Logo

শৈশবের পরিচিত লজ্জাবতী হারাচ্ছে প্রাকৃতিক আবাসস্থল

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:১৭
শৈশবের পরিচিত লজ্জাবতী হারাচ্ছে প্রাকৃতিক আবাসস্থল
ছবি: সংগৃহীত

একসময় গ্রামের রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা পতিত জমিতে আপনমনে বেড়ে উঠত লজ্জাবতী। পরিচর্যার প্রয়োজন না থাকলেও প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা ছোট্ট এই গাছটি ছিল গ্রামীণ জনপদের পরিচিত উদ্ভিদ। স্পর্শ করলেই পাতাগুলো দ্রুত গুটিয়ে নেওয়ার বৈশিষ্ট্যের কারণে শিশু-কিশোরদের কাছেও ছিল এর আলাদা আকর্ষণ।

বিজ্ঞাপন

তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে ব্রাহ্মণপাড়ার গ্রামীণ পরিবেশ। বাড়িঘর নির্মাণ, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত চাষাবাদ, আগাছানাশকের ব্যবহার এবং রাস্তার পাশ নিয়মিত পরিষ্কার করাসহ নানা কারণে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় কমে যাচ্ছে লজ্জাবতীর বিস্তার। একসময় যেসব জায়গায় সহজেই গাছটির দেখা মিলত, এখন সেসব স্থানেও অনেক সময় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

লজ্জাবতী একটি ছোট কাঁটাযুক্ত গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Mimosa pudica। গাছটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো স্পর্শ বা আঘাত পেলে এর পাতাগুলো দ্রুত গুটিয়ে যাওয়া। এই স্বভাবের কারণেই বাংলায় এর নাম হয়েছে ‘লজ্জাবতী’। বর্ষা ও শরৎকালে ছোট গোলাপি ফুল ফুটলে গাছটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘদিন ধরে লজ্জাবতী লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গাছটির শিকড়, পাতা ও অন্যান্য অংশ নিয়ে বিভিন্ন ভেষজ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে লোকজ ব্যবহারের এসব তথ্যকে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। কোনো রোগের চিকিৎসায় গাছটির ব্যবহার করার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

বিজ্ঞাপন

ব্রাহ্মণপাড়ার কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা জানান, কয়েক দশক আগেও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে রাস্তার পাশে, বাড়ির আশপাশে ও অনাবাদি জমিতে প্রচুর লজ্জাবতী দেখা যেত। শিশুরা খেলাচ্ছলে গাছটির পাতায় হাত দিয়ে ‘লজ্জা পাওয়া’ দেখত। বর্ষার পর সবুজ পাতার মাঝে গোলাপি ফুলে ভরে উঠত অনেক জায়গা।

স্থানীয়দের মতে, কৃষিজমিতে আগাছানাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি জমি ও রাস্তার পাশ পরিষ্কার করার সময় নির্বিচারে আগাছা ও ছোট উদ্ভিদ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে লজ্জাবতীর মতো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা দেশীয় উদ্ভিদের বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বসতবাড়ি ও কৃষিজমি সম্প্রসারণের কারণে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠার জায়গাও কমে এসেছে।

উদ্ভিদপ্রেমীদের মতে, লজ্জাবতীর মতো দেশীয় উদ্ভিদ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়ায় না, স্থানীয় জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। এসব উদ্ভিদ সংরক্ষণে বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারের অনাবাদি জায়গা ও পতিত জমিতে নির্বিচারে গাছপালা পরিষ্কার না করে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে দেশীয় ও ঔষধি উদ্ভিদ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

ব্রাহ্মণপাড়ার প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসা লজ্জাবতী তাই শুধু একটি ছোট উদ্ভিদ নয়; এটি গ্রামীণ প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও বহু মানুষের শৈশবস্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও পরিচিত থাকবে গ্রামবাংলার এই চেনা উদ্ভিদ।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD