লাশের পাশে ছিল টাইপ করা অভিযোগপত্র, স্বামীকে খুঁজছে পুলিশ

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। নিহতদের মরদেহের পাশে কম্পিউটারে টাইপ করা একাধিক অভিযোগপত্র পাওয়া গেছে, যেখানে স্ত্রীকে পরকীয়া ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় পরিবারের কর্তা ফোরকান মিয়াকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (৯ মে) সকালে কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা গ্রামে একটি ভাড়া বাসা থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, শুক্রবার রাতের কোনো এক সময় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
নিহতরা হলেন— ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন খানম (৪০), তাদের তিন সন্তান মীম (১৬), মারিয়া (৮) ও ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়া (২২)। তারা গোপালগঞ্জ থেকে জীবিকার তাগিদে গাজীপুরে এসে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
আরও পড়ুন: দেশে আবারও ভূমিকম্প, উৎপত্তি কোথায়
বিজ্ঞাপন
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনাস্থলের দুটি কক্ষে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল রক্তের দাগ। এক কক্ষে খাটের ওপর কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখা ছিল রসুল মিয়ার মরদেহ। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। পাশের কক্ষে পড়ে ছিল তিন শিশুর গলাকাটা মরদেহ। আর শারমিন বেগমকে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় কম্পিউটারে টাইপ করা একাধিক অভিযোগপত্র। সেগুলোতে দাবি করা হয়েছে, স্ত্রী শারমিন খানম তার স্বামী ফোরকানের উপার্জিত ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে বাবার বাড়িতে জমি কিনেছেন। একই সঙ্গে তিনি খালাতো ভাই রাজু আহমেদের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন।
গত ৫ মে শারমিন খানম ও তার কথিত প্রেমিক রাজু আহমেদ মিলে ফোরকানকে মারধর করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। একই অভিযোগের কয়েকটি কপি মরদেহের পাশে ছড়িয়ে রাখা ছিল।
বিজ্ঞাপন
গাজীপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, উদ্ধার হওয়া কাগজগুলোতে অন্য থানার নাম উল্লেখ রয়েছে। এগুলো সত্যিই থানায় জমা দেওয়া হয়েছিল কি না, নাকি কেবল ঘটনাস্থলে রেখে যাওয়া হয়েছে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘর থেকে একটি হাতে লেখা চিরকুট, মদের বোতল এবং মাদকসেবনের কিছু আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে। রান্না করা সেমাই ও কোমল পানীয়ের নমুনাও জব্দ করা হয়েছে। খাবারের সঙ্গে কোনো চেতনানাশক মেশানো হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, সকালে পরিবারের কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেশী রেহানা বেগম বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। মাঝেমধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচিও শোনা যেত। তবে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে তা কেউ কল্পনাও করেননি।
আরেক প্রতিবেশী সাইদুল জানান, দাম্পত্য কলহের বিষয়টি এলাকায় পরিচিত ছিল। কিন্তু এর পেছনে আরও কোনো জটিলতা ছিল কি না, তা তারা জানতেন না।
নিহত শারমিনের স্বজনদের দাবি, ফোরকান দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকের জন্য শারমিনকে নির্যাতন করতেন। এ নিয়ে একাধিকবার পারিবারিক সালিসও হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শারমিনের চাচি ইভা রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান নিজেই ফোন করে বিষয়টি আত্মীয়দের জানিয়েছে। তাদের ধারণা, পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে।
শারমিনের বাবা শাহাদাত হোসেন বলেন, ফোরকান আগে থেকেই সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। তবে তারা কখনও ভাবেননি, শিশু সন্তানদেরও হত্যা করা হবে।
বিজ্ঞাপন
কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিনুর আলম জানান, উদ্ধার হওয়া অভিযোগপত্রগুলোতে কোনো স্বাক্ষর বা তারিখ নেই। তদন্তের অংশ হিসেবে সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে পলাতক ফোরকান মিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঘর থেকে মাদক সেবনের কিছু আলামত, রান্না করা সেমাই, কোকাকোলা ও একটি মদের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। খাবারের সঙ্গে কোনো চেতনানাশক মেশানো হয়েছিল কিনা, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশের ধারণা, দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং দাম্পত্য কলহের জের ধরেই এ মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। ঘটনায় নিহত শারমিনের বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন।








