ভুয়া প্রকল্পের কোটি টাকা গণপূর্ত প্রকৌশলী আলমগীরের পকেটে

গণপূর্ত অধিদপ্তরে (পিডব্লিউডি) চাকরি মানেই অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে, এই অভিযোগ এখন আর কেবল জনশ্রুতি নয়; বরং নথি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও অডিট রিপোর্টে প্রতিফলিত একটি কাঠামোগত দুর্নীতির চিত্র।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খান এর বিরুদ্ধে জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় তথাকথিত নিরাপত্তা জোরদারের নামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে কোটি টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৬, ঢাকা-এর আওতায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
প্রকল্প নথি অনুযায়ী সেখানে স্থাপনের কথা ছিল: ৩টি ১৬-চ্যানেল ডিভিআর ১২টি পিটিজেড (চঞত) সিসি ক্যামেরা ১০টি ডে-নাইট ভিশন ক্যামেরা ৩টি ডিসপ্লে মনিটরসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। অনেক ক্যামেরা অচল, কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার অনুপযোগী, আবার কোথাও কোথাও ক্যামেরা আদৌ স্থাপনই করা হয়নি। এতসব ঘাটতির পরও প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয় যা সরকারি আর্থিক বিধিমালা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
পিপিআর লঙ্ঘনের অভিযোগ: নথি পর্যালোচনায় আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর পত্র স্মারক নং ৩৫০২ (তারিখ: ১৪ জুন ২০১৬) এবং স্মারক নং ৩৫০৭ ও ৩৫০৮ (তারিখ: ১৫ জুন ২০১৬), এই তিনটি পত্রের মাধ্যমে মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে একই ঠিকাদারকে তিনটি কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুযায়ী একটি গুরুতর অনিয়ম। এতে প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয়েছে এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে বেআইনিভাবে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব কার্যাদেশ অনুমোদন ও বিল ছাড়ের পেছনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খানের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও নির্দেশনা ছিল।
জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে এসব বিষয়সহ একাধিক গুরুতর অনিয়ম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে এত বড় অনিয়মের পরও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এই প্রশ্ন এখন রহস্যে রূপ নিয়েছে।
একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে মো. আলমগীর খান ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় একাধিক বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্লট ক্রয় করেছেন। পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
সূত্রগুলো বলছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ঢাকা জোন দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও ছত্রছায়া ব্যবহার করে অভিযুক্ত কর্মকর্তা বছরের পর বছর জবাবদিহির বাইরে থেকে গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খান বলেন, আমার বিরুদ্ধে লেখালেখি করলে পরিণাম হবে ভয়াবহ। আমি গোপনে নয়, প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার আদর্শে রাজনীতি করি। কাউকে ভয় পাই না। আমি বহু সাংবাদিকদের পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। বেশ কয়েকজনকে জেলে পাঠিয়েছি। তোর পরিণতি তাই হবে। জেল খাটার জন্য প্রস্তুত হও।
এ বিষয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করেছেন। এতে সাধারণ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হয়েছেন। যদি প্রকৌশলী পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেন। কিংবা ভুয়া প্রকল্প দেখালে সেটা দুর্নীতি।
বিজ্ঞাপন








