তিস্তার বুকে হাহাকার, রাজনৈতিক খেলার বলি কৃষকের স্বপ্ন

ভারতের সিকিম থেকে উৎপত্তি হয়ে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা পেরিয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে তিস্তা নদী। উত্তরের পাঁচ জেলার মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই নদী আজ কার্যত পানিশূন্য। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে তিস্তার চরাঞ্চলের চিত্র আমূল বদলে গেছে।
বিজ্ঞাপন
যেখানে একসময় ছিল অথৈ পানি, সেখানে এখন বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। নদীর পানি সরে যাওয়ায় পাঁচ জেলার অন্তত ৭৩৪টি চরে প্রায় ৮১ হাজার হেক্টর জমি রবি শস্যে ভরে উঠেছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের আশায় কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে এই সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যৎ শঙ্কা।
মাঘের হালকা শীতে যখন চরের কৃষকেরা বীজ, সার আর কোঁদাল-কাস্তে হাতে কাজে ব্যস্ত, তখন দূর থেকে ভেসে আসে ভোটের উত্তাপ। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ঝাঁপি খুলে প্রার্থীরা হাজির হচ্ছেন তিস্তাপাড়ে। কারো মুখে ‘পানির ন্যায্য হিস্যা’, কারো কণ্ঠে আবার ‘মহাপরিকল্পনা’। কিন্তু বাস্তবতায় তিস্তাপাড়ের মানুষ বলছেন, রাজনীতির টানাপোড়েনে পানির হিস্যা আজও অধরা।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের ভাষ্য, তিস্তা এখন আর নদী নয়—রাজনীতির দাবার বোর্ডে একখানা গুটি। সরকার বদলায়, প্রতিশ্রুতি বদলায়; কিন্তু নদীর ভাগ্য বদলায় না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একের পর এক ঘোষণা এলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তব কাজ শুরু হয়নি। ফলে ভোটের রাজনীতির দোলাচলে ঝুলে আছে প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারত থেকে তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে উত্তরাঞ্চলে। দেশের দরিদ্রতম ও ঝুঁকিপূর্ণ জেলার বড় একটি অংশ তিস্তাপাড়েই অবস্থিত। ২৩৮ বছরের পুরোনো এই নদী অসময়ের প্রবাহে কখনো বন্যা, কখনো খরা ডেকে আনছে—ভারী হচ্ছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
পানি কমছে, বাড়ছে মরুকরণ
বিজ্ঞাপন
পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় তিস্তাপাড়ের জীবনচক্র প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, বিপর্যস্ত হচ্ছে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। উজান থেকে আসা বিপুল পলিতে নদীর বুক ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষায় অল্প পানিতেই তিস্তা উপচে পড়ে লোকালয়ে, আবার শুষ্ক মৌসুমে নদী পরিণত হয় মরা খালে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, প্রতিবছর দুই কোটি টনের বেশি পলি বয়ে আনে তিস্তা। এতে নতুন নতুন চর জেগে উঠছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে ভাঙন ও ক্ষয়ক্ষতি। পলিতে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় কাউনিয়ার তিস্তা পয়েন্টে বিপৎসীমাও বাড়ানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় ন্যূনতম ১০ হাজার কিউসেক পানি থাকার কথা, সেখানে এখন ২০০ কিউসেকও পাওয়া যাচ্ছে না। যৌথ নদী কমিশন জানায়, ১৯৮৭ সাল থেকে ভারত একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করছে। ২০০০ সালের পর সংকট আরও প্রকট হয়। চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি হলেই যে পানি মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ সীমান্তবর্তী এলাকায় পানিই নেই। উজানে অবৈধ বাঁধ ও জলাধার তৈরি করে ভারত পানি আটকে রাখছে। তবু আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির জন্য চুক্তি জরুরি।
কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সংকট
বিজ্ঞাপন
রংপুর অঞ্চলের চরের কৃষকেরা জানান, পানির অভাবে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেচ প্রকল্পের পানিবণ্টন দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। নদীতে পানি না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সেনিকের ঝুঁকি। হারিয়ে যাচ্ছে মৎস্যসম্পদ, বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর শুষ্কতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন হচ্ছে না। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।
শুধু পানি নয়, দরকার নদীর সুরক্ষা
বিজ্ঞাপন
নদী গবেষক ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, পানির হিস্যার পাশাপাশি তিস্তা নদীর সুরক্ষা এখন সময়ের দাবি। ভাঙন রোধ, চর সংরক্ষণ ও নদী খনন না হলে উজানের পলিতে নদী আরও ভরাট হবে, বাড়বে অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা।
নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ইতিহাসের কোনো সময়েই তিস্তার সঠিক পরিচর্যা হয়নি। উল্টো দফায় দফায় ভুল সিদ্ধান্তে নদীকে ধ্বংস করা হয়েছে। যে নদী হওয়ার কথা ছিল উত্তরের জীবনরেখা, তা এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। নদীকে বাঁচাতে হলে আন্তর্জাতিক আদালতে পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে যেতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ভোটের আগে তিস্তা আবার আলোচনায়
তিস্তা নিয়ে আন্দোলন, সমাবেশ ও প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিচ্ছে। কেউ বলছেন ক্ষমতায় এলে প্রথম কাজ হবে তিস্তা, কেউ বলছেন পানি ফিরলেই ফিরবে উত্তরবঙ্গের জীবন।
কিন্তু তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই—এবার কি সত্যিই কিছু বদলাবে? নাকি তিস্তা আবারও থেকে যাবে ভোটের রাজনীতির দাবার গুটি হয়ে?
বিজ্ঞাপন
উত্তরের মানুষের চোখ এখন প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তব কাজের দিকে। কারণ তিস্তা বাঁচলে বাঁচবে কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি—আর বাঁচবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।








