বোটডুবিতে নিউজিল্যান্ডের কিশোরের মৃত্যু, পরিবারের ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ

কক্সবাজারের সাগরে হাউসবোট ডুবে নিউজিল্যান্ডের ১৬ বছর বয়সী কিশোর আলবার্টের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার পর পরিবারের তিন সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে আলবার্টের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে জানা গেছে, পরিবারটির কারও বৈধ ভিসার মেয়াদ নেই এবং তারা প্রায় আড়াই বছর ধরে কক্সবাজারের উপকূলঘেঁষা এলাকায় নিজেদের তৈরি হাউসবোটে অবস্থান করছিলেন।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুব বাজারসংলগ্ন সাগরে আলবার্টের মরদেহ ভেসে ওঠে। স্থানীয়রা দেখতে পেয়ে পুলিশ ও লাইফগার্ড কর্মীদের খবর দিলে তারা মরদেহটি উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী।
এর আগে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাঁকখালী নদীর মোহনা সংলগ্ন নাজিরারটেক এলাকার সাগরে ভ্রমণের সময় নিউজিল্যান্ডের পরিবারটির হাউসবোটটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। প্রচণ্ড ঢেউ ও স্রোতের মধ্যে বোটটি ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়।
এ সময় স্থানীয় জেলেরা আলবার্টের বাবা জন এডওয়ার্ড (৭৪), মা বেলা (৩৬) ও ভাই রালফ (১৩)-কে জীবিত উদ্ধার করেন। পরে তাদের কোস্টগার্ড কক্সবাজার স্টেশনে হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের চার সদস্যই নিউজিল্যান্ডের নাগরিক।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি যে হাউসবোটে অবস্থান করছিল, সেটি কক্সবাজার শহরের এসএম পাড়া উপকূলে নির্মাণ করা হয়। ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের বোটটি আধুনিক নকশায় তৈরি করা হয়েছিল। এটি নির্মাণে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা স্থানীয়দের।
কুতুবদিয়ার পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেল জানান, বোটটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল। ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার ও সমুদ্র ভ্রমণের কথা মাথায় রেখে বোটটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল।
তিনি জানান, নিউজিল্যান্ডের পরিবারের চার সদস্য দীর্ঘদিন ধরে ওই বোটেই বসবাস করছিলেন। বোটটি কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীত পাশে বাঁকখালী নদীতে নোঙর করা থাকত। মাঝেমধ্যে তারা সমুদ্রযাত্রায় বের হলেও আবার উপকূলে ফিরে আসতেন।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই বছর ধরে নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি কক্সবাজারের আশপাশের নদী ও সমুদ্রপথে অবস্থান করছিল। নিজেদের হাউসবোটকে তারা একই সঙ্গে বসবাস ও যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন।
সর্বশেষ মঙ্গলবার বোটটি নিয়ে সমুদ্রে যাওয়ার পর বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে বোটটি ভেঙে যায় এবং চার সদস্যের মধ্যে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও আলবার্ট নিখোঁজ হন। প্রায় এক দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল রাতে মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে এই নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি জলদস্যুদের হামলার শিকার হয়েছিল বলে জানিয়েছিল কোস্টগার্ড।
বিজ্ঞাপন
পরদিন ৯ এপ্রিল কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। পরে নিজেদের কাঠের বোটে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা করেন তারা।
নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড তাদের সমুদ্রযাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। গত ১ মার্চ তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
ওই সময় পাসপোর্ট যাচাই করে দেখা যায়, তাদের পাসপোর্টের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি শেষ হয়ে গেছে। এরপরও তারা সোনাদিয়া চরে বোট নিয়ে অবস্থান করছিলেন। সেখানে একদল দুষ্কৃতকারী হামলা চালালে কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করে।
বিজ্ঞাপন
এরপর পরিবারটি কোস্টগার্ডের হেফাজতে ছিল বলে জানা গেলেও তাদের পরবর্তী অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার জানান, সাগরে বোটডুবির পর বিষয়টি ঢাকায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ড দূতাবাসকে জানানো হয়। বুধবার বিকেলে দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কক্সবাজারে পৌঁছান।
তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের কারও কারও ভিসা থাকলেও সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আবার ১৩ বছর বয়সী রালফের ভিসা সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞাপন
ইউএনও জানান, আলবার্টের মরদেহের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর জীবিত থাকা পরিবারের সদস্যদের নিউজিল্যান্ড দূতাবাসের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, জীবিত উদ্ধার হওয়া তিন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক বর্তমানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া রালফ স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তারা ‘আইল্যান্ড গার্ল’ হাউসবোটে করে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার সময় তিনি ও তাঁর বাবা নৌযানের ডেকে ছিলেন। আর তাঁর মা ত্রিপলের নিচে ছোট ভাই আলবার্টকে লাইফ জ্যাকেট পরাচ্ছিলেন। হঠাৎ নৌযানটি দুই টুকরো হয়ে যায়।
রালফের ধারণা, ওই সময় আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপ ঠিকভাবে আটকানো ছিল না। তিনি আরও জানান, তাঁর ভাই সাঁতার জানত না।
প্রায় আড়াই বছর ধরে কক্সবাজারের আশপাশের নদী ও সমুদ্রপথে তারা বোটে অবস্থান করছেন বলেও জানান রালফ।
বিজ্ঞাপন
এদিকে আলবার্টের মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের বাকি সদস্যদের নিরাপত্তা ও আইনগত বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে তাদের হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও চলছে।








