পল্লী বিদ্যুতের অবহেলার বলি মেহনতি কৃষক

বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় ছিঁড়ে পড়ে থাকা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। পরে নিখোঁজ বাবার খোঁজে গিয়ে একই স্থানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন তার ছেলে। এদিকে মাঠে স্বামী ও ছেলেকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কৃষকের স্ত্রী। হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (১৯ জুন) উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের টুনিপাড়া মৌজার একটি কৃষিজমিতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত কোরবান আলী (৪৫) স্থানীয় কেল্লা আকন্দপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। আহত ছেলে মো. রবিনের (১৮) চিকিৎসা চলছে হাসপাতালে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ভোরে নিজের জমিতে কৃষিকাজ করতে বাড়ি থেকে বের হন কোরবান আলী। মাঠের ওপর দিয়ে সেচ পাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য টানা ১১ হাজার ভোল্ট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বৈদ্যুতিক লাইন ঝুলে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত ওই তারের সংস্পর্শে এসে তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
বিজ্ঞাপন
দিনভর বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার দিকে বাবার খোঁজে টুনিপাড়া এলাকার জমিতে যান ছেলে রবিন। তখন চারপাশে অন্ধকার নেমে আসায় তিনি বুঝতে পারেননি কী ঘটেছে। মাঠে পড়ে থাকা বাবার দেহ স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুতের শক খেয়ে তিনি ছিটকে পড়েন এবং গুরুতর আহত হন।
এর কিছুক্ষণ পর কোরবান আলীর স্ত্রী রুবি খাতুন (৩৫) প্রতিবেশী এক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে স্বামী ও ছেলের খোঁজে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে স্বামীকে মৃত এবং ছেলেকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি চরম মানসিক আঘাত পান। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দৃশ্যটি দেখে তিনি চিৎকার করে অচেতন হয়ে পড়েন।
পরে স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। আহত রবিন ও রুবি খাতুনকে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা শুরু করেন। পরে রুবি খাতুনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শজিমেক) স্থানান্তর করা হয়।
বিজ্ঞাপন
ঘটনার পর স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, কয়েক দিন আগে ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুতের লাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মাটির কাছাকাছি ঝুলে পড়ে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নজরে আনা হলেও যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদি দ্রুত লাইনটি মেরামত করা হতো, তাহলে হয়তো এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।
অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দাবি, ছিঁড়ে পড়া তারের বিষয়ে তাদের কাছে আগে কোনো অভিযোগ বা তথ্য পৌঁছায়নি। খবর পাওয়ার পরপরই তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতের ব্যবস্থা নেয়।
বিজ্ঞাপন
এবিষয়ে শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল কার্যালয়ের পরিদর্শক সবুজ কুমার হালদার বলেন, তার ছিঁড়ে পড়ে থাকার বিষয়টি স্থানীয় কেউ আমাদের জানায়নি। সংবাদ পাওয়া মাত্রই আমরা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তারটি মেরামত করেছি।
শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জয়নুল আবেদীন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতেই অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, কৃষিজমির ওপর দিয়ে যাওয়া উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইনের নিয়মিত তদারকি ও দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন তারা।








