নানাবিধ চিন্তা তাহার মনে প্রবেশ করায়। উদাহরণ স্বরূপ নামাজের কথাই ধরা যাক। আবেদ নামাজে দাঁড়ানোর সময় বলে, "ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজী ফাতারাছ ছামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকীন।" অর্থাৎ নিশ্চয় আমি আমার মনোযোগ তাহারই দিকে নিবদ্ধ করিলাম, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা। আমি কখনও মোশরেকদের অন্তর্ভুক্ত নহি।
কানে হাত লাগাইয়া উল্লিখিত শপথ করিয়া আবেদ নামাজে দাঁড়ায়, কিন্তু নামাজের মধ্যে বহুবিধ দুনিয়াবী চিন্তা আসিয়া তাহার দেলে জমা হয়। মন সেই দিকেই ঘুরিয়া যায়। নামাজরত অবস্থায় কখনওবা নামাজীর মনে লোক দেখানো ভাবের পয়দা হয় অর্থাৎ লোকে দেখুক যে, আমি নামাজি এমন মনোভাবের উদয় হয়-যাহা নিতান্তই শেরেকী। নামাজে দাঁড়াইয়া সে মুখে বলিতেছে, "ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন"-অর্থাৎ আমি তোমারই বান্দা; নির্দিষ্টরূপে তোমারই বন্দেগী করিতেছি। অথচ মনে তাহার ভাসিতেছে কত পুরাতন বন্ধুর স্মৃতি, কত মামলা মকদ্দমার কথা, অর্থ-সম্পদ, নারী-বাড়ী, গাড়ীর চিন্তা ইত্যাদি। ফলে নামাজী মিথ্যাবাদী বা কপট বা প্রবঞ্চক হিসেবে প্রমাণিত হইতেছে। কিন্তু কপটতার ছোঁয়াচ যুক্ত কোন ইবাদততো আল্লাহ কবুল করেন না। আল্লাহ বলেন,
বিজ্ঞাপন
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ
অর্থাৎ-'কেবলমাত্র অকপট ইবাদতই আল্লাহতায়ালার জন্য।' (সূরা যুমারঃ আয়াত নং-৩)
কিতাবে দেখা যায়, একজন বুযুর্গ লোক বলিয়াছেনঃ আমি সুদীর্ঘ ৩০ বছর যাবৎ প্রত্যহ পাঞ্জেগানা নামাজ জামায়াতে প্রথম সারীতে দাঁড়াইয়া সম্পন্ন করিয়াছিলাম। একদিন আমি বিলম্বে আসার কারণে প্রথম সারিতে স্থান না পাইয়া পিছনের সারিতে দাঁড়াইয়া নামাজ আদায় করিয়াছি। আমি অনুভব করিলাম, আজ আমার পিছনের সারিতে দাঁড়ানোর ব্যাপারটি লোকে দেখিতে পাইল বলিয়া আমার মনে লজ্জার উদ্ভব হইয়াছে। কেননা, তাহারা বলাবলি করিবে-দরবেশ আজ বিলম্বে আসিয়াছে। তখন আমি বুঝিতে পারিলাম যে, এতদিন জামায়াতের প্রথম সারিতে দাঁড়াইবার জন্য আমার আগ্রহ ও আনন্দ শুধু এই জন্যই ছিল যে, লোকে আমাকে প্রতিদিন প্রথম সারিতে দেখিয়া আমার প্রশংসা করিবে। অতএব রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব আমার হৃদয়ে লুকায়িত ছিল বলিয়া আমার এই সুদীর্ঘ ত্রিশ বৎসরের ইবাদতই বিনষ্ট হইয়াছে-এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া আমি আমার ত্রিশ বছরের নামাজেরই কাযা আদায় করিয়াছি।"
এখানে নামাজ দিয়ে উদাহরণ দেওয়া হইল। শুধু নামাজ নহে; প্রত্যেকটি কাজে কর্মে (ধর্ম-কর্মই হউক অথবা সাধারণ কাজই হউক) ভাবনা আসিয়া এখলাস নষ্ট করিয়া ফেলে। যে ইবাদত বা কাজ-কর্ম আল্লাহর সন্তোষ লাভের জন্য নিবেদিত-তাহাতে শয়তান ও নাক্স রিয়া বা লোক দেখানো ভাব, যশ, খ্যাতি, কর্তৃত্ব লাভের ইচ্ছা ইত্যাদি প্রবেশ করাইয়া আবেদের ইবাদতকে বরবাদ করিয়া দেয়।
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। শয়তান তাহার অপরাধের কারণে আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার সময় সরল পথের পথিকদের পথ ভ্রষ্ট করার শপথ করিয়াছিল। সে আল্লাহকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিল,
فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صَرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ثُمَّ لاتِيَنَّهُمْ مِّنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَ عَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَ لَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَكِرِينَ
অর্থাৎ-"তুমি আমার বিনাশ করিয়াছ, আমি ওঁৎ পাতিয়া থাকিব তোমার সরল পথের পথিকদের জন্য। অতঃপর আমি তাহাদের কাছে পৌছিবই তাহাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ ও দক্ষিণ হইতে এবং তাহাদের বাম ও ডান হইতে; তাদের অনেককেই তুমি কৃতজ্ঞ পাইবে না।" (সূরা আ'রাফঃ আয়াত নং-১৬ ও ১৭)
শয়তান তাহার শপথ পুরা করার জন্যই মানুষকে তাহাদের ইবাদতে নানা আজে-বাজে চিন্তার আবিলতা যুক্ত করে, আবেদের এখাস বিনষ্ট করে। হাদীস শরীফে দেখা যায়ঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলিয়াছেন, যখন আযান দেওয়া হয় তখন শয়তান বায়ু ছাড়িতে ছাড়িতে দৌড়াইয়া পালায়-যাহাতে আযানের শব্দ তাহার কানে না যায়। আযান শেষ হইলে লোকালয়ে ফেরত আসে। তদ্রুপ একামত আরম্ভ হইলেও পালায় এবং একামত শেষ হইলে আবার ফিরিয়া আসে, এমনকি নামাজী ব্যক্তির মনকে তাহার আয়ত্বে থাকিতে দেয় না। তাহাকে এই কথা-ঐ কথা স্মরণে আনিয়া দেয়-যাহা তাহার মনের ধারেও ছিল না। ফলে তাহার ইহাও মনে থাকে না যে, সে কত রাকাত নামাজ পড়িয়াছে। (মেশকাত শরীফ-৬২)।
মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কাজে শয়তান একা নহে। শয়তানের পক্ষে মানব দেহে আছে দুষ্ট নাফস। শয়তান নাফসের যোগসাজশে মানুষের এখলাস বিনষ্ট করিয়া তাহাকে খোদা থেকে দূরে সরাইয়া রাখিতে প্রয়াস চালায়। ফলে মানুষ আজীবন ইবাদত করিয়াও তাহার নেকীর পাল্লায় নেকী জমা করিতে ব্যর্থ হয়। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব শয়তান ও নাফসকে চোরের সাথে তুলনা করিয়াছেন। চোর যেমন গৃহস্বামীর ঘুমন্ত অবস্থায় কৌশলে গৃহের মালসামানা লইয়া যায়; তেমনি শয়তান ও নাফস ইবাদতের মধ্যে মানুষের হৃদয়ে লোক দেখানো মনোভাব, আত্ম গৌরব, সুনাম-সুখ্যাতি লাভের মনোভাব ইত্যাদি পয়দা করার মাধ্যমে তাহার নেক আমলকে চুরি করিতে সক্ষম হয়; মানুষের এপ্লাস বা উদ্দেশ্য-বিশুদ্ধি অর্জনের পথে বাধাদান উদ্দেশ্যে মজবুত প্রাচীর তৈরী করে।
এখলাসের গুণ অর্জনের উপায় কি?
এখলাসের গুণ অর্জন করিতে হইলে যাবতীয় শিরক থেকে নিজেকে হেফাজত করিতে হইবে। দেলের পবিত্রতা অর্জন করিতে হইবে। শয়তান ও নাফস কর্তৃক প্রবিষ্ট যাবতীয় আবিলতা বা পংকিলতা দেল থেকে ঝারিয়া ফেলিতে হইবে।
শেরেক দুই প্রকার। যথাঃ
★ প্রকাশ্য শেরেক অর্থাৎ মুর্তি পূজা, সূর্য পূজা, পাথরপূজা ইত্যাদি।
★ গুপ্ত শেরেক।
গুপ্ত শেরেকের দুইটি শাখা আছে। যথাঃ
প্রথম শাখাঃ
নামাজ এবং অন্যান্য ইবাদত কর্মে যে লোক দেখানো মনোভাব বা রিয়া এবং সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের লিপ্সা দেলে পয়দা হয়-রাসূলে পাক (সাঃ) উক্তরূপ বাজে ভাবনাচিন্তাকে ছোট শেরেক হিসেবে তদীয় বাণীতে উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীস শরীফে দেখা যায়ঃ হযরত শাদ্দাদ ইবনে উছ (রাঃ) বলেন, আমি একদিন আল্লাহর প্রিয় রাসূল (সাঃ) কে রোদন করিতে দেখিয়া উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, আমার উম্মতগণ অবশ্য মূর্তিপূজা করিবে না, তাহারা চন্দ্র, সূর্য, কিংবা কোন জড় পদার্থের পূজাও করিবে না। সেই সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত। কিন্তু তাহারা ছোট শিরকে লিপ্ত হইবে, এই চিন্তাতেই আমি রোদন করিতেছি।
লোকগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! ছোট শিরক কি? রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন, উহা হইল, রিয়া। অর্থাৎ অপরের ভক্তি শ্রদ্ধা ও প্রশংসা লাভের জন্য যে ইবাদত করা হয়। রোজ কিয়ামতে আল্লাহ বলিবেন, হে রিয়াকারগণ! যাহাদের মন আকর্ষণ করিবার জন্য তোমরা ইবাদত করিয়াছিলে, আজ তাহাদের নিকট তোমাদের প্রাপ্য চাহিয়া লও।
অপরের ভক্তিশ্রদ্ধা অর্জনের যে ইচ্ছা, ইবাদতে রতাবস্থায় আবেদের দেলে পয়দা হয়-তাহাই ছোট শিরক, যাহা গুপ্ত শিরকের প্রথম শাখা বলিয়া পরিচিত।
গুপ্ত শিরক-এর দ্বিতীয় শাখাঃ
বেলায়েতে ছোগরার নূরময় জগতে সাধক এক ধরণের সূক্ষ্ম শিরক করিয়া ফেলে। বেলায়েতে ছোগরা হইল আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বিত নূরের দায়েরা। আধ্যাত্মিক পথ যাত্রার প্রথম মাকাম-দায়েরায়ে এমকান হইতে আকরাবিয়াতের পূর্ব পর্যন্ত যে বিশাল নূরময় জগত আছে-তাহাই বেলায়েতে ছোগরা নামে অভিহিত। এই দায়েরায় নূরের তীব্রতা বেশী হওয়ায় খোদাঅন্বেষী যে দিকেই তাকায়-সে দিকেই দেখে শুধু নূর আর নূর। নূরের মহাসমুদ্রে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মান্ডকে; এমনকি নিজেকেও নিমজ্জিত দেখে। সেই নূর হইতে নিজেকে আর পৃথক করিতে না পারিয়া "সবই তিনি" বলিয়া ফেলে। অর্থাৎ সৃষ্টিকে স্রষ্টার যথাযথ মনে করে-যাহা এক প্রকারের সূক্ষ্ম শিরক। তবে আধ্যাত্মিক চাপের কারণে এমনটি হয় বিধায় আল্লাহপাক বেলায়েতে ছোগরা স্তরের সাধককে তাহা ক্ষমা করিয়া দেন।
এখানে আরও এক প্রকারের সূক্ষ্ম শিরক সাধক করিয়া ফেলে। বেলায়েতে ছোগরার উপরে আছে আকরাবিয়াতের মাকাম যাহা বেলায়েতে কোবরার প্রথম ধাপ। এই আকরাবিয়াতের নিম্নে আল্লাহপাকের অজুদ বর্তমান। অজুদ কি? অজুদকে বুঝিবার জন্য আসল মারেফাত দপ্তরের অধ্যায়গত পরিচয় দরকার। আসল মারেফাত কারখানায় আল্লাহতায়ালার আসমা (নাম), সিফাত (গুণাবলী), শান, ইতেবার ও জাত বর্তমান। আল্লাহর জাত ভিন্ন সমস্ত কামালতের (পূর্ণতার) প্রতিবিম্ব আছে আলমে মেছালে'। আকরাবিয়াতের নীচে জাত ভিন্ন সমুদয় কামালতের সম্মিলিত যে প্রতিবিঙ্গ আছে-তাহাকে অজুদ বলা হয়। বেলায়েতে ছোগরাস্থিত অনেক সাধক এই অজুদকে জাত মনে করেন। এই অজুদকে উপাস্য ধারণায় আজীবন ইবাদত করিয়া থাকেন। যাহা অতি সূক্ষ্ম হইলেও শিরক বটে।
এখলাসের গুণ অর্জন করিতে হইলে গুপ্ত শিরকের উভয় শাখা থেকে নিজেকে মুক্ত করিতে হইবে, হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জন করিতে হইবে। এক কথায় প্রকাশ্য ও গুপ্ত-উভয় প্রকারের উদ্দেশ্যতুল্য উপাস্যকে নিবারণ করিতে হইবে, কাতেল করিতে হইবে। অতঃপর জাতের সান্নিধ্যে পৌছাইতে হইবে। তবেই এপ্লাসের গুণ আসিবে। এই জন্যে প্রয়োজন ফানা ও বাকার মাকাম হাছিল করা; প্রয়োজন নিজ ইচ্ছা ও সত্ত্বাকে খোদাতায়ালার ইচ্ছা ও সত্ত্বায় বিলীন করা; প্রয়োজন মহব্বতে জাতি অর্জন করা।
কিন্তু মহব্বতে জাতি ভিন্ন ফানা ও বাকা অর্জন সম্ভব নয়। মহব্বতে জাতি অর্জনের জন্য প্রয়োজন প্রকাশ্য ও গুপ্ত উপাস্য তুল্য উদ্দেশ্য সমূহকে বিনাশ করা-যাহা ছায়েরে এলাল্লাহ অতিক্রম করিয়া ছায়েরে ফিল্লাহতে না গেলে সম্ভব হয় না।
ছায়েরে এলাল্লাহ ও ছায়েরে ফিল্লাহঃ
ছায়ের এলাল্লাহ অর্থ আল্লাহর দিকে ভ্রমণ এবং ছায়ের ফিল্লাহ অর্থ আল্লাহময় জগতে ভ্রমণ। খোদাতায়ালাকে চেনা বা জানার পথ যাত্রা শুরু হয় লতিফা কালব থেকে। কালব থেকে যে যাত্রা শুরু হয়-তাহা চব্বিশ দায়েরা শেষে খোদার জাত পর্যন্ত পৌঁছায়। উরুজের' সময় একেক পর এক দায়েরাসমূহ ছায়ের করিতে হয়। নিম্ন থেকে ঊর্ধ্ব দিকে দায়েরাসমূহ যথাক্রমে দায়েরায়ে এমকান, বেলায়েতে ছোগরা, আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী, মহব্বতে সালেস, বেলায়েতে উলিয়া, মোরাকাবায়ে শরহে ছদর, কামালাতের দায়েরাসমূহ, হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়ার দায়েরা সমূহ। সর্বশেষ দায়েরাদ্বয় হইল-মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে সেরফা।
উরুজের সময়ে দায়েরায়ে এমকান থেকে শুরু করিয়া বেলায়েতে ছোগরার শেষ পর্যন্ত যে ছায়ের করা হয়-তাহাই ছায়েরে এলাল্লাহ বা আল্লাহর দিকে ভ্রমণ। ছায়েরে এলাল্লাহর শেষ প্রান্তে ছালেক আল্লাহর আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের সহিত ফানা হয়। ফলে তাহার আদামাত পর্যদুস্ত হয় এবং নাফস মোৎমাইন্ন্যার গুণাগুণ ফিরিয়া পায়। নাফস মোৎমাইন্ন্যা বা প্রশান্ত হইলেও এখানে যথার্থ এপ্সাস বা উদ্দেশ্য-বিশুদ্ধি আসে না। কারণ এপ্লাসের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত ফানা এবং মহব্বতে জাতি-যাহা ছায়েরে এলাল্লাহতে নাই। এখানে যে ফানা হয়-তাহাকে ফানার ছুরাত বলা যাইতে পারে। যথার্থ ফানা সিদ্ধ হয়-আল্লাহময় জগতে ভ্রমণ বা ছায়েরে ফিল্লাহর মাধ্যমে। ছায়ের ফিল্লাহ শুরু হয় আকরাবিয়াত থেকে। আকরাবিয়াত থেকে শুরু করিয়া হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে সেরফা পর্যন্ত যে ছায়ের তাহাই আল্লাহময় জগতে ভ্রমণ। এখানে ছালেকের আদামাত সম্পূর্ণ ঝরিয়া পরে। ছালেক তদীয় ইচ্ছা ও গুণাগুণ আল্লাহতায়ালার নিকট ফেরত দেয়। ফলে তাহার না থাকে গুণাগুণ, না থাকে ইচ্ছা, না থাকে আদামাত। সে শূন্য হয়। ইহাই পূর্ণ ফানা। এই স্তরে ছালেকের মধ্যে আদামাতের কোন দোষ থাকে না। সে খোদাতায়ালাকে নিজাপেক্ষাও অধিক ভালবাসে-যাহা মহব্বতে জাতি বলিয়া পরিচিত। এই মহব্বতে জাতির মাধ্যমে ছালেক দ্রুত ছায়ের করিয়া আল্লাহতায়ালার আসমা, সিফাত, শান, শয়ুনাত, ইতেবার অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালার জাত পর্যন্ত পৌঁছায়-যেখানে ছালেকের পরিপূর্ণ এখাস বা যথার্থ উদ্দেশ্য-বিশুদ্ধি সিদ্ধ হয়। তাই রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন যে, আল্লাহতায়ালা বলেনঃ "এখাস আমার গূঢ় রহস্য সমূহের অন্যতম। যে বান্দাকে আমি ভালবাসি, কেবলমাত্র তাহারই অন্তরে এই নিগূঢ় ভেদ স্থাপন করিয়া থাকি।" সে স্তরে ছালেকের ইবাদত বন্দেগী থেকে শুরু করিয়া প্রত্যেকটি কর্মকান্ড-নিয়ত করুক, আর নাই করুক-এপ্লাসের সাথে সম্পন্ন হয়। আর যাহারা প্রকৃত ফানার স্তর লাভ করে নাই-তাহারা নাফসের দোষ বা নাফসের উৎস আগুণ, পানি, মাটি ও বাতাসের তমদোষ থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত হইতে পারে নাই বিধায়-তাহাদের এপ্লাস পরিপূর্ণ হয় না।
সুতরাং বুঝা গেল-এপ্লাস পূর্ণ করিতে হইলে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে বাতেনী জগতের সমুদয় স্তর পার হইয়া খোদাতায়ালার প্রকার বিহীন জাতের সান্নিধ্যে পৌছাইতে হইবে অর্থাৎ বাতেনী শরীয়ত বা মারেফাতের পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে।
বুযুর্গানে দ্বীন শরীয়তকে তিনটি অংশে ভাগ করিয়াছেন। যথাঃ এলেম, আমল ও এখলাস।
★ এলেম-ইবাদত সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জন করা; তথা ফরজ, ওয়াজেব, সুন্নত, নফল, মোস্তাহাব, হালাল, হারাম, ইত্যাদি বিধান সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা।
★ আমল-অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কর্মানুষ্ঠান করা।
★ এখলাস-উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা অর্জন করা। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে প্রকাশ্য ও গুপ্ত যাবতীয় উপাস্যতুল্য উদ্দেশ্য সমূহকে নিবারণ করিয়া মারেফাতের সমুদয় স্তর পার হইয়া খোদাতায়ালার প্রকারবিহীন জাতের সান্নিধ্যে পৌঁছাইয়া কেবলমাত্র জাতের উপাসনা করার যথাযথ যোগ্যতা অর্জন করা। কিন্তু উল্লিখিত যোগ্যতা অর্জন করিতে হইলে বাতেনী শরীয়ত তথা তরিকত ও হকিকতের পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে। এখানে উল্লেখ্যঃ বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত ছায়ের করিয়া যে জ্ঞান অর্জন করা যায়-তাহাই তরিকত জ্ঞান এবং আকরাবিয়াত হইতে শুরু করিয়া সর্বশেষ মাকাম হোব্বে সেরফা বা মাবুদিয়াতে সেরফা পর্যন্ত ছায়ের করিয়া যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়-তাহাই হকিকত জ্ঞান। সর্বশেষ মাকামে খোদাতায়ালার পরিচয় সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা জন্মে-তাহাই মারেফাত জ্ঞান। প্রচলিত কথায় তরিকত ও হকিকতকেও মারেফাত বলা হয়। উপরের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হইল যে-এপ্লাসের গুণ অর্জন করিতে হইলে উরুজ, ছায়ের, ফানা-বাকার মাধ্যমে তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে-ইহার কোন বিকল্প নাই।
এখলাস বা উদ্দেশ্য-বিশুদ্ধির নির্দেশ খোদাতায়ালা আমাদেরকে দিয়াছেন। আল্লাহপাক বলেন, খালেস হৃদয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহতায়ালার ইবাদত করুক-ইহা ব্যতীত তাহাদিগকে আর কোন নির্দেশ দেওয়া হয় নাই।" (সূরা বাইয়্যেনাহঃ আয়াত-৫)
তাই এখলাসশূন্য ইবাদত আল্লাহপাক গ্রহণ করেন না। এলেম ও আমল যতই থাকুক না কেন, যদি তাহাতে এপ্লাস না থাকে-তবে তাহা কবুল হইবে না। এইজন্য এখলাসকে শরীয়তের এক অংশ (মূল অংশ) হিসেবে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু তরিকত ও হকিকতের জ্ঞান ছাড়া অর্থাৎ (প্রচলিত কথায়) মারেফাতের সাধনালব্ধ জ্ঞান ছাড়া এখলাসের গুণ আসে না। তাই বলা হয়-মারেফাত হইল শরীয়তের খাদেম। শরীয়তের পূর্ণতা অর্জন করিতে হইলে মারেফাতের সাধনা অর্থাৎ তরিকত ও হকিকতের জ্ঞান অর্জন অত্যাবশ্যক।
কিন্তু তরিকত বা হকিকতের জ্ঞানই হউক, ফানা-বাকা, উরুজ-ছায়ের, ছায়েরে এলাল্লাহ, ছায়েরে ফিল্লাহ-যাহাই হউক না কেন; ইত্যাকার বিষয়াদির জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন পীর-মোর্শেদের তালিম'ও তরবিয়ত। মোর্শেদ ভিন্ন বাতেনী জ্ঞান অর্জন সম্ভব নহে। বিগত দিনেও মোর্শেদের তালিম ও তরবিয়ত ব্যতীত কেহ যথার্থ এপ্লাসের গুণ অর্জন করিতে পারে নাই। ভবিষ্যতেও পারিবে না।
হে জাকেরান সকল! তোমরা যদি এখলাস বা উদ্দেশ্য-বিশুদ্ধির যথার্থ গুণ অর্জন করিয়া শরীয়তের পূর্ণ জ্ঞান হাছিল করিতে চাও; তবে যে তালিম দেওয়া হইতেছে-সেই অনুযায়ী আমল কর এবং পীরের নির্দেশ যথাযথ পালন কর। আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন। তোমরা এখলাসের গুণসমৃদ্ধ হও। এই দু'আ করিয়া এ নসিহত এখানেই শেষ করিতেছি। আমীন!







