শিশু নির্যাতনে আলেমদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আসিফ নজরুল

শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে আলেম সমাজের একটি বড় অংশের দৃশ্যমান প্রতিবাদ না থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অপরাধের অভিযোগ উঠলে আলেম সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (২৪ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক পোস্টে এসব বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন আসিফ নজরুল। তাঁর বক্তব্যে শিশুদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় নেতৃত্বের সামাজিক দায়িত্ব এবং যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছে।
আসিফ নজরুল উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের আলেম সমাজে বহু সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি রয়েছেন। ধর্মীয় শিক্ষা, সমাজসেবা এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁদের অনেকে সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তবে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আলেম সমাজের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন রয়েছে।
তাঁর মতে, ধর্মীয় অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এমন ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও অভিযোগগুলোর গুরুত্ব কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়। অপরাধের অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার পক্ষে সামাজিক অবস্থান তৈরি করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
ফেসবুক পোস্টে আসিফ নজরুল আলেম সমাজের একটি অংশের প্রতিবাদের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, বিনোদন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের অনেককে সক্রিয় অবস্থান নিতে দেখা যায়। কিন্তু শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ সামনে এলে তাঁদের অনেকের কাছ থেকে একই ধরনের প্রকাশ্য প্রতিবাদ দেখা যায় না।
এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা এবং আলেম সমাজের নেতৃত্বের স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া উচিত বলে তাঁর অভিমত।
বিজ্ঞাপন
আসিফ নজরুলের বক্তব্যের মূল বিষয় হচ্ছে, শিশুদের নিরাপত্তা ও অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান যেন কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
আলেম সমাজের সামাজিক মর্যাদার প্রসঙ্গ তুলে আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশের ধর্মীয় নেতাদের প্রতি সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রয়েছে। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক ভূমিকার মাধ্যমে এই অবস্থান তৈরি হয়েছে।
তবে নিজেদের অঙ্গনে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখা কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি অযৌক্তিক সহানুভূতি প্রদর্শন করা হলে সেই আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিজ্ঞাপন
তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো আলেম সমাজের ওপর চাপানো সমীচীন নয়। একইভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অপরাধের অভিযোগকে আড়াল করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ ধরনের ঘটনায় যথাযথ অবস্থান নেওয়া না হলে সাধারণ মানুষের কাছে আলেম সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রতিও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতাদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আসিফ নজরুল।
বিজ্ঞাপন
তিনি মনে করেন, ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে শিশু নির্যাতন, বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ও সুস্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া প্রয়োজন। ধর্মীয় সভা, ওয়াজ-মাহফিল এবং অন্যান্য সামাজিক পরিসরে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে আলেমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
একই সঙ্গে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো এবং অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজে যাঁদের নৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব রয়েছে, শিশুদের সুরক্ষায় তাঁদের দায়িত্বশীল ভূমিকা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আসিফ নজরুলের পোস্টে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
তাঁর আশঙ্কা, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে মোকাবিলা না করা কিংবা অপরাধের অভিযোগকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বৃহত্তর ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে ধর্মীয় নেতৃত্বের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ফেসবুক পোস্টে আসিফ নজরুল আশা প্রকাশ করেন, আলেম সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সব ক্ষেত্রে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
তাঁর আহ্বানের কেন্দ্রে রয়েছে শিশু নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জোরালো করা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি।
আসিফ নজরুলের বক্তব্যে মূলত আলেম সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেই শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে আরও দায়িত্বশীল, প্রকাশ্য ও কার্যকর ভূমিকা পালনের প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছে।









