Logo

হিমঘরেই অপেক্ষা, পাঁচ বছরেও দাফন হয়নি মরদেহ

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
রংপুর
৩০ জুলাই, ২০২৬, ১৯:০৯
হিমঘরেই অপেক্ষা, পাঁচ বছরেও দাফন হয়নি মরদেহ
ছবি: সংগৃহীত

পরিচয় রয়েছে, পরিবারের সন্ধানও মিলেছে, এমনকি বৈধ পাসপোর্টও উদ্ধার হয়েছে। তবুও প্রায় পাঁচ বছর ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে এক ভারতীয় নাগরিকের মরদেহ। আইনি জটিলতা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিবারের অনাগ্রহের কারণে এখনো শেষকৃত্য সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

মরদেহটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের এম আলমবাজার এলাকার বাসিন্দা প্রবীর মণ্ডলের। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৪১ বছর। তার বাবার নাম মহাদেব মণ্ডল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর থেকে প্রবীর মণ্ডলের মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং পরিবারের সম্মতি ছাড়া মরদেহ হস্তান্তর বা সৎকার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্রবীর মণ্ডলের পরিবার মরদেহ গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।

বিজ্ঞাপন

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালের নভেম্বরে ফেসবুকে পরিচিত এক নারীর সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রামে যান প্রবীর মণ্ডল। সেখানে আজিজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে অবস্থানকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাকে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়।

তার পোশাক থেকে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় পাসপোর্টে দেখা যায়, তিনি ২০১৭ সালের মার্চ মাসে তিন মাসের ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন এবং ২০১৮ সালের মার্চে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফিরে যান। তবে পরবর্তীতে তিনি কীভাবে আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, সে বিষয়ে তদন্ত নথিতে কোনো তথ্য উল্লেখ নেই।

মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর একটি মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড গঠন করা হয় এবং সেই সময় থেকেই মরদেহটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

লালমনিরহাট জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, তখনই মরদেহে পচন শুরু হয়েছিল। একই সঙ্গে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মরদেহ ভারতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশও করা হয়। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছরেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রমজান আলী বলেন, মৃত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে তার ছোট ভাই সুবীর মণ্ডলের সঙ্গে কথা হলেও পরিবার এখনো মরদেহ গ্রহণে আগ্রহ দেখায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

রমেক হাসপাতালের হিমঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল বসুনিয়া জানান, মরদেহটি এখনো যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেলেই ধর্মীয় বিধান অনুসারে মরদেহ হস্তান্তর বা সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতালের উপ-পরিচালক আব্দুল মোকাদ্দেম বলেন, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। পুলিশের অনুরোধেই মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এত দীর্ঘ সময় একটি মরদেহ হিমঘরে পড়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, একজন মৃত ব্যক্তির মরদেহ দীর্ঘদিন সৎকার ছাড়া পড়ে থাকা মানবিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা এবং দেশের সাংবিধানিক চেতনা অনুযায়ী মরদেহের সম্মানজনক সৎকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যুর সময় দেশে এবং সীমান্ত এলাকায় করোনাভাইরাস মহামারির কারণে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। সে কারণেও মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়ে থাকতে পারে। বর্তমানে পরিবারের অনাগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিবারের অনাপত্তি পাওয়া গেলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে মরদেহের সৎকারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে তিনি জানান।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD