Logo

পুরুষহীন ‘বউ মেলা’, হয় কোটি টাকার কেনাবেচা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
বগুড়া
১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৫৮
পুরুষহীন ‘বউ মেলা’, হয় কোটি টাকার কেনাবেচা
ছবি: সংগৃহীত

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের পোড়াদহ এলাকায় ইছামতী নদীর তীরে প্রতিবছর বসে দেশের অন্যতম প্রাচীন লোকজ আয়োজন পোড়াদহ মেলা। বাংলা পঞ্জিকার মাঘ মাসের শেষ বুধবার অনুষ্ঠিত এই মেলা শুধু ঐতিহ্যের ধারকই নয়, বরং বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। একদিনের এই আয়োজনকে ঘিরে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার বড় অংশই আসে মাছ বিক্রি থেকে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের কাছে এটি ‘জামাই মেলা’ নামেও সুপরিচিত। এদিন আশপাশের গ্রামগুলোতে মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের দাওয়াত দেওয়ার রীতি বহু পুরোনো। অনেকেই মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যান, যা দিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়ন করা হয়। এ কারণে মেলাটি পারিবারিক মিলনমেলারও রূপ নেয়।

মেলার পরদিন সকালেই শুরু হয় আরেকটি ব্যতিক্রমী আয়োজন—‘বউ মেলা’। এই মেলার বিশেষত্ব হলো, এখানে ক্রেতাদের প্রায় সবাই নারী এবং দোকানদার ছাড়া পুরুষদের প্রবেশে থাকে নিষেধাজ্ঞা। ফলে নারীরা নির্বিঘ্নে কেনাকাটার সুযোগ পান। রেশমি চুড়ি, প্রসাধনী, রান্নার সামগ্রী, খেলনা, মিষ্টান্নসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের সমাহার থাকে এ মেলায়। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই বউ মেলা আলাদা আকর্ষণ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ইছামতীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সারি সারি দোকানে ভোর থেকেই শুরু হয় কেনাবেচা। বড় বড় মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। ক্রেতাদের ভিড় ও হাঁকডাকে মুখর থাকে পুরো এলাকা। রুই, কাতলা, বোয়াল, পাঙাশ, আইড়সহ নানা প্রজাতির বড় মাছ মেলার প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া মাছের আদলে তৈরি বিশাল আকৃতির মিষ্টিও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।

লোকজ ঐতিহ্যের এই মেলায় শুধু মাছ বা মিষ্টিই নয়, বরং কাঠের আসবাব, লোহার সরঞ্জাম, প্রসাধনী, খেলনা, গৃহস্থালির সামগ্রীসহ নানা পণ্যের কেনাবেচা হয়। শিশুদের জন্য থাকে নাগরদোলা, মিনি ট্রেন, সার্কাস ও মোটরসাইকেল খেলার আয়োজন। পাশাপাশি অস্থায়ী খাবারের দোকানে ফুচকা, চটপটি, ভাজাপোড়া ও বিভিন্ন ধরনের আচার পাওয়া যায়।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছর আগে এই মেলার সূচনা। লোককথা অনুযায়ী, মাঘ মাসের শেষ বুধবার এক অলৌকিক কাতলা মাছ নদীতে ভেসে উঠত, যা দেখতে মানুষ জড়ো হতো। পরবর্তীতে এক সন্ন্যাসীর উদ্যোগে সেখানে পূজা শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এটি মেলায় রূপ নেয়। সেই সূত্রেই একসময় এটি ‘সন্ন্যাসী মেলা’ নামে পরিচিত ছিল, যা পরে স্থাননাম অনুসারে ‘পোড়াদহ মেলা’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

বিজ্ঞাপন

মেলার পরিচালনায় রয়েছে স্থানীয় মন্ডল পরিবার। বর্তমান আয়োজক কমিটির তথ্যমতে, প্রায় ৫০০টি দোকান বসে এ মেলায়। শুধু বউ মেলাতেই একদিনে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়। সব মিলিয়ে পুরো আয়োজনটি এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পোড়াদহ মেলা কেবল একটি কেনাবেচার স্থান নয়, বরং এটি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনস্থল। বছরের এই একটি সময়কে ঘিরেই আশপাশের শতাধিক গ্রামে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো কোনো বছর মেলা আয়োজন বন্ধও থাকে, তবুও এর ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তা এখনও অটুট রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD