দুই শতাব্দী আগের কাবিননামায় কনের ৩ শর্ত এক ভিন্নধর্মী ইতিহাস

ঢাকা জাতীয় জাদুঘরের কাচের বাক্সে সংরক্ষিত একটি পুরোনো কাবিননামা সামনে এনেছে প্রায় দুই শতাব্দী আগের এক বিয়ের ভিন্নধর্মী ইতিহাস। ফারসি ভাষায় লেখা ওই দলিলে কনের পক্ষ থেকে দাম্পত্য জীবন নিয়ে তিনটি শর্ত দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দলিল অনুযায়ী, কনে ছিলেন আফসারুন নেসা খাতুন এবং বর তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরী। কাবিননামার অনুবাদ ও হিজরি সালের উল্লেখ বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁদের বিয়ে হয়েছিল ১৮২৩ সালের অক্টোবরে। তবে জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারির বিবরণ ও নথিতে ১৯২৩ সাল উল্লেখ থাকায় দলিলটির সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিক অসংগতি রয়েছে।
কনের তিন শর্ত
কাবিননামায় আফসারুন নেসা খাতুনের তিনটি শর্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে ছিল বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে না করা, একাধারে ছয় মাস স্ত্রীকে ছেড়ে না থাকা এবং স্ত্রীর কোনো ত্রুটি হলে স্বামী শাস্তি দিতে পারলেও শরীরে দাগ সৃষ্টি না করা।
বিজ্ঞাপন
দলিল অনুযায়ী, হোসেন উদ্দীন চৌধুরী কনের এসব শর্ত মেনে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেছিলেন। বিয়ের দেনমোহরও ছিল উল্লেখযোগ্য—পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও ৫০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
শুধু দেনমোহর নয়, দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন বিষয়ও যে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হতো, এই কাবিননামা তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
একই সময়ের আরেক কাবিননামা
এ ধরনের শর্তযুক্ত কাবিননামার আরেকটি উদাহরণ রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে। ১৮২৬ সালের ৯ মার্চ চট্টগ্রামের ফতেহাবাদের মীর আমানি ওরফে মীর খানের সঙ্গে ফতেপুরের মুছাম্মৎ লুতফুন নিসা বিনতে খোন্দকার মুনিরুদ্দিনের বিয়ের সময় দলিলটি তৈরি করা হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
ওই কাবিননামায় চারটি শর্ত ছিল। এর মধ্যে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে না করা, অনুমতি ছাড়া দূর প্রবাসে না যাওয়া, স্ত্রীর দেনমোহর ও সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া এবং মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের দেখাশোনার জন্য স্ত্রীকে যেতে বাধা না দেওয়ার বিষয় উল্লেখ ছিল।
১৯৭৬ সালে সংগ্রহ করা কাবিননামাটির বাংলা অনুবাদ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ গবেষক হাফিজ মাহবুবুর রহমান। বর্তমানে দলিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটি ৩০ টাকায় কিনেছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
কাবিননামা ছিল লিখিত চুক্তি
বিজ্ঞাপন
দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম বিবাহ আইন ও এর বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনিসুর রহমান। তাঁর মতে, সে সময় অনেক মুসলিম পরিবারের বিয়ের চুক্তিতে দেনমোহরের পাশাপাশি দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করার প্রচলন ছিল। অভিজাত ও বিত্তশালী পরিবারে এমন লিখিত শর্তের নজিরও পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, একাধিক বিয়ের প্রচলনের প্রেক্ষাপটে প্রথম স্ত্রীর অধিকার, দেনমোহর ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে কাবিননামায় বিভিন্ন শর্ত রাখা হতো।
আনিসুর রহমানের ভাষ্য, ‘কাবিননামা একটি চুক্তি। ১৯৭৪ সালে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনটি পাস হওয়ার পর থেকে দেশে যে কাবিননামা প্রচলিত আছে, সেখানে অনেকগুলো ধারা দেওয়া আছে। বর-কনের পরিচয় থেকে আগের বিয়ের তথ্য, দেনমোহর থেকে তালাকের ক্ষমতাসহ অনেক বিষয় এতে উল্লেখ আছে।’
বিজ্ঞাপন
তাঁর মতে, জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত কাবিননামাটি যে সময়ের, তখন এ ধরনের কাবিননামা তৈরির জন্য নির্দিষ্ট আইন ছিল না। সাধারণভাবে মৌখিক সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হলেও উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলো লিখিত প্রমাণ সংরক্ষণ করত। বিশেষ করে দেনমোহর ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি লিখিত রাখার প্রয়োজন থেকেই এমন দলিল তৈরি করা হতো।
জাদুঘরে এল যেভাবে
আফসারুন নেসা খাতুন ও হোসেন উদ্দীন চৌধুরীর বিয়ের কাবিননামাটি জাতীয় জাদুঘরে উপহার দিয়েছিলেন লেখক ও ইতিহাসবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর। তিনি তৎকালীন ঢাকা জাদুঘরের, বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরের, ট্রাস্টি ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
কাবিননামার পাশাপাশি প্রাচীন ও মোগল মুদ্রা, প্রত্নসামগ্রী ও পূর্ব ভারত থেকে পাওয়া অস্ত্রশস্ত্রসহ দুই শতাধিক দুর্লভ সামগ্রী তিনি জাদুঘরকে উপহার দিয়েছিলেন। তবে কাবিননামাটি ঠিক কোন সময়ে তাঁর কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালের আগের অধিকাংশ সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সালের তথ্য সংরক্ষিত নেই। পুরোনো রেজিস্টার থেকে এই কাবিননামার দাতার নাম জানা গেছে।
১৮২৩ নাকি ১৯২৩?
বিজ্ঞাপন
দলিলটির সময়কাল নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারির সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও নথিতে ১৯২৩ সাল লেখা রয়েছে। তবে কাবিননামার নিচের অংশে থাকা হিজরি সালের উল্লেখ বিশ্লেষণ করে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের গবেষক মুমিত আল রশিদ এটিকে আরও প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো বলে মনে করছেন।
কাবিননামার ছবি পরীক্ষা করে তিনি জানান, সেখানে ১২০০ হিজরি উল্লেখ রয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী দলিলটি ১৯২৩ সালের হওয়ার সুযোগ নেই; বরং ১৮২৩ সালের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে কাবিননামার ফারসি লেখার কিছু অংশ অস্পষ্ট হওয়ায় পুরো দলিল অনুবাদ করা সম্ভব হয়নি। সময়কাল নিশ্চিত করতে এর ছবি ইরানের দুজন ও সিরিয়ার একজন ব্যক্তিকেও দেখানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
কাচের বাক্সে দুই শতাব্দীর ইতিহাস
বিজ্ঞাপন
জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলায় ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের ৩৩ নম্বর গ্যালারিতে পুরোনো দলিল, হাতে লেখা কোরআন, পাণ্ডুলিপি ও গাছের বাকলে লেখা পুঁথির সঙ্গে সংরক্ষিত আছে এই কাবিননামা।
ফারসি অক্ষরগুলো সময়ের সঙ্গে অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে গেলেও দলিলটি এখনও দর্শনার্থীদের কৌতূহল তৈরি করে। কারণ এটি শুধু একটি পুরোনো বিয়ের নথি নয়; এতে দাম্পত্য জীবনের শর্ত নিয়ে একজন নারীর অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে ভাবনারও একটি ঐতিহাসিক চিত্র পাওয়া যায়।
সময়ের সঙ্গে বিয়ের আইন ও কাবিননামার কাঠামো বদলেছে। কিন্তু প্রায় দুই শতাব্দী আগের এই বিবর্ণ দলিলটি দেখিয়ে দেয়, বিয়ের চুক্তিতে নিজের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি লিখিতভাবে নিশ্চিত করার ভাবনা নতুন কোনো ধারণা নয়।







