২০ টাকায় খিচুড়ি-পরোটা, শিক্ষার্থীদের ভরসা ছাবেদের ক্যান্টিন

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে মাত্র ২০ টাকায় খিচুড়ি, পরোটা, ডাল ও রুটি খাওয়াচ্ছেন ছাবেদ আলী। শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে প্রায় এক বছর ধরে কম দামে খাবার বিক্রি করছেন তিনি। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা সাশ্রয়ী মূল্যে দুপুরের খাবার পাচ্ছে, অন্যদিকে সীমিত আয়ে কোনোরকমে চলছে ছাবেদের সংসার।
বিজ্ঞাপন
বিদ্যালয়ের মূল ফটকের ভেতরে অবস্থিত ক্যান্টিনটির নাম ‘খাদ্য ছাঁয়া স্কুল ক্যান্টিন’। দুপুর হলেই সেখানে ভিড় জমে শিক্ষার্থীদের। কেউ খিচুড়ি, কেউ পরোটা কিংবা রুটি কিনে খায়। মাত্র ২০ টাকায় খাবার পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছে ক্যান্টিনটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে ছাবেদ আলীর নিজের জীবনটা মোটেও স্বচ্ছল নয়। আগে গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনে রান্নার কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সব হারিয়ে এখন শৌলমারী বাজারের পাশে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। তার বসতভিটার পরিমাণ ছিল মাত্র দুই শতক, সেটিও ছিল অন্যের জমি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে তার।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় প্রায় এক বছর আগে বিদ্যালয়ের মূল ফটকের ভেতরে ক্যান্টিন চালুর সুযোগ পান ছাবেদ আলী। সেই থেকে ক্যান্টিনটি তার কর্মস্থল। নিজের আয়ের পথ তৈরি করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য কম দামে খাবারের ব্যবস্থা করেন তিনি।
তবে ২০ টাকায় খাবার বিক্রি করে তেমন লাভ থাকে না। খিচুড়ি, পরোটা, ডাল ও রুটিসহ বিভিন্ন খাবার তৈরির উপকরণ, রান্না ও পরিবেশনের খরচ রয়েছে। বর্তমানে ক্যান্টিনে ছয়জন কর্মচারী কাজ করেন। তাদের বেতনসহ সব ব্যয় মেটানোর পর হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না।
বিজ্ঞাপন
তারপরও কম দামে খাবার বিক্রি বন্ধ করেননি ছাবেদ আলী। বিদ্যালয় চলাকালে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ১০০ শিক্ষার্থী তার ক্যান্টিনে খাবার খায়। এ সময় শুধু শিক্ষার্থীদেরই খাবার দেওয়া হয়। ক্লাস শেষ হলে বাইরের ক্রেতাদের কাছে খাবার বিক্রি করেন তিনি। তাদের কাছ থেকে পাওয়া আয় দিয়েই সংসারের খরচ সামলানোর চেষ্টা করেন।
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফেরদৌস শাহারিয়ার জানায়, শিক্ষার্থীদের যেন খাবারের জন্য বাইরে যেতে না হয়, সে জন্যই ক্যান্টিনটি চালু করা হয়েছে। এখানে ২০ টাকায় ভালো খাবার পাওয়া যায়।
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন জানায়, ক্যান্টিনের খাবারের মান ভালো। মাঝে মাঝে খাবারে ছাড়ও দেওয়া হয়। বাজারে যে খাবারের দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, তা এখানে ২০ টাকায় পাওয়া যায়। এমনকি ২০ টাকায় মাংসের খিচুড়িও মেলে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক উপকারী।
বিজ্ঞাপন
ক্যান্টিনের উদ্যোক্তা ছাবেদ আলী বলেন, “বাইরের খাবারগুলো সব সময় মানসম্মত পাওয়া যায় না। আগে বিভিন্ন বাড়িতে অনুষ্ঠানে রান্না করে বেড়াতাম। পরে এলাকাবাসী আমাকে এখানে এনে ক্যান্টিন করার সুযোগ করে দিয়েছে। আমি নিজেও কিছুটা পঙ্গু।”
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, “খিচুড়ি, পরোটা, ডাল, রুটি বা অন্যান্য খাবার ২০ টাকায় দিলেও এতে আমার লাভ হয় না। অনেক সময় কেউ ২০ টাকার খাবার ১০ টাকাতেও খায়। তবে স্কুলের সময়ের বাইরে অন্য ক্রেতারা আসেন। তখন যে লাভ হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলছে। আমার সংসারও ছোট।”
চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যালয়ে একটি ক্যান্টিন চালুর পরিকল্পনা ছিল। বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা ছাবেদ আলী একজন অসহায় মানুষ হওয়ায় ২০২৫ সালের শেষ দিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে তার মাধ্যমে ক্যান্টিনটি চালু করা হয়।
তিনি জানান, ক্যান্টিনটির স্বত্বাধিকারী বিদ্যালয় হলেও এটি পরিচালনা করেন ছাবেদ আলী। ক্যান্টিন চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অল্প দামে খাবার খেতে পারছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ক্যান্টিনটি তদারকি করে। আশপাশের অন্যান্য হোটেলের তুলনায় এখানকার খাবারের মানও ভালো বলে দাবি করেন তিনি।








