Logo

পেটের দায়ে ঢাকার পথে কেয়া-আয়শা, থেমে গেল স্কুলজীবন

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
নগরকান্দা, ফরিদপুর
২২ আগস্ট, ২০২৬, ২০:০৯
পেটের দায়ে ঢাকার পথে কেয়া-আয়শা, থেমে গেল স্কুলজীবন
ছবি: সংগৃহীত

অভাবের কাছে হার মেনে শৈশব, বিদ্যালয় ও স্বপ্নকে পেছনে ফেলে মায়ের হাত ধরে ঢাকার পথে পাড়ি জমিয়েছে ফরিদপুরের বড় কাজুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী—পঞ্চম শ্রেণির কেয়া ও তৃতীয় শ্রেণির তার ছোট বোন আয়শা। কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় ছাড়াই দুই শিশুর বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনায় মন খারাপ শিক্ষক ও সহপাঠীদের।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজান মুকুল জানান, কেয়া ও আয়শা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেত। পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহও ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভাব-অনটন তাদের স্বাভাবিক জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। অনেক দিন না খেয়েও তারা বিদ্যালয়ে এসেছে। পারিবারিক নানা সংকটের মধ্যেও দুই বোন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

তবে পরিবারের আয়-রোজগারের নিশ্চয়তা না থাকা, দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও সংসারের নানা সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাদের মা। সেখানে গিয়ে কোনোভাবে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের অন্তত খাবারের নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করবেন—এমন প্রত্যাশা থেকেই তার এই সিদ্ধান্ত।

কেয়া ও আয়শার বিদ্যালয় ছাড়ার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন তাদের শিক্ষকরা। শিক্ষকদের চোখের সামনে দারিদ্র্যের চাপে দুটি সম্ভাবনাময় শৈশব শিক্ষার পথ থেকে ছিটকে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রধান শিক্ষক মো. মিজান মুকুলের সঙ্গে কেয়ার ছিল বিশেষ এক স্মৃতি। বিদ্যালয়ের বালিকা ফুটবল দল উপজেলা পর্যায়ের সেমিফাইনালে অংশ নিয়েছিল। সে সময় দলের শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে কক্সবাজার থেকে কানের দুল ও ব্রেসলেট কিনে এনে তাদের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন প্রধান শিক্ষক।

সেই উপহারের একটি কানের দুল একদিন হারিয়ে ফেলেছিল কেয়া। মাত্র ১০ টাকা দামের সেই দুল হারানোর ঘটনায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিল শিশুটি। দুলটির আর্থিক মূল্য তার কাছে বড় ছিল না; বরং প্রিয় শিক্ষকের দেওয়া উপহার ও ভালোবাসার স্মৃতি হিসেবেই সেটি ছিল তার কাছে অমূল্য।

আজ সেই কেয়াই বিদ্যালয়ে নেই। নেই তার ছোট বোন আয়শাও। যে শ্রেণিকক্ষে তাদের কোলাহল ও উপস্থিতি ছিল, সেখানে এখন তাদের জায়গা খালি। বিদ্যালয়ের মাঠেও নেই তাদের ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, বিদ্যালয় ছাড়ার আগে শিক্ষক-সহপাঠীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেওয়ার সুযোগও হয়নি কেয়া ও আয়শার। এমনকি বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্রও নেয়নি তারা।

অভাবের তাড়নায় অনেকটা নীরবেই মায়ের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে দুই শিশু। তাদের হঠাৎ চলে যাওয়ায় শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের শূন্যতা।

প্রধান শিক্ষক মো. মিজান মুকুল বলেন, “কেয়া ও আয়শা খুবই ভালো ছাত্রী ছিল। তাদের পারিবারিক পরিস্থিতি আমাদেরও কষ্ট দিয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাক। কিন্তু তাদের পরিবারের যে সংকট, সেখানে দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে ধরে রাখতে শুধু বিদ্যালয়ে আসার জন্য উৎসাহ দেওয়া যথেষ্ট নয়। যখন একটি পরিবার প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খায়, তখন শিশুর পড়াশোনার চেয়ে পরিবারের বেঁচে থাকার বিষয়টি তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শিক্ষকদের আক্ষেপ, বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিশুদের পড়াশোনায় ধরে রাখার জন্য সহায়তা করার সুযোগ ও সামর্থ্য সীমিত। ফলে পরিবারের চরম অর্থনৈতিক সংকটের সময় অনেক শিশুই ধীরে ধীরে বিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যায়।

স্থানীয়দের মতে, কেয়া ও আয়শার মতো আরও অনেক শিশু দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সেই শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে কেয়া ও আয়শাকে আবারও বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, ঢাকার অচেনা নগরজীবনের কঠিন বাস্তবতায় দুই শিশুর শিক্ষাজীবন যেন পুরোপুরি থেমে না যায়।

কেয়া ও আয়শার ঘটনা শুধু দুটি শিশুর বিদ্যালয় ছাড়ার গল্প নয়। এটি দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা অসংখ্য শিশুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

দু’মুঠো খাবারের নিশ্চয়তার জন্য কোনো শিশুকে যেন তার শৈশব, শিক্ষা ও স্বপ্ন বিসর্জন দিতে না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কেয়ার কাছে হয়তো ১০ টাকার সেই কানের দুলের আর্থিক মূল্য সামান্য। কিন্তু প্রিয় শিক্ষকের দেওয়া সেই উপহার তার কাছে ছিল ভালোবাসার প্রতীক। বড় কাজুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-সহপাঠীদের প্রত্যাশা, সেই ভালোবাসার স্মৃতি একদিন কেয়া ও আয়শাকে আবারও তাদের প্রিয় বিদ্যালয়ের পথে ফিরিয়ে আনবে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD