Logo

প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জাতীয় মঞ্চে নন্দীগ্রামের সুমি

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
নন্দীগ্রাম, বগুড়া
২৩ আগস্ট, ২০২৬, ১৪:০৩
প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জাতীয় মঞ্চে নন্দীগ্রামের সুমি
ছবি: সংগৃহীত

চার বোনের মধ্যে সবার ছোট। বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে আসা সেই মেয়েটিই এখন জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল অঙ্গনে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। প্রতিবেশীদের নানা কটূক্তি ও সামাজিক বাধাকে উপেক্ষা করে খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া মিম আক্তার সুমি আজ নন্দীগ্রামের গর্ব।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় পর্যায়ের অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবল প্রতিযোগিতায় রাজশাহী অঞ্চলের হয়ে অংশ নিয়ে ফাইনালে উঠেছিল সুমি। চূড়ান্ত খেলায় রানারআপ হওয়ার পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ক্রেস্ট ও মেডেল গ্রহণ করে সে। সুমির এই অর্জনে আনন্দিত তার পরিবার, শিক্ষক, প্রতিবেশীসহ পুরো নন্দীগ্রামবাসী।

মিম আক্তার সুমি নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের ধুন্দার দারোগাপাড়া গ্রামের কৃষক মামুনুর রশিদ ও গৃহিণী আকলিমা বিবির মেয়ে। ২০১২ সালের ২৪ জুলাই জন্ম নেওয়া সুমি বর্তমানে ধুন্দার উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

চার বোনের মধ্যে সবার ছোট সুমির বড় তিন বোনেরই বিয়ে হয়েছে। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও মেয়ের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহকে কখনো বাধা দেননি বাবা-মা। বরং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা মেয়েকে উৎসাহ ও সাহস জুগিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি সুমির ছিল প্রবল আগ্রহ। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খেলায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ফুটবলের প্রতি ধীরে ধীরে তার বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়। তবে মেয়ের মাঠে খেলতে যাওয়া নিয়ে প্রতিবেশীদের কেউ কেউ নানা ধরনের মন্তব্য করতেন।

এসব কথায় কান না দিয়ে নিজের স্বপ্নকে সামনে রেখে অনুশীলন চালিয়ে যায় সুমি। মানুষের কটূক্তির জবাব সে দিয়েছে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে। জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার পর সেই সমালোচকদের অনেকেই এখন সুমির সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন ক্রীড়া পরিদপ্তরের আয়োজনে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে সুমির প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রথমে নন্দীগ্রাম উপজেলা দলের হয়ে উপজেলা পর্যায়ে খেলায় অংশ নেয় সে। উপজেলা পর্যায়ে দুপচাঁচিয়া উপজেলার বিপক্ষে নন্দীগ্রাম দল ১-০ গোলে পরাজিত হয়ে রানারআপ হয়। তবে ওই প্রতিযোগিতায় দলের হয়ে সুমির পারফরম্যান্স সংশ্লিষ্টদের নজর কাড়ে।

পরবর্তীতে বগুড়া জেলা দল গঠনের সময় সেখানে জায়গা করে নেয় সুমি। জেলা পর্যায়ে বগুড়া জেলার হয়ে রাজশাহী জেলার বিপক্ষে মাঠে নামে সে। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচের ফল নিষ্পত্তি না হওয়ায় টাইব্রেকারে জয় পায় বগুড়া জেলা দল।

জেলা পর্যায়ে ভালো করার পর জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ আসে সুমির সামনে। এবার রাজশাহী অঞ্চলের হয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সে।

বিজ্ঞাপন

দলীয় পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সুমিও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে থাকে। একের পর এক ম্যাচ পেরিয়ে রাজশাহী অঞ্চল ফাইনালে জায়গা করে নেয়। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত খেলায় তাদের প্রতিপক্ষ ছিল রংপুর অঞ্চল।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফাইনালে শেষ পর্যন্ত রংপুর অঞ্চল জয়ী হয়। ফলে রাজশাহী অঞ্চল রানারআপ হয়। রানারআপ দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে সুমিও পায় সম্মাননা।

পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ক্রেস্ট ও মেডেল গ্রহণ করে মিম আক্তার সুমি। প্রত্যন্ত গ্রামের একটি কিশোরীর জন্য এটি হয়ে ওঠে জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত।

বিজ্ঞাপন

নিজের সাফল্য সম্পর্কে সুমি বলে, আমার বাবা কৃষক। বাবা-মায়ের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আমি খেলাধুলা করি। নতুন কুঁড়িতে অংশ নেওয়ার আগে স্কুলের বিভিন্ন খেলায় অংশ নিয়েছি। তখন প্রতিবেশীদের কেউ কেউ আমাকে অন্য চোখে দেখতেন। কিন্তু কারও কথায় তোয়াক্কা না করে খেলা চালিয়ে গেছি। এখন তারাই আমাকে বাহবা দিচ্ছেন।

সুমি আরও বলে, আমি জীবনে বড় খেলোয়াড় হতে চাই। কখনো ভাবিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারব। এই মুহূর্তটি আমার জন্য অনেক গর্বের। আমার এই সাফল্যের কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি আমার বাবা ও মায়ের।

সুমির বাবা কৃষক মামুনুর রশিদ বলেন, আমি কৃষিকাজ করি। আমাদের সামর্থ্য খুব বেশি নয়। ছোটবেলা থেকেই সুমির খেলাধুলার প্রতি অনেক আগ্রহ। মেয়ের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ দেখে তাকে কখনো বাধা দিইনি। আজ সে জাতীয় পর্যায়ে খেলেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছে—এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তিনি মেয়ের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য সবার দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন।

সুমির এক প্রতিবেশী বলেন, আগে অনেকেই মেয়েটিকে খেলাধুলা করতে দেখে নানা কথা বলতেন। কিন্তু সুমি কারও কথায় কান দেয়নি। নিজের মতো করে খেলা চালিয়ে গেছে। এখন জাতীয় পর্যায়ে খেলে সে আমাদের এলাকার সম্মান বাড়িয়েছে। আমরা সবাই তার জন্য গর্বিত।

ধুন্দার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, সুমি বিদ্যালয়ের মেধাবী ও ক্রীড়াপ্রেমী শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও তার আগ্রহ রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে তার অংশগ্রহণ বিদ্যালয়ের জন্য গর্বের বিষয়। ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে এবং দেশের নারী ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে—এমন প্রত্যাশা তাঁর।

বিজ্ঞাপন

নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আরা বলেন, উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার কৃষক পরিবারের একটি মেয়ে জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলে সাফল্য অর্জন করেছে—এটি অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। সুমির এই অর্জন উপজেলার অন্য কিশোরীদের খেলাধুলায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে। তার প্রতিভা বিকাশে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও উৎসাহ অব্যাহত রাখা হবে।

বগুড়া জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মোশারফ হোসেন এমপি বলেন, তাঁর উপজেলার মেয়ে মিম আক্তার সুমি জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা নন্দীগ্রামবাসীর জন্য গর্বের। সুমির এই অর্জন নন্দীগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত। তিনি সুমির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন।

প্রত্যন্ত গ্রামের মাটিতে বেড়ে ওঠা সুমি যেন নতুন প্রজন্মের কিশোরীদের জন্য একটি বার্তা হয়ে উঠেছে—স্বপ্ন বড় হলে সীমিত সামর্থ্য কিংবা মানুষের কটূক্তি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য মনোবল থাকলে প্রত্যন্ত গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় মঞ্চেও জায়গা করে নেওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

আজ মিম আক্তার সুমি শুধু তাঁর পরিবারের নয়, পুরো নন্দীগ্রাম উপজেলার গর্ব। তাঁর এই পথচলা ভবিষ্যতে আরও অনেক কিশোরীকে ফুটবল মাঠে আসতে অনুপ্রাণিত করবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD