আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের বিতর্কে কে এই আলোচিত রেফারি

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার নাটকীয় লড়াই শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে একটি নাম—ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় মিশর। এরপর ম্যাচের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দেশটির কোচ ও খেলোয়াড়রা। তাদের অভিযোগ, রেফারির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
বিজ্ঞাপন
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে বিশেষ করে ভিএআরের সহায়তায় মিশরের একটি গোল বাতিল, আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে মিশরের পেনাল্টির আবেদন নাকচ এবং কয়েকটি ফাউল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
কে এই ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে?
ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ১৯৮৯ সালের ২৩ এপ্রিল ফ্রান্সের ব্রিটানিতে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ রেফারি হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালে ফরাসি লিগ ওয়ানে নিয়মিত ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে সর্বোচ্চ পর্যায়ের রেফারিং ক্যারিয়ার শুরু করেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৭ সালে তিনি ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির স্বীকৃতি পান। এরপর দ্রুতই উয়েফার এলিট ক্যাটাগরির রেফারিদের তালিকায় জায়গা করে নেন। ২০১৮ সালে বুলগেরিয়া ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার মধ্যকার ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে সিনিয়র আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার অভিষেক হয়।
বড় বড় ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা
ক্যারিয়ারে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন লেতেক্সিয়ে। ২০১৯ সালে উয়েফা ইয়ুথ লিগের ফাইনাল পরিচালনা করেন তিনি। ২০২১ সালে কুপ দে ফ্রান্সের ফাইনালে দায়িত্ব পালন করেন এবং একই বছর উয়েফা ইউরোপা লিগ ফাইনালে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) হিসেবেও কাজ করেন।
বিজ্ঞাপন
২০২৩ সালে ম্যানচেস্টার সিটি ও সেভিয়ার মধ্যকার উয়েফা সুপার কাপের প্রধান রেফারি ছিলেন তিনি। এরপর ২০২৪ সালে উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্পেন ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পান।
মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল পরিচালনা করে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ফাইনাল রেফারির রেকর্ডও গড়েন লেতেক্সিয়ে। একই বছর অলিম্পিক ফুটবল টুর্নামেন্টেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করেন তিনি।
এছাড়া ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালসহ একাধিক বড় ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালেও সৌদি প্রো লিগের ঐতিহাসিক রিয়াদ ডার্বি এবং উয়েফা ইউরোপা লিগের ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
বিতর্কের বাইরেও নয়
যদিও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে লেতেক্সিয়েকে দক্ষ রেফারি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়, তবুও কয়েকটি ম্যাচে তার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
২০২২ সালে ফরাসি লিগ টুর ম্যাচে সেন্ট-এতিয়েনের তিন ফুটবলার ও দলের এক কর্মকর্তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। একই বছরের নিস ও নঁতের ম্যাচেও একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বকাপে নতুন বিতর্ক
২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের আগে দুটি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন লেতেক্সিয়ে। ওই দুই ম্যাচে তিনি আটটি হলুদ কার্ড দেখালেও কোনো লাল কার্ড বা পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দিতে হয়নি।
তবে আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মিশরের কোচ হোসাম হাসান এবং ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, রেফারির সিদ্ধান্তগুলো তাদের বিপক্ষে গেছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে মিশরের বাতিল হওয়া গোল এবং শেষ মুহূর্তে পেনাল্টির আবেদন প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি নিয়ে তারা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, এসব সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিজ্ঞাপন
ফুটবলপ্রেমীদের প্রশ্ন
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী লেতেক্সিয়ের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, ইউরো ফাইনালের মতো বিশ্বের অন্যতম বড় ম্যাচ সফলভাবে পরিচালনা করা একজন অভিজ্ঞ রেফারি কীভাবে এত বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিলেন।
অন্যদিকে, এখন পর্যন্ত ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিফা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ব্যক্তিগত জীবন
মাঠের বাইরে লেতেক্সিয়ে একজন পারিবারিক মানুষ। তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের বাবা। রেফারিংয়ের পাশাপাশি খণ্ডকালীন আদালতের বেইলিফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বিশ্ব ফুটবলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও স্বীকৃত রেফারি হলেও আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের নাম এখন ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ম্যাচের রেফারিং নিয়ে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কত দূর গড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।








