কাগজে তিনগুণ থাকলেও বাজারে নেই ইলিশ

ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশের দেখা মিলছে না। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় জাতীয় এই মাছের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অথচ সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন মাসে বরিশাল অঞ্চলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সরকারি হিসাব ও বাজারের বাস্তব চিত্রের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় প্রশ্ন উঠেছে জেলে, ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ক্রেতাদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে বড় আকারের ইলিশের পরিবর্তে বেশি ধরা পড়ছে ছোট মাছ ও জাটকা। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ট্রলিংয়ের কারণে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি হিসাবে রেকর্ড, বাস্তবে সংকট
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৪০ হাজার ৫১৬ টন ইলিশ আহরণ হয়েছে। গত বছরের জুনে এই পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪৯৬ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারি হিসাবে ইলিশ আহরণ বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার টন।
বিজ্ঞাপন
গত কয়েক বছরের হিসাবেও জুন মাসের এই উৎপাদনকে সর্বোচ্চ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২৪ সালে জুনে ২১ হাজার ৮২৭ টন, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৪৮২ টন, ২০২২ সালে ৩০ হাজার ৮২০ টন এবং ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৮৯২ টন ইলিশ আহরণের তথ্য রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে বাজারে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। মোকাম ও খুচরা বাজারে বড় ইলিশের সরবরাহ সীমিত। ফলে দাম বেড়েই চলেছে।
জেলেদের দাবি, ইলিশের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও বড় মাছের সংখ্যা কমেছে। বর্তমানে নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ ব্যবহার করে মোহনা থেকে ছোট ইলিশ ও জাটকা ধরে ফেলা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে আহরিত ইলিশের বড় একটি অংশই ছোট আকারের। বিশেষ করে ১০ ইঞ্চির কম আকারের জাটকা বাজারে আসছে, যা আইন অনুযায়ী ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ।
বার্ষিক হিসাবে কমছে ইলিশ আহরণ
জুন মাসের উৎপাদনের হিসাবের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বরিশাল বিভাগে বার্ষিক ইলিশ আহরণের পরিমাণ কমছে।
বিজ্ঞাপন
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার টনে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে কমেছে এক লাখ টনেরও বেশি।
এমনকি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৬৮ হাজার টন কম ইলিশ ধরা পড়েছে। ফলে একদিকে জুনে রেকর্ড উৎপাদনের দাবি, অন্যদিকে বছর শেষে উৎপাদন কমে যাওয়ার তথ্য—দুই ধরনের পরিসংখ্যান নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।
জেলেদের অভিযোগ, বড় ইলিশ হারিয়ে যাচ্ছে
বিজ্ঞাপন
কুয়াকাটা সংলগ্ন মহিপুর মৎস্য বন্দরের জেলে নাসির উদ্দিন জানান, আগে সাগরে বড় আকারের ইলিশ বেশি পাওয়া যেত। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছোট মাছ পাওয়া যাচ্ছে।
তার ভাষ্য, আগে ছোট ইলিশের ওজনও তুলনামূলক বেশি থাকত, কিন্তু এখন কয়েকটি ছোট ইলিশ মিলিয়ে এক কেজি হয়। বড় মাছ কমে যাওয়ার কারণে জেলেদের জালের ধরনও পরিবর্তন করতে হয়েছে।
বরগুনার পাথরঘাটা এলাকার জেলেরা জানান, নিষিদ্ধ ট্রলিংয়ের কারণে ইলিশের রেণু ও ছোট মাছ ধ্বংস হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বড় ইলিশের উৎপাদনে।
বিজ্ঞাপন
ভোলার তুলাতলি এলাকার এক মৎস্য ব্যবসায়ী বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশকের ব্যবসায় এমন সংকট আগে কখনো দেখেননি। তার দাবি, নদী ও সাগরে মাছ কম থাকায় অনেক ট্রলার তাদের খরচও তুলতে পারছে না।
ভরা মৌসুমেও আকাশছোঁয়া দাম
সরকারি হিসাবে ইলিশ আহরণ বাড়লেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং গত বছরের তুলনায় বিভিন্ন আকারের ইলিশের দাম কেজিতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। ৫০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকায়।
বাজারে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ৩০০ গ্রামের কম ওজনের জাটকা। আইন অনুযায়ী এসব মাছ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও তা উচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ক্রেতারা বলছেন, আগে যে দামে ইলিশ কেনা যেত, এখন একই মাছ কিনতে দ্বিগুণের কাছাকাছি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। ফলে অনেকেই ইলিশ কেনা বাদ দিয়ে বিকল্প মাছ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
ইলিশ ব্যবসায়ও নেমেছে সংকট
বরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, ইলিশ সংকটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী পেশা পরিবর্তন করছেন। গত কয়েক বছরে আড়তদারের সংখ্যাও কমেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে ইলিশ মৌসুমে ব্যস্ততা থাকলেও বর্তমানে দিনের পর দিন বসে থাকতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত মাছ না থাকায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৎস্য বিভাগের বক্তব্য
বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, জুন মাস থেকে ইলিশ মৌসুম শুরু হলেও প্রকৃত ভরা মৌসুম সাধারণত জুলাই থেকে শুরু হয়। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে সাগর থেকে নদীতে ইলিশের প্রবেশ বাড়বে এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা রয়েছে।
বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মহসীন জানান, জাটকা নিধনের কারণে ইলিশ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতেই উৎপাদনের হিসাব তৈরি করা হয়।
তবে সরকারি পরিসংখ্যান ও বাজারের বাস্তবতার এই পার্থক্য নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার সঠিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে ইলিশের ভবিষ্যৎ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু নিয়েই নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।








