Logo

মায়ের কবরের পাশে দুই শিশুর নির্বাক চাহনি দেখে কাঁদছে মানুষ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৮:৩৯
মায়ের কবরের পাশে দুই শিশুর নির্বাক চাহনি দেখে কাঁদছে মানুষ
যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, মায়ের কবরের পাশে দুই শিশু সন্তানের নির্বাক চাহনি।

বাকেরগঞ্জের দুধল ইউনিয়নের পশ্চিম সরসী গ্রামের মিনারা বেগম ১৬ বছর আগে স্বামী নিজাম হাওলাদারকে হারিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যের বাড়ি বাড়ি কাজ করে চার সন্তানকে লেখাপড়া করিয়েছেন। মেজ মেয়ে মুক্তা ইসলামকে এইচএসসি পাশ করানোর পরে পাশের ইউনিয়ন দাড়িয়ালের সোহেলের সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ দেন।

বিজ্ঞাপন

আট বছরের স্বামীর সংসারে মুক্তা দুই সন্তানের মা হলেও সেই স্বামীর হাতেই নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। মা মিনারা বেগম মেয়েকে হারিয়ে পাগল প্রায়, মেয়ের কবরের উপর বারবার শুয়ে পড়ে একটাই শুধু আর্তনাদ জানান, ‘আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি ও আল্লাহ তুমি এই চোখের পানির বিচার তুমি করো ও আল্লা।’ মেয়ে হত্যার বিচার ফাঁসির দাবি জানিয়ে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন কবরের উপরে শুয়ে পড়ে। সন্তান হারা মা মিনারা গেমগের আর্তনাদ দেখে আকাশ বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে।

মুক্তা ইসলামের মা মিনারা বেগম বলেন, যৌতুকের টাকা না পেয়ে পরকীয়ার সম্পর্কের অভিযোগ তুলে তার মেয়েকে নির্যাতন ও পিটিয়ে হত্যা করে স্বামী সোহেল সিকদার৷

আর এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার খিলক্ষেত নিকুঞ্জ ২ ভাড়া বাসায় গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই তানভির রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করলে পুলিশ অভিযুক্ত স্বামী সোহেলকে আটক করেছেন।

বিজ্ঞাপন

স্বামী সোহেল স্ত্রীকে নির্যাতনের মুহূর্তে নিজ হাতে মোবাইলে একটি ভিডিও ধারণ করেন যেই ভিডিওটি বৃহস্পতিবার রাতে মুক্তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। যেই ভিডিওটি মুক্তার মৃত্যুর পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায় সোহেল তার স্ত্রীকে নিজের পরনে থাকা প্যান্টের বেল্ট দিয়ে পিটিয়ে মুখে বলছেন তোকে সারা জীবন ভালোবেসেছি তুই ভালোবাসার প্রমাণ এভাবে দিলি। কয়দিন করছো কথা ক তোরে কিন্তু মেরে ফেলবো তোরে পিটিয়ে পিটিয়ে আজকে মেরে ফেলবো ক কয়দিন করছো ক।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ সময় মুক্তা কান্না জড়িত কন্ঠে বলে, তোমারই ভালোবাছি আমি কিছু করিনাই। সোহেলের সময় বলতে থাকেন কয় করছি আমি, তোকে আমি ছাড়বো না ছাড়বো সেটা আমার বিবেচনা। ক কয়দিন করছো ক তার হাতে থাকা বেল্ট দিয়ে পিটাতে থাকে। তুই আমারে এমনে ঠকাইলি।

নিহত গৃহবধূ মুক্তা ইসলাম বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সরসী গ্রামের মৃত নিজাম হাওলাদারের মেঝো মেয়ে। আট বছর আগে সোহেলের সাথে পারিবারিকভাবে তার বিবাহ হয়। তার সংসারে পাঁচ বছর বয়সী ছেলে সাফওয়ান ও চার বছরের কন্যা শিশু তাসফিয়াকে রেখে গেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর অবুঝ দুই শিশুকে কবরের পাশে বসে থাকতে দেখে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। আর এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে কেঁদেছেন হাজারো মানুষ।

বিজ্ঞাপন

নিহত মুক্তার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর দাঁড়িয়াল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর কাজলাকাঠি গ্রামের আলতু সিকদারের ছেলে সোহেল সিকদারের সঙ্গে মুক্তার বিয়ে হয় ৮ বছর আগে। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে মুক্তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, যৌতুকের টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মুক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে পরকীয়ার সন্দেহের অভিযোগ তুলে মুক্তাকে বেধড়ক মারধর করেন সোহেল। এ সময় দুই শিশু সন্তানও ঘটনাস্থলে ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

স্বজনদের আরও অভিযোগ, মারধরের ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। একপর্যায়ে মুক্তার মৃত্যু হলে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দিতে রুমের মধ্যে সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না দিয়ে টাঙিয়ে রাখা হয়।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর মুক্তার বড় ভাই বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ অভিযুক্ত সোহেল শিকদারকে আটক করে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ময়নাতদন্ত শেষে মুক্তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের পর বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম সরসী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

মুক্তাকে হারিয়ে তার মা মিনারা বেগম যেমন সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়েছেন, তেমনি মাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে তার দুই শিশুসন্তান। মায়ের কবরের পাশে বসে থাকা পাঁচ বছরের সাফওয়ান ও চার বছরের তাসফিয়ার নির্বাক চাহনি এখন স্বজনদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে গেছে—মাকে হারানো এই দুই শিশুর ভবিষ্যৎ এখন কার হাতে?

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD