সৌদিতে আগুনে নিহত দুই ভাই, মোহনের বিয়ের স্বপ্ন শেষ

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই ভাইসহ নওগাঁর আত্রাই উপজেলার একাধিক প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গন্ডগোহালী গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে নিহতদের বাড়ির পরিবেশ।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল থেকেই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামে নিহত মোহন ও সুমনের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। স্বজনদের অপেক্ষা এখন শুধু প্রিয়জনদের মরদেহ দেশে ফেরার।
রবিবার (৯ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে কারখানাটিতে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নওগাঁর আত্রাই উপজেলার একই গ্রামের দুই ভাই মোহন ও সুমনসহ আরও কয়েকজন নিহত হন।
‘বাড়ির কাজ শেষ করে দেশে ফিরবে’
বিজ্ঞাপন
নিহত দুই ভাইয়ের মা ময়না খাতুন সন্তান হারানোর শোকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে থাকা দুই ছেলের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ময়না খাতুন জানান, তার বড় ছেলে প্রায় সাত বছর ধরে বিদেশে ছিলেন। আর মেজো ছেলে মোহন সৌদি আরবে ছিলেন প্রায় দুই বছর। দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকলেও তারা কেউই ছুটিতে বাড়ি ফিরতে পারেননি।
মায়ের কাছে মোহন জানিয়েছিলেন, বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি পরিবারের ঋণ পরিশোধ করছেন। পাশাপাশি বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। দেশে ফিরে সেই বাড়ির কাজ শেষ করার পরিকল্পনা ছিল তার।
ছেলের সেই স্বপ্নের কথা মনে করে ময়না খাতুন কান্নায় বলেন, সন্তানটি কষ্ট করে ঋণ পরিশোধ করছিল এবং বাড়ির কাজ শুরু করেছিল। দেশে ফিরে বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ করবে বলেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
বিজ্ঞাপন
আগুন লাগার পর মায়ের কাছে শেষ ভয়েস মেসেজ
ময়না খাতুন জানান, অগ্নিকাণ্ডের দিন সকালেও মোহনের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তখন ছেলে তাকে নিজের ভালো থাকার কথা জানিয়েছিল এবং মাকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে সুস্থ থাকার কথা বলেছিল।
কিন্তু কিছু সময় পরই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে মোহন মাকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। সেই বার্তাই মায়ের কাছে ছেলের শেষ কথা হয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর মোহন আতঙ্কিত অবস্থায় তাকে জানান যে তিনি আগুনে পুড়ে যাচ্ছেন এবং হয়তো আর কথা বলতে পারবেন না। এরপরই তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সন্তানের শেষ কণ্ঠস্বরের কথা মনে করে ময়না খাতুনের আহাজারি থামছে না। ছেলেদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে নিজের বুকে জড়িয়ে শেষবারের মতো দেখতে চান তিনি।
বাড়ি ফিরে বিয়ে করার স্বপ্ন ছিল মোহনের
বিজ্ঞাপন
মোহনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ছিল পরিবারকে ঘিরে। দেশে ফিরে বিয়ে করার ইচ্ছার কথা মাকে জানিয়েছিলেন তিনি।
ময়না খাতুন জানান, মোহন তাকে বলেছিলেন দেশে ফিরে বিয়ে করবেন। মায়ের কাছেও পাত্রী দেখার কথা বলেছিলেন তিনি। বিদেশের কর্মজীবন শেষ করে দেশে ফিরে সংসার শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলেন এই প্রবাসী।
কিন্তু সৌদি আরবের কারখানায় ভয়াবহ আগুনে মুহূর্তেই থেমে গেল তার সেই পরিকল্পনা। যে সন্তানকে ঘিরে মা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এখন সেই সন্তানকেই হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে আছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
আত্রাইয়ে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবের ওই অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তিনি জানান, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
আত্রাইয়ের যেসব বাসিন্দা নিহত হয়েছেন
সৌদি আরবের রিয়াদের সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে আত্রাই উপজেলার যেসব বাসিন্দার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের মৃত বাদলের ছেলে সুমন (৩৫) এবং একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (২৭)।
এ ছাড়া কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের গাফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক, একই গ্রামের জান্নারের ছেলে রুবেল হোসেন (৩০) এবং ফজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলি প্রামাণিক (৩৫) রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
নিহতদের তালিকায় আরও রয়েছেন পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল জলিল (৩৮), বিশা গ্রামের আজহারের ছেলে সাগর (৩১), একই গ্রামের মজনুর ছেলে মজিদুল (৩৪) এবং উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ (৩২)।
ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে এতজন প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। স্বজনদের অপেক্ষা এখন প্রিয়জনদের মরদেহ দেশে ফেরার। আর নিহত মোহনের পরিবারের কাছে তার বাড়ি ফেরা ও বিয়ের স্বপ্ন এখন শুধুই বেদনার স্মৃতি।








