ঘরজামাই দত্তক নিচ্ছে জাপানের ধনী পরিবারগুলো, সুযোগ আছে বাংলাদেশিদেরও

বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে জামাই হিসেবে যাওয়ার পর যদি সেই পরিবারই আপনাকে নিজেদের ছেলে হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে বিষয়টি অনেকের কাছেই অবাক করার মতো হতে পারে। শুধু পরিবারের সদস্য হওয়াই নয়, একসময় শ্বশুরবাড়ির পদবি, ব্যবসা, সম্পদ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা উত্তরাধিকারও আপনার হাতে চলে আসতে পারে। জাপানে এমন ঘটনা মোটেও অপরিচিত নয়। বরং দেশটির দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক ও আইনি প্রথার অংশ হিসেবে মেয়ের স্বামীকে দত্তক নিয়ে পরিবারের ছেলে ও উত্তরসূরি বানানোর রীতি রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ভাবুন, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গেলেন জামাই হয়ে। কিছুদিন পর দেখলেন, শুধু স্বামী হিসেবে নয়—পরিবারের নতুন সদস্য হিসেবেও আপনার পরিচয় তৈরি হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির পদবি আপনার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একসময় পরিবারের ব্যবসা, সম্পদ এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা উত্তরাধিকারও এসে পড়েছে আপনার হাতে।
জাপানে এমন ঘটনা একেবারে অচেনা নয়। বরং দেশটির দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক ও আইনি প্রথা আছে, যেখানে মেয়ের স্বামীকেই দত্তক নিয়ে পরিবারের ছেলে ও উত্তরসূরি বানানো হয়। এই প্রথার নাম ‘মুকোয়োশি’—সহজ বাংলায় বলা যায়, ‘দত্তক ঘরজামাই’।
বিশ্বের অনেক দেশে দত্তক নেওয়ার সঙ্গে শিশুকে নতুন পরিবারে বড় করে তোলার ধারণাই বেশি পরিচিত। জাপানের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকেও দত্তক নেওয়ার রীতি বেশ প্রচলিত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মোট দত্তকের ৯০ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে নিয়ে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের এভাবে পরিবারে নেওয়া হয়। তবে এর পেছনে শুধু পারিবারিক আবেগ নয়, অনেক সময় থাকে ভবিষ্যতের হিসাব-নিকাশও।
ছেলে নেই, তাই জামাইই উত্তরসূরি
জাপানে বহু পুরোনো ব্যবসা এখনো পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত হয়। কোনো পরিবারে ছেলে না থাকলে কিংবা পরিবারের নিজের ছেলেকে ব্যবসার পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবে উপযুক্ত মনে না হলে তারা একজন যোগ্য পুরুষকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সেই ব্যক্তি যদি পরিবারের মেয়ের স্বামী হন, তাহলে বিষয়টি আরও সহজ হয়। বিয়ের পর তাকে দত্তক নেওয়া হলে তিনি শ্বশুরবাড়ির পদবি গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে পরিবারের ব্যবসা, সম্পদ ও উত্তরাধিকার তার হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ, সম্পর্কটি শুধু জামাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি ধীরে ধীরে পরিবারের একজন পূর্ণাঙ্গ সদস্য এবং অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী কর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
‘মুকোয়োশি’র পেছনে সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি হলো ধারাবাহিকতা। পরিবারের পদবি যেন হারিয়ে না যায়, ব্যবসার নেতৃত্ব যেন পরিবারের বাইরে চলে না যায় এবং বহু বছরের প্রতিষ্ঠান যেন পরবর্তী প্রজন্মেও টিকে থাকে—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ধরে রাখার পথ হিসেবেই প্রথাটি ব্যবহৃত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জাপানি সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে বিয়ের পর স্ত্রী স্বামীর পদবি গ্রহণ করেন। ফলে কোনো পরিবারে ছেলে না থাকলে পরিবারের পদবি টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। মেয়ের স্বামীকে দত্তক নিয়ে তাকে পরিবারের পদবি দেওয়ার মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধান করা হয়।
এভাবেই একজন জামাই একই সঙ্গে হয়ে ওঠেন পরিবারের ছেলে, ব্যবসার উত্তরসূরি এবং বংশের নাম বহনকারী।
জাপানের বড় ব্যবসার ইতিহাসেও ‘মুকোয়োশি’র ছাপ রয়েছে। সুজুকি মোটর করপোরেশনের নেতৃত্বে একাধিকবার দত্তক পুত্রের আগমন ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের প্রধান ওসামু সুজুকিও ছিলেন এই প্রথায় পরিবারে আসা একজন দত্তক ঘরজামাই।
বিজ্ঞাপন
নিনটেনডো, কিক্কোমান ও টয়োটার মতো জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সম্পর্ক দেখা গেছে।
ফলে জাপানের কিছু বিখ্যাত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক ধারাবাহিকতার পেছনেও রয়েছে এই অদ্ভুত অথচ কার্যকর সামাজিক রীতি।
‘মুকোয়োশি’র ব্যবহার ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরাধিকার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে দত্তক নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। বিশেষ করে নিঃসন্তান দম্পতিরা ভবিষ্যতে সম্পদ কার হাতে যাবে, সেটি নিশ্চিত করতে এই পথ বেছে নিতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
দত্তক প্রক্রিয়াটি জাপানের সরকারি পারিবারিক নথি ‘কোসেকি’-তে নিবন্ধিত হয়। দত্তক সম্পন্ন হওয়ার পর ওই ব্যক্তি নতুন পরিবারের পদবি গ্রহণ করেন এবং জন্মসন্তানের মতোই উত্তরাধিকার ও পারিবারিক দায়িত্ব পান।
তবে এর সঙ্গে দায়িত্বও আসে। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনার দায়িত্বও দত্তক নেওয়া সন্তানের ওপর বর্তাতে পারে।
বিদেশিরাও কি হতে পারেন ‘মুকোয়োশি’?
বিজ্ঞাপন
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই ব্যবস্থায় কি বিদেশিদেরও জায়গা আছে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি থাকা বিদেশিরাও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দত্তক হতে পারেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
অর্থাৎ, কোনো বাংলাদেশি ব্যক্তি শর্ত পূরণ করলে জাপানি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক সন্তান হতে পারেন। তবে দত্তক হলেই জাপানের নাগরিকত্ব বা ভিসা পাওয়া যায় না। সেগুলোর জন্য আলাদা আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জন্মহার কমছে, গুরুত্ব বাড়ছে উত্তরাধিকারীর
আধুনিক জাপানে জন্মহার কমে যাওয়ার সঙ্গে এই প্রথার গুরুত্বের একটি নতুন মাত্রাও তৈরি হয়েছে। অনেক পারিবারিক ব্যবসার মালিকের সন্তান থাকলেও ছেলে নেই। আবার নিজের সন্তান ব্যবসা পরিচালনায় আগ্রহী বা উপযুক্ত না-ও হতে পারেন।
তখন পরিবারের সামনে প্রশ্ন আসে—শত বছরের ব্যবসা কে চালাবে?
বিজ্ঞাপন
উত্তর খুঁজতে গিয়ে কোনো কোনো পরিবার পুত্রসন্তান জন্মের অপেক্ষায় না থেকে একজন উপযুক্ত ‘জামাই’কেই বেছে নেয়। এমনকি উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে দেওয়ার জন্য জাপানে বিশেষ ম্যাচমেকিং সেবারও অস্তিত্ব রয়েছে।
এ নিয়ে জাপানে একটি প্রচলিত কথাও আছে—‘ছেলে তুমি বেছে নিতে পারো না, কিন্তু জামাই বেছে নিতে পারো।’
তবে সময়ের সঙ্গে ‘মুকোয়োশি’ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আধুনিক জাপানে নারীরা ব্যবসা, রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফলে শুধু পুরুষ উত্তরাধিকারী খোঁজার পুরোনো ধারণা কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তারপরও প্রথাটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
কারও কাছে এটি একজন জামাইকে পরিবারের ছেলে হিসেবে গ্রহণ করার একটি সামাজিক ব্যবস্থা। কারও কাছে এটি শত বছরের পুরোনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখার কৌশল। আবার কারও কাছে পরিবারের পদবি, সম্পদ ও উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ঐতিহাসিক পদ্ধতি।
জাপানের ‘মুকোয়োশি’ তাই শুধু দত্তক নেওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিয়ে, পরিবার, ব্যবসা, সম্পদ, উত্তরাধিকার এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সমাজব্যবস্থার এক অনন্য সহাবস্থান।








