Logo

১০ বছরের কষ্টের সঞ্চয় জর্দার কৌটায়, খুলে দেখলেন সব শেষ

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
শেরপুর
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:০৮
১০ বছরের কষ্টের সঞ্চয় জর্দার কৌটায়, খুলে দেখলেন সব শেষ
ছবি: সংগৃহীত

সংসারের খরচ মেটানোর পর সামান্য সামান্য করে প্রায় ১০ বছর ধরে জর্দার কৌটায় টাকা জমিয়েছিলেন মনোয়ারা বেগম ও তার স্বামী জিয়া উদ্দীন। কখনো খুচরো টাকা, আবার কখনো এক হাজার টাকার নোটও সেই কৌটায় জমিয়েছেন তারা। এভাবে দীর্ঘদিনের কষ্টের উপার্জন থেকে গড়ে তুলেছিলেন প্রায় ২ লাখ টাকার সঞ্চয়। তবে প্রয়োজনের সময় সেই সঞ্চয়ের টাকা বের করতে গিয়ে চোখে পানি এসে যায় মনোয়ারার। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কৌটা খুলে দেখা যায়, ভেতরে থাকা টাকাগুলো পচে, ঝাঁঝরা হয়ে একেবারে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

মনোয়ারা বেগম শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোড-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। মাত্র তিন মাস আগে তার স্বামী জিয়া উদ্দীন মারা যান। এরই মধ্যে অনেক কষ্ট করে দুই মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন তিনি। স্বামীকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্বও অনেকটাই তার ওপর এসে পড়ে। কিন্তু জীবিকার পথও এখন প্রায় বন্ধ। এমন কঠিন সময়ে শেষ সম্বল হিসেবে জমিয়ে রাখা প্রায় ২ লাখ টাকা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোয়ারা বেগম ভোগাই নদী থেকে বালু-পাথর তুলে বিক্রি করে সংসারে সহযোগিতা করতেন। তার স্বামী জিয়া উদ্দীন ছিলেন মিষ্টি তৈরির কারিগর। দুজনের কষ্টের উপার্জনেই চলত সংসার। সেই আয় থেকে প্রয়োজন মেটানোর পর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রায় এক দশক ধরে টাকা জমাতে থাকেন তারা।

এভাবে ধীরে ধীরে তাদের সঞ্চয় বাড়তে থাকে। প্রায় আট মাস আগে সেই সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু তিন মাস আগে স্বামী জিয়া উদ্দীনের মৃত্যু হলে মনোয়ারার জীবনে নেমে আসে আরও কঠিন সময়। অন্যদিকে ভোগাই নদীতেও আগের মতো পাথর না থাকায় তার সেই কাজ থেকেও আয় বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি জরুরি প্রয়োজনে জমানো টাকা বের করতে জর্দার কৌটাটি খুলতে যান মনোরা। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় কৌটির মুখ খুলছিল না। পরে কৌটার মুখ কেটে টাকা বের করার পর তিনি দেখতে পান, ভেতরে থাকা নোটগুলো পচে-ঝাঁঝরা হয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। প্রায় ১০ বছরের কষ্টের সঞ্চয় মুহূর্তেই তার কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোড-সংলগ্ন এলাকায় মনোয়ারা বেগমের বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। শেষ সম্বল হারানোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার স্বামী মারা গেছেন তিন মাস হইলো। অনেক কষ্টে দুইটা মেয়েরে বিয়া দিছি। আগে তো ভোগাই নদী থাইকা পাথর তুইলা বিক্রি কইরা দিন চালাইতাম। অহন তো নদীতে পাথরও নাই। আল্লাহ আমার শেষ সম্বলটারেও এভাবে নষ্ট কইরা দিল। অহন তো আমার আর কোনো পথ নাই।

তিনি বলেন, এই টাকাডা আছিল আমার শেষ সম্বল। স্বামী নাই, কামকাজও নাই। ১০ বছর ধরে একটু একটু কইরা টাকা জমাইছি। ভাবছিলাম, বিপদের সময় এই টাকাডা কাজে লাগামু। অহন সব শেষ হইয়া গেল। অহন আমি কী করমু?

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুব রহমান বলেন, মনোয়ারা ও তার স্বামী জিয়া দুজনই খুব কষ্ট করে সংসার চালাইতেন। জিয়ার মৃত্যুর পর অভাবের সংসারে টাকা নষ্ট হওয়ার কথা শুনে সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছি। তাদের বাসায়ও গিয়েছিলাম। মনোয়ারা এখন শুধু কাঁদেন।

প্রতিবেশী জুমন মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন কষ্ট করে জমিয়ে রাখা ওই টাকা মনোয়ারা বেগমের কাছে শুধু অর্থ ছিল না, বরং স্বামী মারা যাওয়ার পর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা ছিল। সংসারের দুর্দিনে ওই সঞ্চয়টুকুই ছিল তার আশার জায়গা। সেই সঞ্চয়ও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

এ বিষয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মালেক বলেন, মনোয়ারা বেগমের টাকা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছেন। আইনিভাবে এ বিষয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। তবে মনোয়ারা বেগম যদি উপজেলা প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চান, তাহলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD