২০ বছরেও চালু হয়নি স্কুল, অব্যবহৃত পড়ে আছে ভবন

নির্মাণের প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার রসিকপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রায় ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিদ্যালয়টির ভবন দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় নষ্ট হচ্ছে অবকাঠামো ও বিভিন্ন সরঞ্জাম। অন্যদিকে, আশপাশের চার গ্রামের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করতে যেতে হচ্ছে ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ে।
বিজ্ঞাপন
রসিকপুর, রতনপুর, ঢোলমারি ও পরানপুর গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য কাছাকাছি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় নিয়মিত যাতায়াতে সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং বখাটেদের উৎপাত নিয়েও উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। এ অবস্থায় দ্রুত বিদ্যালয়টি চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রসিকপুর গ্রামের কাছেই প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বিদ্যালয়টির দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০০৬ সালে সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (সেসিপ) আওতায় ভবনটি নির্মিত হয়। জমিসহ তৎকালীন সময়ে এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮৫ লাখ টাকা। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে নির্মাণের পর থেকে বিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।
দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনটির বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। দরজা-জানালা নেই, উধাও হয়েছে বৈদ্যুতিক লাইট, ফ্যানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। আসবাবপত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মালামালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দূরের স্কুলে যাতায়াতে ভোগান্তি
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী হোসনে আরা জানায়, গ্রামে বিদ্যালয়ের ভবন থাকলেও সেখানে পড়ার সুযোগ নেই। তাই প্রতিদিন দূরের স্কুলে যেতে হয়। দীর্ঘ যাতায়াতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বর্ষাকালে এবং বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় ভয় লাগে বলে জানায় সে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
হোসনে আরা বলে, ‘আমাদের গ্রামে স্কুল থাকলেও সেখানে পড়াশোনা করতে পারছি না। দূরের স্কুলে যেতে হয়। প্রতিদিন এত দূর যাতায়াত করতে অনেক সময় লাগে। বর্ষার সময় ও বিকেলের দিকে বাড়ি ফেরার সময়ও ভয় লাগে। আমাদের দাবি, দ্রুত এই স্কুলটি চালু করা হোক।’
বিজ্ঞাপন
আরেক শিক্ষার্থী চামেলি খাতুন জানায়, দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের কারণে অনেক সহপাঠী নিয়মিত ক্লাস করতে পারে না। এতে যাতায়াতের খরচও বাড়ছে। বাড়ির কাছে বিদ্যালয়ের ভবন থাকা সত্ত্বেও সেখানে ক্লাস না হওয়াকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করে সে।
শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলে, বিদ্যালয়টি চালু হলে গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী উপকৃত হবে। বিশেষ করে ছাত্রীদের দূরে যাতায়াতের ঝুঁকি কমবে এবং নিয়মিত ক্লাস করার সুযোগ বাড়বে।
কোটি টাকার অবকাঠামো পড়ে থাকায় ক্ষোভ
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যালয়টি চালু না হওয়ায় শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, পুরো এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রসিকপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল আলম বলেন, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের সময় এলাকাবাসী আশা করেছিলেন, গ্রামের ছেলেমেয়েরা কাছেই পড়াশোনার সুযোগ পাবে। কিন্তু প্রায় ২০ বছর ধরে ভবনটি পড়ে থাকায় এখন এর বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এত টাকা খরচ করে ভবন নির্মাণ করে যদি ব্যবহারই না করা হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে।’
একই গ্রামের বাসিন্দা জিয়াউল ইসলাম বলেন, রসিকপুরসহ আশপাশের চার গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দূরের স্কুলে যাতায়াত করতে গিয়ে তাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে বিদ্যালয়টি চালুর দাবি জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
গ্রামের বাসিন্দা ওয়াজেদুল হকের ভাষ্য, জমি নিয়ে মামলা ছিল, পরে তা খারিজও হয়েছে। এরপরও বিদ্যালয় চালুর বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় না করে বিদ্যমান ভবন সংস্কার করে বিদ্যালয়টি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
মামলা খারিজের পরও চালুর উদ্যোগ হয়নি
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমিসংক্রান্ত মামলার কারণে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যালয়ের জন্য জমি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন জমিদাতা আম্বাকুন নেসা।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে মামলাটি খারিজ হয়। তবে এর মধ্যে ২০১৪ সালে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়টি আর চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে নির্মাণের পর থেকেই ভবনটি কার্যত ব্যবহারহীন অবস্থায় রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে মুজিবনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মামুন উদ্দিন আল আজিজ বলেন, ‘সরকারের বিশেষ আদেশের মাধ্যমে বিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বিদ্যালয়টি চালুর সুযোগ রয়েছে।’
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খান বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন পড়ে থাকা এবং শিক্ষার্থীদের কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিভাগ ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিনের অব্যবহারে সরকারি অর্থে নির্মিত ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর স্থানীয় শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে কাছাকাছি শিক্ষার সুযোগ থেকে। এখন বিদ্যালয়টি সংস্কার, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন ও একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ কত দ্রুত নেওয়া হয়, তার ওপর নির্ভর করছে চার গ্রামের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ।








