আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ : ফাউল ও গোল বাতিলে উত্তাল ফুটবলবিশ্ব

আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার রোমাঞ্চকর ম্যাচ শেষ হলেও এর রেশ এখনও কাটেনি। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ম্যাচজুড়ে রেফারির একাধিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। বিশেষ করে ভিএআরের সহায়তায় মিশরের একটি গোল বাতিল এবং আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সম্ভাব্য ফাউলের অভিযোগ নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা।
বিজ্ঞাপন
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান রেফারিং নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানান। তিনি বলেন, এই ম্যাচে ন্যায্যতা ও ফেয়ার প্লের প্রতিফলন দেখা যায়নি। তার দাবি, মাঠের ভেতরের কিছু সিদ্ধান্ত এবং মাঠের বাইরের কিছু প্রভাব ম্যাচের ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।
হোসাম হাসানের অভিযোগ, ম্যাচ শুরুর আগেই আর্জেন্টিনা শিবির রেফারির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল, যার প্রভাব ম্যাচ পরিচালনায় পড়েছে বলে তিনি মনে করেন। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি, তবুও সংবাদ সম্মেলনে তিনি একাধিকবার একই বিষয় উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
শুধু কোচই নন, মিশরের বেশ কয়েকজন ফুটবলারও ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের কাছে একই ধরনের অভিযোগ করেন। ম্যাচের একমাত্র গোলদাতা মোস্তফা জিকো মাঠেই আরবি ভাষার একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি দাবি করেন, তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তাদের বিপক্ষে গেছে।
ভিএআরের সিদ্ধান্তে বাতিল হয় মিশরের গুরুত্বপূর্ণ গোল
দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে মিশর আক্রমণে উঠে আসে। নিজেদের অর্ধ থেকে দ্রুতগতির আক্রমণে মারমুশ বল বাড়ান মোহাম্মদ সালাহর কাছে। সালাহর নিখুঁত পাস থেকে মোস্তফা জিকো বল জালে পাঠালে মিশরীয় খেলোয়াড়রা গোল উদযাপন শুরু করেন।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু উদযাপনের মাঝেই রেফারি খেলা থামিয়ে ভিএআরের সহায়তা নেন। ভিডিও রিপ্লে বিশ্লেষণের পর দেখা যায়, আক্রমণের শুরুতে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার সময় মিশরের মারওয়ান আতিয়া তার পায়ে স্টাড লাগিয়েছিলেন। সেই ঘটনাকে ফাউল হিসেবে বিবেচনা করে পুরো আক্রমণ বাতিল করা হয় এবং জিকোর গোলও গণ্য হয়নি।
ভিডিও রিপ্লেতে ফাউলের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় সেটি নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি। তবে সমালোচনার মূল বিষয় ছিল, ঘটনার পর খেলা অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পর গোল হওয়ার মুহূর্তে এসে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা।
চলমান আসরে রেফারিরা অনেক ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার পর ভিএআরের সহায়তায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। এমনকি স্পষ্ট অফসাইডের ক্ষেত্রেও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিরা পতাকা তুলতে দেরি করছেন, যাতে আক্রমণ শেষ হওয়ার পর ভিডিও পর্যালোচনার সুযোগ থাকে। এই পদ্ধতি পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই অনুসরণ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

তারপরও অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষক মনে করছেন, মিশরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত কঠোর ছিল।
সাবেক ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি টেলিভিশন বিশ্লেষণে মন্তব্য করেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু মিশরের জন্য নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের জন্যই হতাশাজনক। তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করে।
অন্যদিকে সাবেক মেক্সিকান স্ট্রাইকার হ্যাভিয়ের হার্নান্দেজের মতে, লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ওপর হওয়া সংস্পর্শটি খুবই হালকা ধরনের ছিল। তার বিশ্বাস, এমন পরিস্থিতিতে গোল বাতিল না করলেও চলত।
বিজ্ঞাপন
আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোল ঘিরেও নতুন বিতর্ক
ম্যাচের যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনা যখন জয়ের জন্য মরিয়া, তখন আরেকটি বিতর্কিত মুহূর্তের জন্ম হয়। নিজেদের ডি-বক্সের সামনে মোহাম্মদ সালাহর কাছ থেকে বল দখল করেন হুলিয়ান আলভারেজ। সেই আক্রমণ থেকে বল পৌঁছে যায় লাউতারো মার্টিনেজের কাছে এবং তার বাড়ানো ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।
গোলটি নিয়ে কোনো বিতর্ক না থাকলেও মিশরের দাবি ছিল, আলভারেজ বল নেওয়ার সময় সালাহকে ফাউল করা হয়েছিল। খেলোয়াড়রা রেফারির কাছে আপত্তি জানালেও তিনি খেলা থামাননি কিংবা ভিএআরের সহায়তাও নেননি।
বিজ্ঞাপন
এই ঘটনাই নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ, মিশরের গোল বাতিলের আগে আক্রমণের সূচনায় সংঘটিত ফাউল ভিএআরের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হলেও, আর্জেন্টিনার গোলের আগে একই ধরনের অভিযোগ কেন পরীক্ষা করা হলো না—এ প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশ্লেষক।
ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার ইয়ান রাইট টেলিভিশন বিশ্লেষণে বলেন, সালাহর ওপর হওয়া চ্যালেঞ্জটি পুনরায় দেখা উচিত ছিল। তার মতে, সেটি ফাউল হলে আর্জেন্টিনার গোলও বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
তবে একই অনুষ্ঠানে ভিন্ন মত দেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিন। তিনি বলেন, সালাহ খুব সহজেই ভারসাম্য হারিয়েছেন এবং রেফারির সিদ্ধান্তকে ভুল বলা কঠিন। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ফুটবলে অতীতেও দেখা গেছে বড় দলগুলো অনেক সময় বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে সেই কারণ দেখিয়ে আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের কৃতিত্ব অস্বীকার করা ঠিক হবে না। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে যেভাবে তারা ম্যাচে ফিরেছে, সেটি প্রশংসার দাবিদার।
দুই দলের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন
ম্যাচ শেষে মিশর শিবিরে ছিল হতাশা ও ক্ষোভের আবহ। খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সমর্থকদের বিশ্বাস, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্ত তাদের বিপক্ষে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফল হাতছাড়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শিবির পুরো ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের মতে, জয়ের মূল কারণ ছিল দলের মানসিক দৃঢ়তা, লড়াই করার মনোভাব এবং শেষ পর্যন্ত হাল না ছাড়ার মানসিকতা।
ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে দলের অধিনায়ক লিওনেল মেসি বলেন, এই ম্যাচে দলের আত্মবিশ্বাস, সংগ্রামী মানসিকতা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, এই দলকে নিয়ে তিনি গর্বিত এবং খেলোয়াড়রা আবারও প্রমাণ করেছে যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তারা কখনো আত্মসমর্পণ করে না।








