Logo

চালু হয়েও বন্ধ ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্স, এখনো বঞ্চিত চরের মানুষ

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুর
১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১৭:৪৮
চালু হয়েও বন্ধ ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্স, এখনো বঞ্চিত চরের মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বড় উদ্যোগ হিসেবে চালু করা হয়েছিল ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সেবা তো দূরের কথা—চরের মানুষের জন্য চালু করা ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি একদিনও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়নি। বর্তমানে সেটি অচল অবস্থায় পড়ে আছে, যেন নিজেই অবহেলার শিকার।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, ২০২২ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোছাইন আকন্দ এই ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের উদ্বোধন করেন। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিচ্ছিন্ন চর আব্দুল্লাহ, তেলিয়ার চর ও চরগজারিয়ার প্রায় ২০ হাজার মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে এটি চালু করা হয়। জাইকা, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্পিডবোটটি কেনা হয়।

তবে উদ্বোধনের সময়ই প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি থেকে যায়—নিয়োগ দেওয়া হয়নি কোনো চালক। ফলে শুরু থেকেই অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহারের বাইরে থেকে যায়। প্রায় তিন বছর ছয় মাস পর দেখা যায়, রামগতি পৌরসভার আলেকজান্ডার এলাকার সেন্টার খালে অবহেলায় পড়ে আছে যানটি। দীর্ঘদিন অযত্নে থাকায় এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশও চুরি হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অ্যাম্বুলেন্স চালু থাকলেও ব্যবহার করা কঠিন ছিল। চরাঞ্চল থেকে রোগী আনা-নেওয়ায় খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দরিদ্র মানুষ তা ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়নি। ফলে প্রকল্পটি শুরু থেকেই কার্যকারিতা হারায়।

শুধু ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স নয়, একই প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি উপজেলায় ১৬টি স্থল অ্যাম্বুলেন্সও কেনা হয়েছিল। প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য প্রায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও চালক নিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত অর্থ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব অ্যাম্বুলেন্সও ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এ প্রকল্প ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স রোগী পরিবহনের বদলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সাধারণ যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নীতিমালায় উল্লেখ ছিল, প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্স তিনটি ইউনিয়নের রোগীদের সেবা দেবে। কিন্তু বাস্তবে চালকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দূরত্বে রোগী পরিবহনের প্রতি বেশি আগ্রহী হওয়ার অভিযোগ ওঠে, কারণ এতে বেশি ভাড়া পাওয়া যেত। ফলে স্থানীয় জরুরি সেবার প্রয়োজন পূরণ হয়নি।

চর আব্দুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মঞ্জু বলেন, নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই এটি চালু করা যায়নি, ফলে কোনো উপকারে আসেনি।

বিজ্ঞাপন

একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্পটি ভালো উদ্যোগ হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে তা ব্যর্থ হয়েছে। চালকদের নির্দিষ্ট বেতন না থাকায় তারা আগ্রহ হারান, আর ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষেও নিয়মিত অর্থ জোগান দেওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি সরাসরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের সম্পৃক্ততা ছিল না। ফলে তাদের পক্ষ থেকেও তদারকি বা কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। কেন এতদিন এটি অচল অবস্থায় পড়ে আছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

চরাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগটি বাস্তবায়নের অভাব, সমন্বয়হীনতা ও নজরদারির ঘাটতিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে—যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন দুর্গম এলাকার সাধারণ মানুষ।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD