Logo

ছয় জেলায় বজ্রপাতের তাণ্ডব, প্রাণ হারালেন ১২ জন

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২১:০৩
ছয় জেলায় বজ্রপাতের তাণ্ডব, প্রাণ হারালেন ১২ জন
ছবি: সংগৃহীত

দেশের ছয়টি জেলায় আকস্মিক বজ্রপাতের ঘটনায় একদিনেই ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া এসব পৃথক ঘটনায় আরও অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে সুনামগঞ্জে, যেখানে হাওরে ধান কাটার সময় পাঁচজন কৃষকের মৃত্যু হয়।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় প্রশাসন ও জেলা প্রতিনিধিদের তথ্যে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ, রংপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও দিরাই উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে একদিনেই পাঁচজন কৃষক প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তরুণ ও কিশোর শ্রমিকও। হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে খোলা মাঠে কাজ করার সময় তারা বজ্রপাতের কবলে পড়েন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ ঘটনাস্থলেই মারা যান, আবার কেউ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তাহিরপুর উপজেলার আবুল কালাম (২৫), জামালগঞ্জ উপজেলার নাজমুল হোসেন (২৬), ধর্মপাশা উপজেলার হাবিবুর রহমান (২৪) ও রহমত উল্লাহ (১৩), এবং দিরাই উপজেলার লিটন মিয়া (৩৮)।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে হাওরে কৃষকরা ধান কাটার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে আকাশ কালো হয়ে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাত শুরু হয়। একই সঙ্গে শুরু হয় বজ্রপাত। এতে একাধিক স্থানে পৃথকভাবে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরে বজ্রপাতে আবুল কালাম গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে নাজমুল হোসেন নামের এক কৃষক নিহত হন। তিনি চানপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

ধর্মপাশা উপজেলায় পৃথক দুটি ঘটনায় আরও দুইজন কৃষকের মৃত্যু হয়। হাবিবুর রহমান পাইকুরাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামের বাসিন্দা এবং বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। অপরদিকে রহমত উল্লাহ জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর গ্রামের কৃষক ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া দিরাই উপজেলার কালিয়াগোটা হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে লিটন মিয়া গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

রংপুরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণহানি

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় বজ্রপাতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন। সকালে বৃষ্টির সময় একটি বিলে মাছ ধরার সময় এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় কাজ করার সময় তারা বজ্রপাতের শিকার হন। আহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর দুইজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

নিহতরা হলেন স্থানীয় মৎস্যজীবী মিলন মিয়া (৩৫) এবং কৃষক তালেব উদ্দিন (৪৫)।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, সকালে ওই এলাকায় বৃষ্টি শুরু হলে ছোট শালমারা বিলে মাছ ধরার কাজ চলছিল। বিষয়টি দেখতে আশপাশের লোকজন, বিশেষ করে শিশুসহ ১৫ থেকে ২০ জন সেখানে ভিড় করেন। একই সময়ে একজন কৃষক পাশের একটি পুকুরে পানাজাতীয় আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছিলেন।

বিজ্ঞাপন

হঠাৎ করেই শুরু হয় বজ্রপাত। এতে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন আহত হন। পরে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।

হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৎস্যজীবী মিলন মিয়া এবং কৃষক তালেব উদ্দিন মারা যান বলে নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। আহতদের মধ্যে কয়েকজন শিশুও রয়েছে, যাদের চিকিৎসা চলছে।

মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন জানান, বৃষ্টির সময় হঠাৎ বজ্রপাত শুরু হলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। মাছ ধরার দৃশ্য দেখতে গিয়ে এবং আশপাশে অবস্থান করার সময় অনেকে এতে আক্রান্ত হন।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই দুইজনের মৃত্যু হয়। আহতদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ময়মনসিংহে কৃষক ও দোকানির মৃত্যু

ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও গফরগাঁও উপজেলায় বজ্রপাতে দুইজনের মৃত্যু হয়। একজন মুদি দোকানি ধানক্ষেত দেখতে গিয়ে এবং অন্যজন নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতের শিকার হন।

বিজ্ঞাপন

নিহতরা হলেন গৌরীপুর উপজেলার কোনাপাড়া গ্রামের ওলি মিয়ার ছেলে রহমত আলী উজ্জল (৩০) এবং গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের ধাইরগাঁও গ্রামের মৃত সেকান্দর আলী খানের ছেলে মমতাজ আলী খান (৫৮)।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রহমত আলী উজ্জল পেশায় একজন মুদি দোকানি ছিলেন। দুপুরের দিকে বৃষ্টি ও বজ্রপাত চলাকালীন সময়ে তিনি তার বোনজামাইয়ের ধানক্ষেত দেখতে পূর্ব কোনাপাড়া এলাকায় যান। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে স্থানীয়রা তার মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান জানান, বজ্রপাতে এক যুবকের মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে গফরগাঁও উপজেলায় মমতাজ আলী খান জোহরের নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, বজ্রপাতে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নেত্রকোণায় হাওরে ঘাস কাটতে গিয়ে মৃত্যু

নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলায় গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে এক বৃদ্ধ কৃষকের মৃত্যু হয়। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে স্থানীয়রা জানান।

নিহত কৃষকের নাম আলতু মিয়া (৬৫)। তিনি ওই গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে আলতু মিয়া হাওরে গরুর জন্য ঘাস কাটতে যান। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আকাশ অন্ধকার হয়ে বৃষ্টি শুরু হয় এবং একই সঙ্গে বজ্রপাতও ঘটে। ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলে স্থানীয়রা হাওরে গিয়ে আলতু মিয়ার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তারা মরদেহ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান।

ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পরিদর্শন করে এবং প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু করে।

আটপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুবায়দুল আলম জানান, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে।

হবিগঞ্জে ধান কাটার সময় কৃষকের মৃত্যু

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় ধান কাটার সময় বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। তিনি ছেলের সঙ্গে মাঠে কাজ করছিলেন। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর বজ্রপাত হলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

নিহত কৃষকের নাম সুনাম উদ্দিন (৫৫)। তিনি একই ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের বাসিন্দা।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুনাম উদ্দিন তার বর্গা নেওয়া বোরো জমিতে ছেলে নুরুজ্জামান মিয়া (২৫)-কে সঙ্গে নিয়ে ধান কাটার কাজ করছিলেন। কাটা ধান ছেলে বাড়িতে পাঠানোর সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বজ্রপাত হলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

ঘটনার পর আশপাশে থাকা শ্রমিকরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মো. জুয়েল মিয়া বলেন, সুনাম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বর্গা জমিতে কৃষিকাজ করতেন। ফসল ঘরে তোলার সময় এমন মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারটি গভীর সংকটে পড়েছে।

কিশোরগঞ্জে হাওরে কাজ করার সময় মৃত্যু

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায় হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে গেলে তিনি মারা যান।

নিহত কৃষকের নাম হলুদ মিয়া (৩৭)। তিনি উপজেলার ৯ নম্বর জয়কা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর কলাবাগ গ্রামের বাসিন্দা এবং নুরুল ইসলামের ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে হাওরে ধান কাটার কাজ চলাকালীন হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে এবং বজ্রপাত শুরু হয়। এ সময় হলুদ মিয়া ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন।

পরে স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান। তবে কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয়রা।

ঘটনার খবর পেয়ে করিমগঞ্জ থানা পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত করে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এমরানুল কবির জানান, বজ্রপাতে একজন কৃষকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

একই দিনে দেশের ছয় জেলায় এত বড় সংখ্যক প্রাণহানির ঘটনায় গ্রামীণ জনপদে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশেষ করে কৃষি কাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও হাওরাঞ্চলের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের আগেই বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। খোলা মাঠে কাজ করার সময় সতর্ক না থাকলে প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা কৃষকদের খারাপ আবহাওয়ার সময় খোলা জায়গা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD