Logo

প্রথম দেখাতেই চিরবিদায়: জন্মের ১০ মাস পর দেশে ফিরল বাবার লাশ

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
রাজবাড়ী
৯ মে, ২০২৬, ২১:০৫
প্রথম দেখাতেই চিরবিদায়: জন্মের ১০ মাস পর দেশে ফিরল বাবার লাশ
ছবি: সংগৃহীত

সন্তানের মুখে ‘বাবা’ ডাক শোনার স্বপ্ন নিয়েই সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজবাড়ীর মুরাদ শেখ। সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রবাসজীবনের কষ্ট বেছে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। জন্মের ১০ মাস পর ছেলে প্রথমবার বাবাকে দেখল ঠিকই, তবে জীবন্ত নয়—কফিনবন্দি মরদেহ হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (৯ মে) দুপুরে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর এলাকায় স্বামীকে হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়ে এসব কথা বলেন মুরাদের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা খাতুন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সংসারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সৌদি আরবে যান মুরাদ। সেখানে থেকেই সন্তানের জন্মের খবর শুনে অনেক আনন্দিত হয়েছিলেন তিনি। দ্রুত দেশে ফেরার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরলেন লাশ হয়ে।

বিজ্ঞাপন

পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের জুবাইল এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন মুরাদ শেখ (৩৬)। দীর্ঘ ১৬ দিন পর শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তার মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরে সকাল ৯টার দিকে গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হলে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

মুরাদ শেখ গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দরাপের ডাঙ্গী গ্রামের আব্দুল খালেক শেখের ছেলে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর খবরে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা।

স্বামীকে হারিয়ে শোকাহত স্ত্রী আঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, মুরাদ প্রায়ই ফোনে বলতেন, দ্রুত বাড়ি ফিরবেন এবং ছেলেকে কোলে নেবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। এখন সন্তানদের নিয়ে কীভাবে জীবন চলবে, তা ভেবেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুরাদের পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ১০ মাস বয়সী এক ছেলে সন্তান। ছেলেটি যখন মায়ের গর্ভে, তখনই জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমান মুরাদ। জন্মের পর থেকে সন্তানকে কখনও সরাসরি দেখতে পারেননি তিনি।

মুরাদের বড় মেয়ে মাইশা খাতুন জানায়, দুর্ঘটনার মাত্র দুই ঘণ্টা আগেও বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। তবে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কথাবার্তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। তখন মুরাদ পরে আবার ফোন করবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি।

বিজ্ঞাপন

শনিবার বেলা ১১টায় উজানচর দুদুখান পাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি আরবে অবস্থানরত গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার তোরাপ শেখের পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসাইন স্থানীয় মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রবাসী বাংলাদেশি আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। এজন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে পরিবার।

মুরাদের বড় ভাই গোলাম মোস্তফা বলেন, পরিবারের পুরো দায়িত্ব ছিল মুরাদের ওপর। তার মৃত্যুতে স্ত্রী ও সন্তানরা অসহায় হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে কীভাবে তাদের সংসার চলবে, তা নিয়ে পরিবার চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছে। তিনি সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষদের সহযোগিতার আহ্বান জানান।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD