Logo

‘বৃদ্ধাশ্রমে ইফতার আসে, কিন্তু সন্তানরা আসে না’

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
বগুড়া
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৯:২৫
‘বৃদ্ধাশ্রমে ইফতার আসে, কিন্তু সন্তানরা আসে না’
ছবি: সংগৃহীত

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ছোট একটি আশ্রমের বারান্দা রমজানের বিকেলে সাজানো হয় ইফতারের জন্য। ফল, পিয়াজু, ছোলা, শরবতসহ নানা খাবার পৌঁছে যায় ব্যক্তি উদ্যোগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহায়তায়। তবে আশ্রম ওল্ড অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হোমের বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় অভাব সন্তানদের উপস্থিতি। এই আশ্রমটি নিজ খরচে পরিচালনা করছেন পল্লী চিকিৎসক ডা. সেবিন।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে আশ্রমের প্রাঙ্গণ ছিল ব্যস্ত। কেউ রান্নাঘরে সাহায্য করছিলেন, কেউ নীরবে বসে ছিলেন, আর উঠানে কয়েকজন লুডু খেলায় মেতে উঠেছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি এক বড় পরিবার, কিন্তু ভেতরের শূন্যতা ধরা দেয় না।

বারান্দার এক কোণে বসেছিলেন বেলি খাতুন (৫৮)। চোখে-মুখে ঝরে থাকা দীর্ঘশ্বাস, কণ্ঠে চাপা বেদনা। তিনি বললেন, “এমন সন্তান যেন কারো ঘরে না হয়।” বেলি খাতুন তার জীবনের ভাঙা স্বপ্নের কথা জানালেন। তিনি সন্তানদের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো স্নেহময় স্পর্শ পাননি।

বিজ্ঞাপন

৫৫ বছরের গোলাপি বেগম জানান, “আমি এখানে দুই বছর ধরে আছি। স্বামী নেই, সন্তান নেই। এখানে সবাই একে অপরকে সহমর্মিতা দেখাই। কেউ খোঁজ নেয় না, তবু আশ্রম আমাকে পৃথিবীর এক উষ্ণ কোণে রাখে। মৃত্যু হলে এখানেই হোক।”

স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, “যারা এখানে আসেন, তারা কেউ অপরাধী নয়। জীবন দিয়ে সন্তানদের গড়ে তুলেছেন, কিন্তু অবহেলার কারণে আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের উচিত তাদের প্রতি যত্ন ও ভালোবাসা দেখানো। সরকারি সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা যেত।”

দুই বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই নিবাসে বর্তমানে ১৮ জন প্রবীণ বসবাস করছেন। ইতিমধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং তাদের দাফন করা হয়েছে আশ্রম সংলগ্ন নিজস্ব কবরস্থানে। এখানে থাকা অধিকাংশ প্রবীণ একসময় শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত জীবনযাপন করেছেন। তারা সন্তান বা পরিবারের থেকে মানসিক অবহেলার কারণে আশ্রয় নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আশ্রমের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেবিন বলেন, “এখানে আসা প্রবীণরা ভিক্ষা চান না। তারা চাই সম্মান এবং সামান্য স্নেহের স্পর্শ। আমরা তাদের তিনবেলা খাবার, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা দিই। রমজান মাসে প্রায় প্রতিদিন কেউ না কেউ ইফতার পাঠান। কিন্তু সন্তানদের উপস্থিতি খুবই কম। এটাই তাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট। আমার একার পক্ষে পরিচালনা করা কঠিন। তবে সরকারি বা সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতা করলে আমরা ২৫০ জনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারব।”

তবু ইফতারের সময় সবাই একসাথে বসে। খাবার আছে, হাসি আনন্দ আছে, কথোপকথনও আছে। কিন্তু চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ, নীরব শূন্যতা। এই বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি সন্ধ্যা শুধুই ইফতারের আয়োজন নয়, এটি প্রবীণ মানুষের নীরব অপেক্ষার গল্প, যেখানে সন্তানরা আসে না। রমজানের এই রাতে বারান্দা যেন প্রশ্ন রাখে—বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া কি শুধুই খাবার, নাকি একটু ভালোবাসা, একটি স্পর্শ।

জেবি/জেএইচআর
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD