Logo

সাড়ে ৬৩ কোটি টাকায় সৈকতের বালিয়াড়িতে পৌরসভার সড়ক

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার
২২ আগস্ট, ২০২৬, ১৭:৫২
সাড়ে ৬৩ কোটি টাকায় সৈকতের বালিয়াড়িতে পৌরসভার সড়ক
ছবি: প্রতিনিধি

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত মাত্র ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার এলাকায় সাড়ে ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৮ মিটার প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সড়ক নির্মাণের জন্য সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ সাগরলতা ধ্বংস করা হচ্ছে। অথচ পুরো এলাকাটিই প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত।

বিজ্ঞাপন

‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’-এর আওতায় কক্সবাজার পৌরসভা সড়কটি নির্মাণ করছে। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৭ জুন সড়ক নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে।

সম্প্রতি সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, সমুদ্রসৈকতের বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়কের অবকাঠামো তৈরির প্রস্তুতি চলছে। এতে বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তনের পাশাপাশি সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ সাগরলতাও নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিষিদ্ধ।

এ ছাড়া বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। এমন একটি সংরক্ষিত ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়ক নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে তাই প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবাদীরা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

পরিবেশবিদদের মতে, বালিয়াড়ি কেবল বালুর স্তূপ নয়। এটি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সমুদ্রের ঢেউ, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব কমাতে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। বালিয়াড়ি ধ্বংস হলে দীর্ঘমেয়াদে সৈকতের ভাঙন ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কয়েক বছর আগেই সৈকতের নির্দিষ্ট অংশে কৃত্রিমভাবে বালিয়াড়ি গড়ে তোলা হয়েছিল।

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সৈকতের নির্দিষ্ট অংশে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বালুর স্তূপ তৈরি করে। সেখানে সাগরলতা রোপণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল উপকূলীয় ভাঙন কমানো এবং সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

বিজ্ঞাপন

তবে এখন সেই বালিয়াড়ির পাশেই সড়ক নির্মাণের জন্য বালু কাটা ও ভরাটের কাজ চলছে। ফলে পরিবেশ রক্ষায় যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়া বলেন, কক্সবাজার পৌরসভার অর্থায়নে সড়কটির নির্মাণকাজ চলছে। তবে নির্মাণ শুরুর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত বলতে পারবে।

কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া বলেন, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন, ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষা এবং পর্যটকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশগত অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য ভিন্ন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের বিষয়টি তারা জানতে পেরেছেন। বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এ এলাকায় যেকোনো ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

তবে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিকভাবে বালিয়াড়ি তৈরি ও সংরক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে কক্সবাজারে ভাঙন রোধ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যে বালিয়াড়ি এবং সাগরলতা গড়ে তোলা হয়েছিল, সেটিই এখন সড়ক নির্মাণের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

অ্যাডভোকেট মুজিবুল হকের দাবি, সৈকতের বালিয়াড়ি রক্ষায় বিকল্প ব্যবস্থা বা স্থান বিবেচনা না করে এর ওপর দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি অর্থায়নে গড়ে তোলা পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থার পাশেই তা ধ্বংস করা দাতা দেশগুলোর কাছেও নেতিবাচক বার্তা দেবে।

তিনি বলেন, বালিয়াড়ি ধ্বংস করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবেশগতভাবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। নির্মাণকাজ দ্রুত বন্ধ করে প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব নতুন করে পর্যালোচনা করার দাবি জানান তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সড়কটি নির্মাণ হলে পর্যটকদের চলাচল ও সৈকত এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বালিয়াড়ি ধ্বংসের কারণে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের বক্তব্য অনুযায়ী, উপকূলীয় বালিয়াড়ি প্রাকৃতিকভাবে সমুদ্রের ঢেউ ও ঝড়ের শক্তি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এ ধরনের এলাকায় যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

একদিকে পর্যটনকেন্দ্রিক উন্নয়ন, অন্যদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—দুই বিষয় সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকা অবস্থায় নির্মাণকাজ চলতে থাকলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ অবস্থায় সাড়ে ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সড়কটির পরিবেশগত প্রভাব, প্রকল্পের নকশা এবং বালিয়াড়ি সংরক্ষণের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD