Logo

বিশ্বকাপে ভিএআর বিতর্ক কেন, কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?

profile picture
ক্রীড়া ডেস্ক
১০ জুলাই, ২০২৬, ১৪:৫২
বিশ্বকাপে ভিএআর বিতর্ক কেন, কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?
ছবি: সংগৃহীত

ফিফা বিশ্বকাপে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তি আবারও তীব্র আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এক নাটকীয় ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও মিশরের লড়াইকে ঘিরে ভিএআরের কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

একটি গোল বাতিল এবং সম্ভাব্য পেনাল্টির ঘটনায় ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মিশরের কোচ, খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা। এর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে—ভিএআর কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং কেন এর সিদ্ধান্ত নিয়ে এত বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচে নতুন বিতর্ক

শেষ ষোলোর ম্যাচে একসময় ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল মিশর। তবে শেষ দিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা এবং টানা তিন গোল করে জয় নিশ্চিত করে। কিন্তু ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মুহূর্তে ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশরীয় শিবির ক্ষোভ প্রকাশ করে।

বিজ্ঞাপন

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তাফা জিকোর করা একটি গোল বাতিল করা হয়। রিভিউতে দেখা যায়, আক্রমণের শুরুতে মিডফিল্ডার মারওয়ান আতিয়া প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে ফাউল করেছিলেন। সেই কারণেই গোলটি বাতিলের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

মিশরের দাবি, একই ধরনের একটি ঘটনায় কিছুক্ষণ পর তাদের তারকা খেলোয়াড় মোহাম্মদ সালাহ প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে ফাউলের শিকার হলেও সেখানে কোনো পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। ভিএআরও হস্তক্ষেপ করেনি। এই দুই ঘটনার ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েই বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ম্যাচ শেষে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে ধরে রাখতেই হয়তো এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে ফিফার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

ভিএআর কী?

ভিএআর বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি হলো এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর সহায়ক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারিদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভিডিও বিশ্লেষণের সহায়তা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

ফিফা ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, মাঠের রেফারি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখতে না পারলে বা ভুল সিদ্ধান্ত দিলে ভিডিও ফুটেজ দেখে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া।

মাঠের বাইরের একটি বিশেষ কক্ষে একদল ম্যাচ কর্মকর্তা বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করেন। প্রয়োজন মনে হলে তারা মাঠের রেফারিকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় দেখতে বলেন। এরপর সব ভিডিও বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন মাঠের রেফারিই।

২০২৬ বিশ্বকাপে ভিএআরের অপারেশন কক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস শহরে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা সব ম্যাচের ভিডিও পর্যবেক্ষণ করছেন।

বিজ্ঞাপন

কোন কোন ঘটনায় ভিএআর ব্যবহার করা হয়?

সব ধরনের ফাউল বা সিদ্ধান্তে ভিএআর ব্যবহার করা হয় না। নির্দিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— গোল হওয়ার আগে কোনো নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে কি না; পেনাল্টি দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত; সরাসরি লাল কার্ড প্রদর্শনের ঘটনা; ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া হলে তা সংশোধন; স্পষ্ট ভুলে কর্নার কিক দেওয়া হলে তা পর্যালোচনা এবং দ্বিতীয় হলুদ কার্ড থেকে লাল কার্ড দেখানোর ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভুল থাকলে সেটিও পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়।

তবে বল গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না, সেটি নির্ধারণে ভিএআরের ভূমিকা নেই। এ জন্য আলাদা গোললাইন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ম্যাচ বলের ভেতরে থাকা বিশেষ সেন্সর থেকে সরাসরি রেফারির স্মার্টওয়াচে সংকেত পৌঁছে যায়।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপে ভিএআরের ইতিহাস

রাশিয়ায় ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রথমবার ভিএআর ব্যবহৃত হয়। সে আসরে ৬৪ ম্যাচে মোট ২০ বার প্রযুক্তিটির হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছিল। এর মধ্যে ১৭টি ক্ষেত্রে মাঠের রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ফাইনালে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ। ভিএআর পর্যালোচনার পর ফ্রান্সকে একটি পেনাল্টি দেওয়া হয়, যা থেকে গোল করে তারা ম্যাচে এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতে নেয়।

বিজ্ঞাপন

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ভিএআরের হস্তক্ষেপের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭-এ। মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে রেফারিরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজেদের আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন।

চলতি বিশ্বকাপে পরিস্থিতি

২০২৬ বিশ্বকাপ এখনো চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত ভিএআর নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠিত ৯৬ ম্যাচে রেফারিদের ২৩ বার মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে হয়েছে। আগের দুই বিশ্বকাপের তুলনায় ম্যাচপ্রতি হস্তক্ষেপের হার কিছুটা কম।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার ফিফা রেফারিদের স্বাভাবিক শারীরিক সংস্পর্শকে খেলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে অপ্রয়োজনীয় ফাউল কম বাঁশি বাজানো হচ্ছে এবং খেলার গতি বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এর ফল হিসেবে চলতি বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে গড় ফাউলের সংখ্যাও আগের তুলনায় কমে এসেছে। যেখানে ২০১৮ বিশ্বকাপে ম্যাচপ্রতি গড়ে ২৭টি এবং ২০২২ বিশ্বকাপে ২৫টি ফাউল হয়েছিল, সেখানে এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২২.৬-এ।

কেন বিতর্ক থামছে না?

ভিএআরের মূল লক্ষ্য রেফারিদের ভুল কমানো হলেও এর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, একই ধরনের ঘটনায় কখনো ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে, যা দর্শক, খেলোয়াড় এবং কোচদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করছে।

ফুটবল বিশ্লেষক ও ভিএআর বিশেষজ্ঞ ডেইল জনসনের মতে, মিশরের বাতিল হওয়া গোলের ঘটনায় ভিএআরের সিদ্ধান্ত টুর্নামেন্টজুড়ে অনুসৃত মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তার মতে, মাঠে যদি একই ধরনের সংস্পর্শকে স্বাভাবিক ধরা হয়, তাহলে ভিএআর পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও সেই একই নীতি অনুসরণ করা উচিত।

তবে মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টির দাবি নিয়ে তিনি ভিন্ন মত দেন। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পেনাল্টি বক্সের ভেতরের ঘটনায় ফাউল প্রমাণের মানদণ্ড আরও কঠোর হওয়ায় ভিএআর সেখানে হস্তক্ষেপ না করাকে অস্বাভাবিক বলা যায় না।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রযুক্তির ব্যবহার ফুটবলে নির্ভুলতা বাড়ালেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সমান মানদণ্ড বজায় রাখা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে ভিএআরকে ঘিরে বিতর্কও থামছে না।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD