শোককে শক্তিতে বদলে কানাডার ইতিহাস গড়লেন স্টিফেন ইউস্তাকিও

ফুটবল কখনো শুধু একটি খেলা নয়, অনেক সময় এটি হয়ে ওঠে সংগ্রাম, ত্যাগ আর ব্যক্তিগত বেদনা জয় করার এক অনন্য গল্প। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে কানাডার মিডফিল্ডার স্টিফেন ইউস্তাকিও সেই গল্পেরই নতুন এক অধ্যায় রচনা করেছেন। বাবা-মাকে হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়েই তিনি এমন এক গোল করেছেন, যা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কানাডার জায়গা নিশ্চিত করেছে।
বিজ্ঞাপন
লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে পৌঁছেছে, তখন ডি-বক্সের বাইরে বল পেয়ে দারুণ এক শটে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসকে পরাস্ত করেন ইউস্তাকিও। তাঁর সেই একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় কানাডা এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলো নিশ্চিত করে।
২৯ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারে এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে স্মরণীয় গোলগুলোর একটি। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক বেদনাময় ব্যক্তিগত অধ্যায়।
বিজ্ঞাপন
২০২৩ সালে পর্তুগিজ ক্লাব পোর্তোর হয়ে ম্যাচ খেলাকালীন সময়েই ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ইউস্তাকিওর মা এসমেরালদা। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরের বছর আকস্মিক হৃদরোগে হারান বাবাকেও। অল্প সময়ের ব্যবধানে মা-বাবা দুজনকে হারানো তাঁর জীবনে বড় ধরনের মানসিক আঘাত হয়ে আসে।
তবে এই কঠিন সময়েই ব্যক্তিগত জীবনে আসে নতুন আলো। প্রেমিকা কনস্টান্টার সঙ্গে তাঁদের পরিবারে জন্ম নেয় কন্যাসন্তান বেনেদিতা। পরিবারের এই নতুন সদস্যই অনেকটা নতুন করে এগিয়ে চলার প্রেরণা জুগিয়েছেন বলে মনে করেন ইউস্তাকিও।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, তাঁর প্রতিটি অর্জন পরিবারের জন্য উৎসর্গ করা। বাবা-মা, প্রেমিকা, কন্যা, ভাই এবং দেশের বন্ধুদের কথাই তিনি সবসময় মনে রাখেন এবং তাঁদের জন্যই সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
বিজ্ঞাপন

ইউস্তাকিওর বড় ভাই মাউরো ইউস্তাকিও, যিনি বর্তমানে ইন্টার টরন্টো এফসির প্রধান কোচ, ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানান, মা-বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শোককে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তিতে পরিণত করবেন। তাঁদের বিশ্বাস, বাবা-মা জীবনের পথচলার জন্য যে শিক্ষা ও সাহস দিয়ে গেছেন, এখন সেই স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব তাঁদের নিজেদের।
মাউরো আরও বলেন, কানাডার ওন্টারিওর লিমিংটনে বড় একটি পর্তুগিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁদের বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই স্থানীয় মাঠে নিয়মিত ফুটবল খেলতে খেলতেই স্টিফেনের ফুটবল-স্বপ্নের ভিত্তি তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইউস্তাকিওর যাত্রা শুরু হয়েছিল কানাডার বয়সভিত্তিক দলে। ২০১২ সালে তিনি এজিএস কাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। পরে কিছু সময় পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়েও খেলেন এবং ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে অংশ নেন।
বিজ্ঞাপন
তবে ২০১৯ সালে তিনি স্থায়ীভাবে কানাডার জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন। একই বছরের অক্টোবরে কনকাকাফ নেশনস লিগে সিনিয়র দলে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ২০২১ সালের গোল্ড কাপে প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন। পরবর্তীতে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৩ কনকাকাফ নেশনস লিগের ফাইনাল এবং ক্লাব পর্যায়ে পোর্তোর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও খেলেছেন এই মিডফিল্ডার।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিস ইনজুরির কারণে খেলতে না পারায় অন্তর্বর্তীকালীন অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেন ইউস্তাকিও। অধিনায়ক হিসেবে দলকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিতে পারায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন: জাপানই নেইমারের সবচেয়ে প্রিয় প্রতিপক্ষ!
বিজ্ঞাপন
ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, পুরো দল শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস ধরে রেখেছিল। খেলোয়াড়রা জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করেছেন এবং এই জয় কানাডার সব মানুষের জন্য উৎসর্গ করতে চান।
নিজের করা জয়সূচক গোল সম্পর্কে ইউস্তাকিও বলেন, শট নেওয়ার সময় তাঁর মনে হচ্ছিল যেন পুরো কানাডা তাঁর সঙ্গে একই মুহূর্তে শট নিচ্ছে। দেশের মানুষের সমর্থন ও বিশ্বাসই যেন সেই বলকে জালে পৌঁছে দিয়েছে।
কানাডার জার্সিতে এটি ছিল তাঁর ৬১তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং জাতীয় দলের হয়ে ষষ্ঠ গোল। তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও এই গোলের মূল্য অনেক বেশি, কারণ এর মাধ্যমেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে উত্তর আমেরিকার দেশটি।
বিজ্ঞাপন
শেষ ৩২-এর বাধা পেরিয়ে এখন শেষ ষোলোর লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লক্ষ্যে তারা পরবর্তী ম্যাচে নেদারল্যান্ডস ও মরক্কোর মধ্যকার বিজয়ী দলের মুখোমুখি হবে। ঐতিহাসিক জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে নতুন আরেকটি অধ্যায় লেখার অপেক্ষায় এখন ইউস্তাকিও ও তাঁর দল।








