বর্ষা শেষ হলেও থামেনি পদ্মার তীব্র ভাঙন

বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও ফরিদপুরের সদরপুরে পদ্মার ভাঙন থামেনি। তীব্র স্রোতে নদীতীরের বসতভিটা, ফসলি জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জীবিকার নানা অবলম্বন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন করে আতঙ্ক।
বিজ্ঞাপন
সদরপুর উপজেলার পদ্মাতীরবর্তী ঢেউখালী, আকোটেরচর ও দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী, বেপারীডাঙ্গী ও মুন্সিরচর, আকোটেরচরের ছলেনামা, কালিখোলা, মোল্যাকান্দা ও খালাসীগ্রাম এবং দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়ার নুরুদ্দীন সরদার কান্দি, আব্দুল হামিদ জঙ্গির কান্দি, আলেফ সরদার কান্দি ও জব্বার শিকদার কান্দি এলাকায় নদীর তীব্র স্রোতে পাড় ভাঙছে।
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের কারণে ইতোমধ্যে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও বহু বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, একটি ইটভাটা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অংশ। তাদের হিসাবে, শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ভাঙনের আশঙ্কায় অনেক পরিবার ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ এরই মধ্যে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে আকোট জনসংঘ উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিয়াজখালী বাজার, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রাম ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বেপারীডাঙ্গী গ্রামের ৯০ বছরের বেশি বয়সী হাসমত বেপারী নদীভাঙনে বারবার বসতভিটা হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জীবনে আটবার ঘর তুলেছি। সবই গিলে খেয়েছে পদ্মা। এই বয়সে এসে আর নতুন করে কিছু করার শক্তি নেই। বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসায় উঠেছি।’
বিজ্ঞাপন
আকোটেরচর ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা লিটন হোসেন বলেন, ‘এই সময় এলেই আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। পানি বাড়লেই ভাঙন শুরু হয়। বর্ষা চলে গেলেও ভাঙন এখনো থামেনি। সরকার আমাদের থাকার জায়গা দিয়েছে, এই ঘরবাড়িই এখন আমাদের শেষ সম্বল।’
দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নুরুদ্দীন সরদার কান্দির বাসিন্দা রাজা মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছরই নদীভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে আমাদের। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। ভাঙন শুরু হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেভাগেই টেকসই নদীশাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে স্থায়ী নদীশাসনের দাবি জানানো হলেও কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
আকোটেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসলাম বেপারী বলেন, ‘নদীভাঙন এখন আর হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো দুর্যোগ নয়, এটি একটি বার্ষিক দুর্যোগে রূপ নিয়েছে।’ তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি একাধিকবার জানানো হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুনাহার জানান, ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা ও ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ শাওন বলেন, পদ্মার ভাঙনের বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন জানান, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এসব এলাকায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে এবং স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শিগগিরই গ্রহণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম খান বাবুল বলেন, নদীভাঙন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আপাতত বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর কাজ চলছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় স্থায়ী নদীশাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভাঙনকবলিত মানুষের দাবি, ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি নিরাপদ বসতি ও ফসলি জমি রক্ষায় স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। তাদের প্রত্যাশা, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর বাঁধ ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।








