রাশিয়ায় চাকরির আশায় গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ গেল মামুনের

অভাবের সংসারে স্বস্তি ফেরানোর স্বপ্ন ছিল আল মামুনের। বিদেশে গিয়ে আয় করবেন, পরিবারের ঋণ শোধ করবেন, ভাঙা ঘরের জায়গায় পাকা বাড়ি করবেন—এমন প্রত্যাশায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ করে তাকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। কিন্তু ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরির আশায় রাশিয়ায় যাওয়া সেই তরুণের শেষ ঠিকানা হয়েছে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র।
বিজ্ঞাপন
পরিবারের দাবি, চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়ার পর রুশ ভাষায় লেখা একটি চুক্তিতে সই করিয়ে মামুনসহ বাংলাদেশিদের রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হয় যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। সেখানে ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হয়েছেন বলে পরিবারকে জানিয়েছেন একই দলের আরেক বাংলাদেশি রাজন হোসেন।
আল মামুনের বয়স ২৪ বছর। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে তিনি। দেশে ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করতেন। স্ত্রী মহিমা আক্তার, চার বছর ছয় মাস বয়সী ছেলে আরিয়ান মাহমুদ মাহিন ও পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে আরিশফাকে রেখে গত ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি।
মামুনের পরিবারের ভাষ্য, রাশিয়ায় গিয়ে ইলেকট্রিকের কাজ করার কথা ছিল তার। দুই-তিন বছর কাজ করে ঋণ পরিশোধের পর দেশে ফিরে পাকা ঘর তৈরির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা বদলে যায়।
বিজ্ঞাপন
ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরির বদলে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ
পরিবারের সদস্যরা জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার পর ব্যাংক কার্ড ও মুঠোফোনের সিম দেওয়ার কথা বলে মামুনসহ বাংলাদেশিদের একটি চুক্তিতে সই করানো হয়। চুক্তিটি রুশ ভাষায় লেখা থাকায় তারা এর বিষয়বস্তু বুঝতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, সেটি ছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন জানান, তাদের দলে মোট ৩০ বাংলাদেশি ছিলেন। ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরির কথা বলে তাদের রাশিয়ায় নেওয়া হলেও পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তিতে সই করানো হয়।
রাজন বলেন, ৮ মে তারা রাশিয়ায় পৌঁছান। কয়েক দিন পর ১২ মে ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ড ও ‘আকামা’ দেওয়ার কথা বলে তাদের চুক্তিতে সই করানো হয়। পরে তারা বুঝতে পারেন, সেটি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি।
বিজ্ঞাপন
এরপর তাদের একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারও ১০ দিন, কারও ১৫ দিন এবং সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ চলে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় বলে জানান রাজন।
তার দাবি, ১২ জুন তাদের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। ১৪ জুন ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের কেউ ড্রোন হামলায়, আবার কেউ মাইন বিস্ফোরণে মারা যান বলে দাবি করেন তিনি।
সেই হামলায় রাজন নিজেও আহত হন। তার ভাষ্য, মাথার ওপর ড্রোন ও বোমার বিস্ফোরণের পর তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
‘মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে’
রাশিয়ায় যাওয়ার পর স্ত্রী মহিমা আক্তারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে না পারলেও ভয়েস বার্তা ও ছবি পাঠাতেন মামুন। সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট তিনি একটি ভয়েস বার্তা পাঠান। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মহিমা জানান, যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা স্বামী তাকে জানিয়েছিলেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, আমার স্বামী বলেছিল, তার মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে, কখন কী ঘটে বলা যায় না। সন্তানদের দেখে রাখার কথাও বলেছিলেন।

মামুনের মৃত্যুর খবর পরিবার পায় মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর)। পরিবারের সদস্যদের দাবি, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন।
রাজন জানান, আহত অবস্থায় হাসপাতাল থেকে পালিয়ে তিনি ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। পরে রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতায় ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন।
বিজ্ঞাপন
তার দাবি, তাদের দলের বাংলাদেশিদের বিষয়ে তথ্য জানার সুযোগ ছিল একজন রুশভাষী কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণে। ওই কমান্ডারের কাছ থেকেই তিনি মামুনের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
রাজন বলেন, কমান্ডার আমাকে জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ড্রোন হামলায় মামুন মিয়া মারা গেছে। এরপর আমি তার পরিবারকে খবর দিয়েছি।
রাজনের দাবি, একই ফ্লাইটে যাওয়া ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নিহত হয়েছেন। আরও কয়েকজনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
পাঁচ মাসের মেয়েকে রেখে গিয়েছিলেন বিদেশে
মামুনের ছোট মেয়ে আরিশফার বয়স এখন পাঁচ মাস। মেয়েটির বয়স যখন মাত্র দেড় মাস, তখনই বিদেশে পাড়ি দেন তিনি।
পরিবারের আশা ছিল, বিদেশে কাজ করে সংসারের অভাব দূর করবেন মামুন। ঋণ পরিশোধ করে ভাঙা ঘরের জায়গায় পাকা ঘর করবেন। কিন্তু এখন স্ত্রী, দুই সন্তান ও মাকে রেখে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
মহিমা আক্তারের অভিযোগ, তার স্বামী যুদ্ধ করতে রাশিয়ায় যাননি। ইলেকট্রিকের কাজের কথা বলেই তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল। দালালের প্রতারণার কারণে মামুনসহ একই দলের ৩০ বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি তার।
মহিমা বলেন, আমার দুইটা সন্তান। ওদের দেখার মতো আর কেউ নাই। স্বামীই একমাত্র ছিল। এখন আমি কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। চোখভরা স্বপ্ন আর আশা নিয়ে ওকে রাশিয়ায় পাঠাইছিলাম। এখন শুধু স্বামীর লাশটা দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে চাই।
বিদেশ পাঠাতে ঋণ ও গরু বিক্রি
বিজ্ঞাপন
মামুনকে রাশিয়ায় পাঠাতে পরিবারের প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এই অর্থ জোগাড় করতে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি ধানের ওপর দাদন এবং গরু বিক্রি করতে হয়েছে পরিবারকে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। ধানের ওপর প্রায় চার লাখ টাকা দাদন নেওয়া হয়। বাকি অর্থ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার এবং গরু বিক্রি করে জোগাড় করা হয়।
রোকেয়া খাতুনের কাছে ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর সেই অর্থ এখন ঋণের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলে নেই, কিন্তু ঋণ রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমার একমাত্র ছেলে বিদেশ গেছিল নিজের ভাগ্য বদলানোর জন্য, আমাদের ভালো রাখার জন্য। সাড়ে ৮ লাখ টাকা ঋণ করে দিছি। এখন ছেলেই নাই। নাতি-নাতনিদের কীভাবে বড় করব, জানি না।
মামুনের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময়, কোথায় তিনি মারা গেছেন কিংবা তার মরদেহ বর্তমানে কোথায় রয়েছে—এসব বিষয়ে পরিবার নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মামুনের পরিবারের পক্ষ থেকে মিলাদের আয়োজন করা হয়। বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনরা রান্নাবান্নার আয়োজন করছেন। পাশের ঘরে বসে কাঁদছিলেন মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার।
মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেও মেলেনি সমাধান
মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তার খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার। তিনি জানান, প্রায় দুই বছর আগে মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন ভিসা না হওয়ার পর ‘জাবাল-এ নূর’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা হয়। এরপর ৭ মে রাশিয়ায় যান মামুন।
কোবিলা আক্তারের দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার পর মামুনদের রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে সই করানোর বিষয়টি জানতে পেরে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন। সেখানে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না।
আরও পড়ুন
তবে পরিবারের অভিযোগ, এরপরও সমস্যার সমাধান হয়নি। তারা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করেন। এমনকি মামলা করার জন্য থানায়ও যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানান কোবিলা। তার দাবি, ‘জাবাল-এ নূর’ এজেন্সির মাধ্যমেই প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
কোবিলা আক্তারের দাবি, ৩০ বাংলাদেশিকে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল।
এখন অপেক্ষা শুধু মরদেহ ফেরার
মামুনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন রোকেয়া খাতুন। বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া ছেলে আর কখনো ফিরবেন না—এ বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
ছেলে কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে গেলেন, কোথায় মারা গেলেন কিংবা তার মরদেহ কোথায় রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা পরিবারের কাছে। তাদের এখন একমাত্র দাবি, যেভাবেই হোক মামুনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক এবং যারা প্রতারণার মাধ্যমে তাকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলেকে যে দালাল বেইচা দিছে, এই দালালের বিচার চাই। সরকারের কাছে এই আবেদন।’
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি তার পরিবার মৌখিকভাবে জানিয়েছে। পরিবারকে লিখিত আবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, লিখিত আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।








