Logo

প্রস্তুত গাছিরা, শুরু হচ্ছে খেজুরের রস ও গুড় তৈরির মৌসুম

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
যশোর
১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪১
প্রস্তুত গাছিরা, শুরু হচ্ছে খেজুরের রস ও গুড় তৈরির মৌসুম
ছবি: সংগৃহীত

যশোরে শীতের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। শীত মৌসুমকে সামনে রেখে জেলার গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। কুড়াল, হাসুয়া ও দা হাতে খেজুরগাছ পরিচর্যার শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত তারা। গাছের ডালপালা ছেঁটে পরিষ্কার করা হচ্ছে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে। আর কিছুদিন পরই শীতের কনকনে সকালে গাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে মিষ্টি রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু খেজুরের গুড় ও পাটালি। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই দৃশ্য ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিজ্ঞাপন

যশোরের যশ, খেজুরের রস’—প্রচলিত এই প্রবাদ এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরলেও বাস্তবে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনশিল্প অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। যশোরের খেজুরের গুড় ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে বাগান সম্প্রসারণ ও গুড় উৎপাদন বাড়াতে দৃশ্যমান সরকারি উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

এর পাশাপাশি নিপাহ ভাইরাসের আতঙ্ক, নতুন গাছির সংকট এবং নির্বিচারে খেজুরগাছ কেটে ফেলার কারণে সম্ভাবনাময় এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ঐতিহ্যবাহী এই পেশার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পৃক্ততা কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তারপরও পূর্বপুরুষদের পেশাকে আঁকড়ে ধরে খাঁটি ও মানসম্মত গুড় উৎপাদনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় গাছিরা। চৌগাছার অভিজ্ঞ গাছি আব্দুল আলীম জানান, গত বছর তিনি ১১৭টি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করেছিলেন। সেই রস দিয়ে তৈরি গুড় ও পাটালি বিক্রি করে প্রায় ৯০ হাজার টাকা আয় করেন। পণ্যের গুণগত মান ভালো হওয়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো অর্ডারও পান তিনি।

বিজ্ঞাপন

একই উপজেলার তরুণ গাছি আবদুল কুদ্দুস জানান, প্রবীণদের কাছ থেকে শেখা এই পেশায় তারা ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি পণ্যের মান বজায় রাখতে চেষ্টা করছেন। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী খাঁটি গুড় সরবরাহ করাই তাদের লক্ষ্য।

তবে এই শিল্পের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি সহযোগিতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যশোরের একমাত্র বাণিজ্যিক খেজুরবাগানের মালিক মামুন কাউছার। তাঁর ভাষ্য, এ খাতে সরকারি সহায়তা প্রায় শূন্যের কোঠায়। খেজুরগাছের জন্য আলাদা প্রদর্শনী প্লট কিংবা পরিকল্পিত বাগান তৈরির উদ্যোগ নেই বললেই চলে। বর্তমানে যেসব বাগান গড়ে উঠেছে, সেগুলোর অধিকাংশই ব্যক্তিগত উদ্যোগে অথবা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

বাজারে ভেজাল গুড়ের দাপটের কারণে খাঁটি গুড় উৎপাদনকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন বলেও জানান তিনি। মামুন কাউছারের হিসাব অনুযায়ী, এক কেজি আসল খেজুরের গুড় তৈরি করতে প্রায় ১০ লিটার রস প্রয়োজন হয়। এতে উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা। গত বছর তিনি প্রতি কেজি খাঁটি গুড় ২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। অথচ বাজারে প্রতি কেজি ২৫০ টাকাতেও কথিত খেজুরের গুড় পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এত কম দামে বিক্রি হওয়া এসব পণ্যের অনেকগুলোই আসল খেজুরের গুড় নয়। ফলে ভেজাল পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে প্রকৃত উৎপাদকেরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। এ ছাড়া বর্তমানে খেজুরের গুড় রপ্তানিরও কোনো আইনি অনুমোদন নেই বলে তিনি জানান।

বিজ্ঞাপন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে যশোরে রস সংগ্রহের উপযোগী খেজুরগাছের সংখ্যা ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৬৬টি। এসব গাছ থেকে এবার ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ লিটার রস সংগ্রহ এবং ৩ হাজার ৯০ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, যশোরের খেজুরের গুড়ের যেমন সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। জিআই পণ্য হিসেবে নিরাপদ রস ও ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদনে গাছিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত গাছিদের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, যশোরের খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। খেজুরবাগান সম্প্রসারণ, নতুন গাছি তৈরি, নিরাপদ রস সংগ্রহ, ভেজাল প্রতিরোধ এবং উৎপাদকদের সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে। ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্যিক বাজার সম্প্রসারণেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD