কটিয়াদীর পঞ্চায়েতে কোরবানির গোশত পৌঁছে যায় প্রতিটি ঘরে

ঈদুল আজহার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু পশু কোরবানিতে নয়, বরং ত্যাগ, সাম্য ও ভাগাভাগির মধ্যেই নিহিত। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর এলাকার পূর্বপাড়া মহল্লায় সেই চেতনারই এক অনন্য উদাহরণ দেখা যায় প্রতি বছর।
বিজ্ঞাপন
প্রায় আড়াই শত বছরের পুরোনো পঞ্চায়েতভিত্তিক এই প্রথায় কোরবানির গোশত পৌঁছে দেওয়া হয় সমাজের প্রতিটি পরিবারের ঘরে, তারা কোরবানি দিক বা না দিক।
ঈদের নামাজ শেষে শুরু হয় ব্যতিক্রমধর্মী এই আয়োজন। সমাজের কোরবানিদাতারা তাদের পশুর নির্ধারিত অংশ পঞ্চায়েতের জন্য আলাদা করে দেন। পরে স্বেচ্ছাসেবকেরা বিভিন্ন বাড়ি থেকে সেই গোশত সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো করেন। এরপর ওজন করে সমান ভাগে বিভক্ত করা হয় এবং তালিকা অনুযায়ী প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
এ বছর পঞ্চায়েতের আওতাভুক্ত ৫৭০টি পরিবারের মধ্যে কোরবানির গোশত বিতরণ করা হয়েছে। কেউ উপস্থিত না থাকলেও তার প্রাপ্য অংশ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যাতে ঈদের আনন্দ থেকে কেউ বঞ্চিত না হন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সমাজে বৈষম্য কমানো এবং ধনী-গরিবের মধ্যে সৌহার্দ্যের বন্ধন দৃঢ় করার লক্ষ্যেই বহু বছর আগে এই প্রথার সূচনা হয়েছিল। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলালেও এই ঐতিহ্য আজও সমানভাবে টিকে আছে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পূর্বপাড়া মহল্লার পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। বর্তমানে পঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫৭০। প্রতি বছর এর মধ্যে গড়ে ৪০ থেকে ৪৬টি পরিবার কোরবানি দেয়। তবে কোরবানি না দেওয়া পরিবারগুলোও সমানভাবে গোশত পায়।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল্লাহ বলেন, ছোটবেলা থেকেই এই বণ্টন ব্যবস্থা দেখে আসছি। আমাদের পূর্বপুরুষরাও একইভাবে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে কোরবানির গোশত বিতরণ করতেন। বহু পুরোনো এই ঐতিহ্য এখনও অটুট রয়েছে।
আরও পড়ুন: সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেলযোগাযোগ বন্ধ
গোশত বণ্টনের দায়িত্বে থাকা শরিফ, মিজান ও আব্দুল্লাহ জানান, এ বছর ৫৭০টি পরিবারের তালিকা অনুযায়ী গোশত বিতরণ করা হয়েছে। কেউ নিতে না এলে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক ঐক্য ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়রা আরও জানান, কোরবানিদাতারা তাদের জবাইকৃত পশুর একটি অংশ এবং চামড়া পঞ্চায়েতের কাছে জমা দেন। পরে স্বেচ্ছাসেবকদের তত্ত্বাবধানে গোশত কেটে সমানভাবে ভাগ করা হয়। ফলে কোরবানি দেওয়া ও না দেওয়া—উভয় ধরনের পরিবারই সমানভাবে এই বণ্টনের সুফল পায়।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আধুনিক সময়ে অনেকটাই হারিয়ে গেলেও কটিয়াদীর পূর্বপাড়া মহল্লা এখনো ধরে রেখেছে তার মানবিক রূপ। যেখানে ঈদের আনন্দ কেবল কিছু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ছড়িয়ে পড়ে সমাজের প্রতিটি ঘরে। এই প্রথা সামাজিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও সমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আজও বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে।








