Logo

জামালপুরে কমছে দেশি মাছ, বিপাকে হাজারো জেলে

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
জামালপুর
২০ আগস্ট, ২০২৬, ১৮:২৪
জামালপুরে কমছে দেশি মাছ, বিপাকে হাজারো জেলে
ছবি: সংগৃহীত

একসময় জামালপুরের যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই, দশআনী ও সুবর্ণখালী নদী ছিল দেশীয় মাছের সমৃদ্ধ উৎস। নদীতে জাল ফেললেই মিলত ট্যাংরা, পুঁটি, আইড়, বোয়ালি, রুই-কাতলাসহ নানা প্রজাতির মাছ। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অবৈধ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার, নদীর নাব্য সংকট, পানি দূষণ এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়ায় কমছে দেশি মাছের প্রাপ্যতা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলার ২১ হাজার ৩১৮ নিবন্ধিত জেলের জীবিকায়।

বিজ্ঞাপন

জেলেদের ভাষ্য, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে জাল ফেলেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। অনেক দিন সামান্য মাছ বিক্রি করে যে অর্থ আসে, তা দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নদীনির্ভর অনেক পরিবার বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছে।

জাল ফেলেও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে

ইসলামপুরের কুলকান্দি এলাকার জেলে সুভল দাস প্রতিদিন ভোরে যমুনার পাড়ে যান। নৌকায় উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টানার পরও অনেক সময় তার জালে ওঠে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকার মাছ।

বিজ্ঞাপন

জাল ও নৌকা কিনতে ৫০-৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করা সুভলের এখন সেই অর্থ ফেরত পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিন মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা এই জেলে বলেন, ‘একটা খেও দিতে এক দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। মাছ ওঠে এক-দেড়শ টাকার। ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ করে জাল-নৌকা কিনেছি। এগুলো দিয়ে খাব নাকি বিক্রি করব?’

তার ভাষায়, নদীতে পানি থাকলেও আগের মতো মাছ নেই। ফলে মাছ ধরাকে পেশা হিসেবে ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

৩৫ বছর ধরে মাছ ধরা জেলে জগন্নাথ নমশুদ্রও জানিয়েছেন একই অভিজ্ঞতার কথা। তার স্মৃতিতে একসময় যমুনায় জাল ফেললেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন দীর্ঘ সময় জাল ফেলে অপেক্ষা করেও তেমন মাছ পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

ক্ষতিকর জালে ধ্বংস হচ্ছে পোনা

জেলেদের মতে, মাছের সংকটের অন্যতম বড় কারণ কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি ও অতিরিক্ত সূক্ষ্ম ফাঁসের জালের ব্যবহার। এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ছোট মাছ ও পোনা আটকা পড়ে। প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ধরা এবং প্রজনন এলাকায় জাল ফেলায় মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জেলে নিরঞ্জন চন্দ্র দাসের অভিযোগ, বড় বেড়জাল ও চায়না জাল দিয়ে মাছ ধরার সময় বিপুল পরিমাণ পোনা নষ্ট হয়। তার মতে, কয়েকটি মাছ ধরতে গিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি মাছ ও পোনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ফলে এক মৌসুমে যে পরিমাণ পোনা ও ডিম নষ্ট হচ্ছে, পরবর্তী সময়ে তার প্রভাব পড়ছে নদীর মাছের প্রাপ্যতায়।

সংকুচিত হচ্ছে মাছের আবাসস্থল

অবৈধ জালের পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনও দেশি মাছের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। নাব্য কমে বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠছে। শুষ্ক মৌসুমে অনেক খাল-বিল ও ছোট নদীর পানি কমে যাচ্ছে কিংবা শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে মাছের বিচরণ ও প্রজননের নিরাপদ স্থান কমছে।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় মাছের চলাচল ও প্রজননেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে পানি দূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে জলজ জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকি।

অনিশ্চয়তায় ২১ হাজারের বেশি জেলের জীবন

জামালপুরে নিবন্ধিত ২১ হাজার ৩১৮ জেলের বড় একটি অংশ নদী ও জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল। মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমছে। অন্যদিকে জাল, নৌকা ও মাছ ধরার সরঞ্জামের ব্যয় বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

ফলে অনেকে কৃষিকাজ, দিনমজুরি কিংবা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। জেলেদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে নতুন প্রজন্ম নদীকেন্দ্রিক এই পেশা থেকে সরে যাবে।

প্রায় ৫০ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে

জামালপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আ ন ম আশরাফুল কবীর জানান, জেলায় প্রায় ২৫০ প্রজাতির দেশীয় মাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণের জন্য জেলার সাত উপজেলায় সাতটি অভয়াশ্রম রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদে আরও দুটি স্থায়ী অভয়াশ্রম তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলায় অভয়াশ্রমের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তারের মতে, জলাশয়ের গভীরতা কমে যাওয়া, পানি শুকিয়ে যাওয়া এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

বিজ্ঞাপন

দেশি মাছের সংকট মোকাবিলায় শুধু অবৈধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, অভয়াশ্রমে নজরদারি বাড়ানো এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা কার্যকরভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে হবে।

নদী ও জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষা করা গেলে একদিকে যেমন দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব, অন্যদিকে নদীকে ঘিরে টিকে থাকা হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকাও সুরক্ষিত করা যাবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD