Logo

শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলার দুই শতকের ইতিহাসে লুকানো গল্প

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
শেরপুর
১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৪৬
শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলার দুই শতকের ইতিহাসে লুকানো গল্প
ছবি: সংগৃহীত

শেরপুর পৌরসভার নবীনগর এলাকায় প্রতিবছর আয়োজন করা হয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা, যার ইতিহাস দুই শতকেরও বেশি পুরোনো। দীর্ঘদিন ধরে পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে এ মেলা বসে আসলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোরো মৌসুমের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই আয়োজন করা হচ্ছে। তবে এই মেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা অজানা কাহিনি ও লোককথা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত আছে, প্রায় ২০০ বছর আগে নবীনগর এলাকায় প্রায় তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ছাওয়াল পীরের একটি দরগা। সেই দরগাকে ঘিরেই শুরু হয় এই পৌষ মেলার আয়োজন, যা সময়ের সঙ্গে হয়ে ওঠে এলাকাবাসীর অন্যতম বড় সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব।

মেলার সূচনা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে পাওয়া যায় নানা গল্প। নবীনগর এলাকার বাসিন্দা প্রবীণ আইনজীবী ও সাংবাদিক ফকির আকতারুজ্জামান জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই মেলা চলে আসছে। তিনি শোনার ভিত্তিতে বলেন, ছাওয়াল পীরের আগমন ও তাকে কেন্দ্র করেই এই মেলার সূচনা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

ছাওয়াল পীরকে ঘিরে একটি বিস্ময়কর ঘটনার কথাও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। বলা হয়, তিনি মূলত ঈশ্বরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। পরে তার অনুসারীরা লাশ নিয়ে নবীনগরে আসেন। কবরস্থ করার সময় তারা নানা স্থানে চেষ্টা করেও সফল হননি। অবশেষে নবীনগরে পূর্ব-পশ্চিমমুখী করে কবর খনন করলে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এই ঘটনাকে ঘিরেই স্থানটি পবিত্র বলে বিবেচিত হয় এবং পরবর্তীতে সেখানে মেলা বসতে শুরু করে।

আরেকটি প্রচলিত কাহিনিতে জানা যায়, এক কৃষক ওই দরগার কাছাকাছি জমিতে কাজ করার সময় বারবার সমস্যায় পড়েন। পরে মানত করার পর তার সমস্যা দূর হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ মানত পূরণের উদ্দেশ্যে এখানে আসতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে এটি একটি বড় মেলায় রূপ নেয়।

বর্তমানে ছাওয়াল পীরের দরগার পাশের রোয়া বিলের তীরে বিশাল আয়োজনে এই মেলা বসে। মেলায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমাহার দেখা যায়—মুড়ি, মুড়কি, মোয়া, গজা, খোরমা, তিলের খাজা, বাদামসহ নানা রকমের মুখরোচক খাদ্যপণ্য বিক্রি হয়। এছাড়া মৃৎশিল্পীদের তৈরি বিভিন্ন খেলনা ও তৈজস, শিশুদের খেলনা, নারীদের প্রসাধনী ও অলংকারের দোকানও বসে।

বিজ্ঞাপন

একসময় এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা ও গাঙ্গি খেলা, যেখানে আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিযোগীরা অংশ নিতেন। এসব আয়োজন মেলাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত।

পৌষ মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর শেরপুর শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি মেলা নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য উপলক্ষ।

বিজ্ঞাপন

তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেলার কিছু ঐতিহ্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ফকির আকতারুজ্জামান বলেন, আগে যেভাবে উৎসবের আমেজ থাকত, এখন তা কিছুটা কমে গেছে। তবুও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যই এ আয়োজন অব্যাহত রাখা হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, একটি সুসংগঠিত মেলা কমিটি গঠন করা গেলে এই ঐতিহ্য আরও সুসংহতভাবে টিকে থাকবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD