উইম্বলডনে ফিলিস্তিনের প্রতীক নিয়ে আলোচনায় তুর্কি তারকা সনমেজ

উইম্বলডনের এবারের আসরে কেবল পারফরম্যান্স নয়, নিজের নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থানের কারণেও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তুরস্কের টেনিস খেলোয়াড় জেইনেপ সনমেজ। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নিলেও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশের অনন্য উপায়ে তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
২৪ বছর বয়সী এই তুর্কি টেনিস খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেয়ার লিউর কাছে ৭-৫ ও ৬-৩ সেটে হেরে উইম্বলডন অভিযান শেষ করেন। তবে কোর্টে তাঁর উপস্থিতি কেবল খেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। টুর্নামেন্ট কর্তৃপক্ষ পোশাকে ফিলিস্তিন-সমর্থনের প্রতীক ব্যবহার করতে অনুমতি না দেওয়ায় তিনি ভিন্ন পথ বেছে নেন। নিজের র্যাকেটের স্ট্রিংয়ে তরমুজ আকৃতির একটি ভাইব্রেশন ড্যাম্পেনার সংযুক্ত করে তিনি ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির বার্তা দেন।
ফিলিস্তিনের পতাকার রং—লাল, সবুজ, সাদা ও কালোর সঙ্গে তরমুজের রঙের মিল থাকায় বহু বছর ধরে এটি ফিলিস্তিনি পরিচয় ও সংহতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শনে নানা বিধিনিষেধের পর থেকে এই প্রতীক আরও বেশি পরিচিতি পায়।
ম্যাচ শেষে তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সনমেজ জানান, আগে তিনি পোশাকে একটি ব্যাজ ব্যবহার করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সেটি পরার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর দাবি, তিনি আয়োজকদের কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন—ইউক্রেনের প্রতি সংহতি প্রকাশের প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি থাকলে ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে কেন একই সুযোগ থাকবে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, এমন কোনো প্রতীক পোশাকে বহন করতে দেওয়া হবে না।
বিজ্ঞাপন
এই পরিস্থিতিতে তিনি নিজের র্যাকেটকেই বার্তা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। তাঁর ভাষ্য, খেলার সরঞ্জামে থাকা ওই প্রতীক নিয়ে আয়োজকদের আপত্তি করার সুযোগ ছিল না। ফলে নীরব প্রতিবাদের সেই উদ্যোগই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
সনমেজের এই পদক্ষেপ তুরস্কেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। দেশটির যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী ওসমান আসকিন বাক বলেন, মানবিক সংকটের সময়ে খেলাধুলাও সার্বজনীন মূল্যবোধের পক্ষে শক্তিশালী বার্তা বহন করতে পারে এবং সনমেজ সেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
এ ছাড়া তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) মুখপাত্র ওমের চেলিকও তাঁর অবস্থানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, মানবিক মূল্যবোধ ও মর্যাদার পক্ষে সনমেজ যে অবস্থান নিয়েছেন, তা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
অপরদিকে সনমেজ নিজেও দেশের মানুষের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দর্শক ও সমর্থকদের ভালোবাসা তাঁকে সবসময় সাহস জুগিয়েছে এবং কোর্টে কখনো একা মনে হয়নি।
বলগার্ল থেকে দেশের ইতিহাস গড়া টেনিস তারকা
ইস্তাম্বুলে ২০০২ সালের ৩০ এপ্রিল জন্ম নেওয়া জেইনেপ সনমেজের টেনিস যাত্রা শুরু হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। প্রায় এক দশক আগে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত একটি ডব্লিউটিএ টুর্নামেন্টে তিনি বলগার্ল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময় স্বদেশি খেলোয়াড় চাগলা বুয়ুকাকচায়ের ঐতিহাসিক সাফল্য তাঁকে পেশাদার টেনিসে ক্যারিয়ার গড়ার অনুপ্রেরণা দেয়।
বিজ্ঞাপন
তাঁর প্রতিভা খুব অল্প বয়সেই নজর কাড়ে। স্থানীয় ক্রীড়া গণমাধ্যম তাঁকে ভবিষ্যতের ‘গোল্ডেন র্যাকেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। দীর্ঘ ১৫ বছরের কঠোর অনুশীলন ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তিনি।
২০২৫ মৌসুমে অসাধারণ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি হার্পার্স বাজার তুরকিয়ে উইমেন অব দ্য ইয়ার অনুষ্ঠানে ‘অ্যাথলেট অব দ্য ইয়ার’ সম্মাননাও অর্জন করেন।
বর্তমানে কোচ ইসাম জেল্লালি ও মেহমেত বায়রাকতারের তত্ত্বাবধানে তাঁর খেলায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে উইম্বলডনের বাছাইপর্বে একটি হতাশাজনক পরাজয়ের পর তিনি নিজের খেলার ধরনে বড় পরিবর্তন আনেন। আগের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেন, যা তাঁর গতি ও কোর্ট কভার করার দক্ষতার সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
ক্যারিয়ারের পুরো সময়জুড়েই সনমেজ ক্রীড়াসুলভ আচরণের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। মনাস্তিরে একটি টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষ ইভা লাইসের সঙ্গে পারস্পরিকভাবে লাইন কল সংশোধন করে তিনি ফেয়ার প্লের উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেন। সেই ঘটনা আন্তর্জাতিক টেনিস অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়।
রেকর্ড ভাঙার ধারাবাহিকতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সনমেজের পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে। ক্যারিয়ারে তিনি ইতোমধ্যে ছয় লাখ ২৫ হাজার ডলারের বেশি প্রাইজমানি জিতেছেন। চলতি মৌসুমে ৩০টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ২৪টি জয় তুলে নিয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
২০২৪ সালে মেক্সিকোর মেরিদায় অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিএ ২৫০ প্রতিযোগিতায় প্রথম একক শিরোপা জিতে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন পরিচিতি পান। ফাইনালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান লিকে সহজেই পরাজিত করেন।
এরপর ধারাবাহিক ভালো ফলের সুবাদে তিনি ডব্লিউটিএ র্যাঙ্কিংয়ে ইতিহাস গড়ে তুরস্কের সর্বোচ্চ র্যাঙ্কধারী নারী টেনিস খেলোয়াড়ে পরিণত হন। দেশের আগের সেরা র্যাঙ্কিং ভেঙে তিনি বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ৫১ নম্বরে উঠে আসেন।
গ্র্যান্ড স্লামেও তাঁর সাফল্য নজরকাড়া। ২০২৫ সালে উইম্বলডনে ওপেন যুগে প্রথম তুর্কি খেলোয়াড় হিসেবে তৃতীয় রাউন্ডে পৌঁছে ইতিহাস গড়েন। পরের বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেও একই কৃতিত্ব দেখিয়ে প্রমাণ করেন, এটি কোনো আকস্মিক সাফল্য ছিল না।
বিজ্ঞাপন
মেলবোর্নে তিনি হাঙ্গেরির আনা বন্ডারকে হারানোর পাশাপাশি শীর্ষ বাছাইদের একজন একাতেরিনা আলেক্সান্দ্রোভাকেও বিদায় করেন। এছাড়া স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিত পোর্শে টেনিস গ্রাঁ প্রিতে বিশ্বের অষ্টম র্যাঙ্কধারী জ্যাসমিন পাওলিনিকে হারিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম শীর্ষ-১০ জয়ও তুলে নেন।
উইম্বলডনে এবারের যাত্রা খুব বেশি দূর এগোয়নি। তবে কোর্টের ভেতরে পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কোর্টের বাইরের অবস্থানের কারণেও জেইনেপ সনমেজ এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম আলোচিত নাম। তাঁর এই পদক্ষেপ খেলাধুলা, ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ এবং বৈশ্বিক মানবিক ইস্যু—তিনটিকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।








