Logo

টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কে গর্তের ছড়াছড়ি, স্থায়ী সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
গাজীপুর সদর, গাজীপুর
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৭
টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কে গর্তের ছড়াছড়ি, স্থায়ী সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর কাছাকাছি হওয়ায় টঙ্গী-কালীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কটি গাজীপুরসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও খানাখন্দে বর্তমানে সড়কটির বিভিন্ন অংশে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

সড়কের কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। আবার কোনো কোনো স্থানে গর্তে ইট ও সুরকি ফেলে সাময়িকভাবে চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বৃষ্টির পানিতে সেই উপকরণ সরে যাওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতে স্থায়ী সংস্কারের পরিবর্তে বারবার এমন অস্থায়ী মেরামতের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই থেকে তিন বছর ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশে একই ধরনের সমস্যা চলছে। সময় সময় গর্ত মেরামত করা হলেও কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে সড়ক। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।

মঙ্গলবার সড়কটির কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে অনেক গর্ত পুরোপুরি পানিতে ঢেকে আছে। ফলে গর্তের গভীরতা কতটা, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকছে না।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের মতে, মরকুন এলাকায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সামনের অংশ, সিলমুন বাজার, নিমতলী ব্রিজের আশপাশ এবং বসুগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছের অংশে সড়কের পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি খারাপ।

গর্তে ভারী যানবাহন পড়লে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি সৃষ্টি হচ্ছে। বিপরীতে ছোট যানবাহনগুলোকে গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে কখনো মূল সড়কের অন্য পাশে চলে যেতে হচ্ছে। বৃষ্টির সময় এই পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সড়কের খানাখন্দের কারণে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। কোনো চালক গর্ত এড়িয়ে যেতে গতি কমালে বা পাশ কাটিয়ে চললে পেছনে থাকা গাড়িগুলোকেও ধীর হতে হচ্ছে। একপর্যায়ে এভাবেই দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের দাবি, স্বাভাবিক সময়ে যে পথ অতিক্রম করতে প্রায় ৩০ মিনিট লাগার কথা, যানজটের কারণে অনেক সময় সেই পথ পাড়ি দিতে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কোনো কোনো দিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

এর ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও পরিবহনশ্রমীরা। দীর্ঘ সময় যানবাহন আটকে থাকায় যাত্রার সময় বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সড়কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অটোরিকশাচালক মনু মিয়া। তিনি বলেন, সড়কের গর্তের কারণে প্রায়ই অটোরিকশার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে।

তার ভাষ্য, প্রতিদিন কয়েকটি ট্রিপ দেওয়ার পরই গাড়িতে কোনো না কোনো সমস্যা দেখা দেয়। এতে একদিকে আয় কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে গাড়ি মেরামতের পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, মাঝেমধ্যে গর্তে ইট-সুরকি দেওয়া হলেও বৃষ্টি হলে সেগুলো আবার সরে যায়।

তার মতে, বছরের পর বছর একই ধরনের অস্থায়ী মেরামতের পরিবর্তে এবার সড়কটির স্থায়ী সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে নিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরাও সমস্যায় পড়ছে। উত্তরা রাজউক কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আজমাইন জানান, প্রতিদিন কলেজে যাতায়াতের জন্য তাকে এ সড়ক ব্যবহার করতে হয়।

তিনি বলেন, সড়কের গর্তের কারণে যানবাহনের গতি কমে যায় এবং অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে কলেজে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজিবাইক গর্তে পড়লে সেটি ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয়দের একাংশের মতে, সড়কটির সমস্যা শুধু পিচ উঠে যাওয়া কিংবা গর্ত সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সড়কের পাশে কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকা এবং সমস্যাগ্রস্ত অংশে বারবার সাময়িক মেরামত করায় পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) টঙ্গী পূর্ব থানার সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রকৌশলী শেখ সাদী দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বেহাল অবস্থা দেখছেন বলে জানান। তার দাবি, সড়কটি আরসিসি করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বাজেটের কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই উদ্যোগ কার্যকর হয়নি।

একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি বিষয়টি বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছেন বলেও জানান।

শেখ সাদীর ব্যাখ্যা, বৃষ্টির পানি বিটুমিনের নিচে ঢুকে গেলে সড়কের নিচের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর গর্তে ইট-সুরকি দিয়ে সাময়িকভাবে তা ভরাট করা হলেও পানির চাপে সেগুলো সরে যায়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই গর্ত আবার বড় হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

তিনি জেটিআই গেট থেকে নিমতলী রেলগেট পর্যন্ত অংশে টেকসই আরসিসি সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে আরসিসি ড্রেন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন।

স্থানীয়দের মধ্যে সড়কটি প্রশস্ত করে চার লেনে উন্নীত করার দাবিও রয়েছে। টঙ্গীর সিলমুন এলাকার বাসিন্দা ও মানবাধিকারকর্মী মাসুম রানা বলেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে। ফলে এটি শুধু স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের পথ নয়, আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে।

গাজীপুর মহানগরীর ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জাকির হোসেন সরকারও সড়কটির প্রশস্তকরণ এবং স্থায়ী সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, উত্তরার দিক থেকে পূবাইলে আসার সময় যানজটে অনেক সময় দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়। এ কারণে কখনো কখনো তাকে বিকল্প হিসেবে ৩০০ ফিট সড়ক ব্যবহার করে ঘুরে আসতে হয়।

টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কটি শুধু গাজীপুরের স্থানীয় যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যানবাহনও এ সড়ক ব্যবহার করে।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকার যানবাহন এ পথ দিয়ে চলাচল করে।

বিজ্ঞাপন

ফলে সড়কের খানাখন্দের প্রভাব স্থানীয় যাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। আঞ্চলিক পরিবহনব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়ছে। যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় বাড়ছে যাত্রার সময় ও পরিবহন ব্যয়।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের সমস্যা চলার পরও কেন স্থায়ীভাবে সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে না। তাদের মতে, গর্তে ইট-সুরকি ফেলে সাময়িকভাবে যান চলাচল সচল রাখা সম্ভব হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ একটি আঞ্চলিক সড়কের ক্ষেত্রে বারবার একই পদ্ধতিতে মেরামত করার বদলে সড়কের মূল কাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করে টেকসই সংস্কার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সড়কের বিটুমিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষাকালে স্থায়ী সংস্কারের কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

তার দাবি, সড়কটির স্থায়ী মেরামতের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে বর্ষায় সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোতে আপাতত ইট-সুরকি দিয়ে সাময়িক সংস্কার করা হচ্ছে। বর্ষার মৌসুম শেষ হলে সড়কটির স্থায়ী সংস্কারের কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন এই সওজ কর্মকর্তা।

সওজের পক্ষ থেকে স্থায়ী সংস্কারের আশ্বাস পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা এবার শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব কাজ দেখতে চান।

স্থানীয়দের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়কের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু গর্ত ভরাট করলেই হবে না। প্রয়োজন সড়কের স্থায়ী কাঠামোগত সংস্কার, কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ যানবাহনের চাপ বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

কারণ সড়কের প্রতিটি গর্তের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি সরাসরি জড়িয়ে আছে। কোথাও এতে শিক্ষার্থীর সময় নষ্ট হচ্ছে, কোথাও পরিবহনশ্রমিকের আয় কমছে, আবার কোথাও যাত্রীদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

এখন স্থানীয়দের অপেক্ষা—ইট-সুরকির সাময়িক জোড়াতালি পেরিয়ে টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কে কবে বাস্তবায়ন হবে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কার।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD