Logo

তীব্র নদীভাঙনে আতঙ্কে হাতিয়ার সাড়ে সাত লাখ মানুষ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
হাতিয়া, নোয়াখালী
২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫৫
তীব্র নদীভাঙনে আতঙ্কে হাতিয়ার সাড়ে সাত লাখ মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় মেঘনা নদীর তীব্র ভাঙনে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ। চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করায় উপজেলার হরনী, চানন্দী, চর ঈশ্বর, নলচিরা ও সুখচর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে শত শত একর ফসলি জমি, বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, রাস্তাঘাট ও হাটবাজার নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নদীর ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়ে জনবসতিপূর্ণ এলাকার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও মেঘনায় বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হবেন, অন্যদিকে দ্বীপটির অর্থনীতি, যোগাযোগ ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে মেঘনার প্রবল ভাঙনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, স্লুইস গেট, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেক স্থানে নদী এতটাই কাছে চলে এসেছে যে, নতুন করে নির্মিত স্থাপনাও নিরাপদ থাকছে না।

জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল হাতিয়া দ্বীপের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌযান। দ্বীপটির এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনেও নদীপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে নদীভাঙনের কারণে শুধু বসতবাড়ি ও কৃষিজমি নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থাও দিন দিন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে ইতোমধ্যে শত শত পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। বাস্তুভিটা হারানো অনেক পরিবার নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চল, খাসজমি ও বেড়িবাঁধের আশপাশে অস্থায়ীভাবে বসতি গড়েছে। এসব এলাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা না থাকায় তাদের জীবনযাপন অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, বারবার নদীভাঙনের কারণে তাঁরা সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা। একবার ঘরবাড়ি নির্মাণ করার পর আবারও ভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে। ফলে সঞ্চয় ও সম্পদ হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে অবশিষ্ট বসতভিটা ও কৃষিজমিও নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

নদীভাঙনের প্রভাব পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থাতেও। বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকেরা।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন জরিপ ও স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, নদীভাঙনের কারণে হাতিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারানোর পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির, মক্তব, মাদ্রাসা, হাটবাজার, স্কুল-কলেজসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতিয়ায় নদীভাঙনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৬৫ সাল থেকে দ্বীপটিতে ভাঙন শুরু হয় এবং ১৯৭০ সালের পর তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় নদীর গতিপথ পরিবর্তন, জোয়ারের তীব্রতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

হাতিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্র আফাজিয়া বাজারও বর্তমানে নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, নদী বাজারের উত্তর প্রান্তের কাছাকাছি চলে এসেছে। সামান্য জোয়ারেই বাজারের বিভিন্ন সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। এতে মানুষের চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। ভাঙনের আশঙ্কায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নতুন অবস্থাতেই সরিয়ে নেওয়া বা ভেঙে ফেলতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নদীভাঙনের কারণে হাতিয়ার মানুষের জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ আবাসন হারাচ্ছেন বহু মানুষ। একটি সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, নদীভাঙনের কারণে প্রতি বছর হাতিয়ার মানচিত্র থেকে সহস্রাধিক বসতবাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে। এসব বাড়ির বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে নতুন চর, খাসজমি কিংবা বেড়িবাঁধের পাশে আশ্রয় নিচ্ছেন।

বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের অনেকের কাছেই নেই স্থায়ী বসতঘর কিংবা মৌলিক নাগরিক সুবিধা। নতুন বসতি এলাকায় পর্যাপ্ত স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় দুর্যোগের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ যুক্ত হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

হাতিয়ার মানুষের বড় একটি অংশ কৃষিনির্ভর। স্থানীয়ভাবে প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল বলে জানা গেছে। কিন্তু নদীভাঙনে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন কমছে, আয় কমছে এবং অনেক পরিবার জীবিকার নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এতে দ্বীপটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও চাপের মুখে পড়ছে।

ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ভাঙনের গতি কমালেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারছে না। নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং তীব্র জোয়ারের কারণে অনেক এলাকায় ভাঙন আবারও শুরু হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতিয়ার মতো দ্বীপাঞ্চলকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। নদীর গতিপথ, স্রোতের তীব্রতা ও জোয়ারের চাপ বিবেচনায় নিয়ে টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্থানে ব্লক স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

গত ১৭ মে পানি সম্পদমন্ত্রী শহিদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি নোয়াখালীর মেঘনা নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি হাতিয়ায় মেঘনার তীব্র ভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। মন্ত্রীর এই আশ্বাসের পর স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভাঙনকবলিতরা।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, মেঘনা নদীর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙনকবলিত এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আশ্বাস ও সাময়িক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নয়, হাতিয়াকে রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে নদীভাঙনের কারণে একদিকে যেমন হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে বদলে যেতে পারে পুরো দ্বীপের ভৌগোলিক চিত্র। তাই মানুষের জীবন, জীবিকা, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় মেঘনার ভাঙন প্রতিরোধ এখন হাতিয়াবাসীর অন্যতম প্রধান দাবি।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD