Logo

কাজ নেই, ওষুধের টাকাও নেই: রাস্তার পাশে বৃদ্ধ সিরাজের জীবনসংগ্রাম

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:১৪
কাজ নেই, ওষুধের টাকাও নেই: রাস্তার পাশে বৃদ্ধ সিরাজের জীবনসংগ্রাম
ছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক সড়কের পাশে ছোট্ট একটি বটগাছের নিচে বসে থাকেন ৭০ বছরের বেশি বয়সী সিরাজ। কখনো পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কখনো আবার গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে কাটিয়ে দেন দীর্ঘ সময়। পাশে পড়ে থাকে পুরোনো যন্ত্রপাতি ভর্তি একটি সাদা বস্তা। কেউ কাজ দিতে আসবেন—এই আশায় ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত সড়কের পাশে বসে থাকেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

কটিয়াদী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বপাড়া মহল্লার বাসিন্দা সিরাজ। তিনি মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের ব্যবহার বাড়ায় তার পুরোনো পেশায় এখন আর আগের মতো কাজ নেই। ফলে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েও জীবিকার জন্য প্রতিদিন রাস্তার পাশে বসতে হচ্ছে তাকে।

জানা গেছে, প্রায় ৩৫ বছর কটিয়াদী থানার সামনে সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করেছেন সিরাজ। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে চড়িয়াকোনা মোড়ে সড়কের পাশে বসে একই কাজ করছেন। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। সবাই বিবাহিত। গত কোরবানির ঈদের পর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বর্তমানে ছোট ছেলের সঙ্গে বসবাস করছেন তিনি।

তবে সংসারে বসে থেকে সন্তানদের ওপর নির্ভর করতে চান না সিরাজ। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে সামান্য হলেও আয় করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বর্তমানে সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ অনেক কমে যাওয়ায় তার আয়ও কমে গেছে। কোনো দিন ৮০ থেকে ১৫০ টাকা আয় হয়, আবার কোনো দিন কাজ না থাকায় খালি হাতেই ফিরতে হয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যেই শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বৃদ্ধ সিরাজ। প্রতিদিন প্রায় ৪০ টাকার ওষুধ প্রয়োজন হয়। নিয়মিত ইনহেলারসহ বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করতে হয় তাকে। কিন্তু সামান্য আয়ে সংসার চালানোর পর ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

বৃদ্ধ সিরাজের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বয়সের বিভ্রাট। তার প্রকৃত বয়স ৭১ বছর হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স উল্লেখ রয়েছে ৬১ বছর। এ কারণে সরকারি বয়স্ক ভাতাও পাচ্ছেন না তিনি।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা যায়, পৌর এলাকার চড়িয়াকোনা কাঠমহাল মোড়ে একটি ছোট বটগাছের নিচে এবং বিদ্যুতের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে আছেন সিরাজ। পাশে রাখা সাদা বস্তায় রয়েছে সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। ভোর ৭টার দিকে কাজে এসে সকাল ১০টা পর্যন্ত তার আয় হয়েছে মাত্র ২০ টাকা। তবুও কাজের আশায় সড়কের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন তিনি।

প্রতিদিন ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত একইভাবে সময় কাটে সিরাজের। জীবনের নানা কথা বলতে গিয়ে মুখে হাসি ফুটলেও তার চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের অভাব আর অসহায়ত্বের ছাপ।

স্থানীয় অটোরিকশাচালক আব্দুল মতিন বলেন, সিরাজ চাচা খুব সহজ-সরল মানুষ। একসময় তার কাছে সাইকেল ও রিকশা মেরামতের অনেক কাজ আসত। এখন এসব কাজ কমে গেছে। তারপরও তিনি প্রতিদিন এখানে এসে বসেন। নিজের অভাব-অনটনের কথা কাউকে বলতে চান না। অসুস্থ শরীর নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছেন তিনি। সরকারি সহায়তা ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে তার উপকার হবে।

বিজ্ঞাপন

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে সিরাজ বলেন, শরীরে অনেক রোগ আছে। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মতো টাকাও নেই। একবার ডাক্তার দেখানোর পর শ্বাসকষ্টের ওষুধ দিয়েছেন, প্রতিদিনই সেগুলো খেতে হয়। সন্তানদের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চান না বলেই নিজের জানা কাজটি করে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, কাজ তো আর কিছু জানা নাই। তাই এই কাজ নিয়েই বসে আছি। আল্লাহ কপালে যা রেখেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট। ভালো থাকি কিংবা কষ্টে থাকি—জীবন তো চলবেই।

বয়সের ভার, অসুস্থতা, কমে যাওয়া কাজ এবং চিকিৎসার ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিদিন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন বৃদ্ধ সিরাজ। তবুও কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শেষ সম্বল পুরোনো পেশাটিকে আঁকড়ে ধরে জীবনের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD