মা হারা কন্যার বিয়েতে গাজীপুরের ডিসি, আবেগাপ্লুত হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ

সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। পরিচ্ছন্নতাকর্মী রতন বাসফোরের মেয়ের বিয়েতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে তিনি দেখিয়েছেন—মানুষই বড়, পদ নয়।
বিজ্ঞাপন
গাজীপুর মহানগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বিলাশপুর এলাকার নিয়ামত সড়কে অনুষ্ঠিত এই বিয়েতে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। স্থানীয়দের মতে, হরিজন (সুইপার) সম্প্রদায়ের কোনো পরিবারের বিয়েতে জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তার অংশগ্রহণ—এমন ঘটনা আগে দেখা যায়নি। এতে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় ব্যাপক সাড়া, আর আনন্দে ভাসে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জেলা প্রশাসক কনের পরিবারকে শুভেচ্ছা জানান এবং সবার সঙ্গে আন্তরিক সময় কাটান। তার এই অপ্রত্যাশিত উপস্থিতিতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকেই; কেউ কেউ আনন্দে তাকে প্রণামও করেন।
বিজ্ঞাপন
কনে প্রীতি রানী বাসফোর একজন কলেজ শিক্ষার্থী। অল্প বয়সেই মাকে হারানো এই তরুণীর বাবা রতন বাসফোর দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত। তার প্রয়াত মা সীমা রানী বাসফোরও ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-এ একই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলেছেন তারা।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “বাংলাদেশে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী বা পেশার ভিত্তিতে কাউকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র সবার জন্য সমান মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। আমাদের উচিত সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্মান করা এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।”
তিনি আরও বলেন, “কোনো পেশাই অসম্মানের নয়। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনই আমাদের দায়িত্ব—এই বার্তা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে হবে।”
বিজ্ঞাপন
ডিসির এই মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের মতে, উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ান, তখন তা শুধু একটি অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজে সমতা ও মানবিকতার শক্তিশালী বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহরিয়ার নজির এবং সহকারী কমিশনার মো. মাশরাফিকুর রহমান আবরারসহ জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, গাজীপুরসহ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে হরিজন সম্প্রদায়ের বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করে আসছেন। গাজীপুরের এই এলাকাতেই প্রায় ৩০০টির বেশি হরিজন পরিবার বসবাস করছে।
এই ব্যতিক্রমী ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—সমাজ বদলায় পদমর্যাদায় নয়, বরং বড় মনের মানুষের উদ্যোগেই।








