বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় নতুন নাটকীয় মোড়

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে কারাবন্দি এক আসামি ও নিহতের স্ত্রীর কথিত ফোনালাপ। প্রায় ৯ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থের বিনিময়ে লোক নিয়োগ এবং ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিলেন, তা নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ উঠে এসেছে। বিশেষ করে নিহত বিএনপি নেতার ছোট ভাই আলমগীর শিকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় মামলাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে আলমগীর এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের দাবি করেছেন।
বিজ্ঞাপন
গত ১৫ জুলাই রাতে নিজ বাড়ির সামনে খুন হন মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে মো. হেলাল (২৫) নামের এক যুবককে আটক করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তিনি বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া এলাকার মৃত সুলতানের ছেলে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
সম্প্রতি হেলালের সঙ্গে নিহতের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর কথিত ফোনালাপের বিষয়টি সামনে আসে। ওই কথোপকথনের বর্ণনায় হত্যার উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সম্পর্কে নতুন কিছু দাবি করা হয়েছে। তবে অডিও রেকর্ডটির সত্যতা এবং এতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
হত্যা নয়, হাত কেটে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে দাবি
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদকের কাছে আসা কথিত ফোনালাপের বর্ণনা অনুযায়ী, হেলাল দাবি করেন, জাহাঙ্গীরকে সরাসরি হত্যা করার উদ্দেশ্যে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বরং তাঁর একটি হাত কেটে দেওয়ার জন্য অর্থের বিনিময়ে তাঁদের আনা হয়েছিল।
হেলালের অভিযোগ, জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর শিকদার এই কাজের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আলমগীরের নির্দেশ অনুযায়ী যেকোনো উপায়ে জাহাঙ্গীরের একটি হাত কেটে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। এতে জাহাঙ্গীরের মৃত্যু হলেও তা নিয়ে আপত্তি ছিল না বলেও কথোপকথনে অভিযোগ করা হয়।
হেলাল আরও দাবি করেন, তাঁরা পেশাদার হত্যাকারী নন। অতীতে চুরি, ছিনতাই ও মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থের প্রলোভনে পড়ে তাঁরা এই ঘটনায় অংশ নেন।
বিজ্ঞাপন
তবে জাহাঙ্গীরকে হত্যা করা তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল না বলে কথিত ফোনালাপে দাবি করেন হেলাল।
খোকার মাধ্যমে যোগাযোগের অভিযোগ
ফোনালাপের বর্ণনায় হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে খোকা নামে আরও এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
হেলালের দাবি, তাঁর বন্ধু রিয়াজের সঙ্গে খোকার মাধ্যমে আলমগীর শিকদারের যোগাযোগ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মিঠামইনে আনার ব্যবস্থা করা হয়।
কথিত কথোপকথনে হেলাল অভিযোগ করেন, কারাগারে খোকা নামে এক ব্যক্তি তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে এসে আলমগীরের নাম প্রকাশ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, যেন আলমগীরের নাম প্রকাশ না করা হয়। নাম প্রকাশ করলে জামিনের ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যা হতে পারে বলেও তাঁদের ভয় দেখানো হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
এমনকি আলমগীরের নাম উল্লেখ করায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও কথোপকথনে উঠে এসেছে।
হেলাল দাবি করেন, তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও আলমগীরের সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। তবে তাঁর এই দাবি আদালতের নথি কিংবা তদন্তসংশ্লিষ্ট কোনো স্বাধীন সূত্র থেকে নিশ্চিত করা যায়নি।
হত্যার আগে মিঠামইনে ১৫ থেকে ২০ দিন থাকার দাবি
বিজ্ঞাপন
কথিত ফোনালাপে হেলাল জানান, তিনি কারাগার থেকে সরাসরি মিঠামইনে আসেননি। ঢাকা থেকে সেখানে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে তিনি মিঠামইনে প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন অবস্থান করেন। এই সময়ের মধ্যে কারা তাঁকে সেখানে এনেছিলেন, কারা অর্থ দিয়েছিলেন এবং পরিকল্পনার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, সে সম্পর্কে ধারণা পান বলে দাবি করেন।
হেলাল আরও অভিযোগ করেন, আলমগীরের পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁদের খাবার ও অন্যান্য খরচের অর্থ দিতেন। ওই ব্যক্তির নাম মনে না থাকলেও শারীরিক গঠন সম্পর্কে কিছু বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। স্থানীয় অন্য একটি এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে ওই ব্যক্তির পরিচয়ও উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া রিয়াজের সঙ্গে আলমগীরের সরাসরি যোগাযোগ হতো বলে কথিত ফোনালাপে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ফোনালাপের কথা স্বীকার করলেন নিহতের স্ত্রী
বিজ্ঞাপন
কথিত ফোনালাপের বিষয়ে জানতে চাইলে নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ও মামলার বাদী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী জানান, স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, কারাগার থেকে একজন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান।
পরে ওই ব্যক্তি নিজেকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটক হেলাল হিসেবে পরিচয় দেন এবং তাঁদের মধ্যে কথোপকথন হয় বলে জানান তিনি।
তাসলিমার দাবি, ফোনালাপে হেলাল তাঁকে মিঠামইনে আসার কারণ, কার মাধ্যমে এসেছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, আলমগীর শিকদার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে তাঁদের পরিবার আগে থেকেই সন্দেহ করছিল।
তাসলিমা জানান, পরিবারের সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি চান।
আলমগীর শিকদারের সঙ্গে বর্তমানে কোনো যোগাযোগ নেই বলেও জানান তিনি। তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানা নেই বলে উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন
তাসলিমার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন আগে কারাগার থেকে হেলাল তাঁকে ফোন করেছিলেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে ষড়যন্ত্রের দাবি আলমগীরের
হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন নিহত জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর শিকদার।
প্রদত্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা চলছে।
আলমগীরের বক্তব্য, আটক ব্যক্তির জবানবন্দি আগেই গ্রহণ করা হয়ে থাকলে এত দিন পর নতুন করে এমন অভিযোগ সামনে আসার বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত।
আলমগীর জানান, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে থাকলেও দেশে ফিরে আসবেন। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফোনালাপে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। আলমগীরের দাবি, কথোপকথনে খোকার নাম এসেছে। ফলে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
নিহতের স্ত্রীর রাজনৈতিক পারিবারিক পরিচয় নিয়েও পাল্টা অভিযোগ করেছেন আলমগীর। তবে তাঁর এসব দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুই ভাইয়ের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধের দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, নিহত জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর এবং তাঁর ছোট ভাই আলমগীর শিকদারের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিরোধ ছিল। দীর্ঘদিনের এসব বিরোধের কারণে তাঁদের পারিবারিক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
তবে পারিবারিক মতবিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুধু বিরোধের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
১৫ জুলাই হত্যাকাণ্ড, ১৮ জুলাই মামলা
গত ১৫ জুলাই রাতে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে নিজ বাড়ির সামনে হত্যার শিকার হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। ঘটনার তিন দিন পর ১৮ জুলাই তাঁর স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়।
জাহাঙ্গীর দীর্ঘদিন ধরে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় জনতা হেলালকে আটক করে। পরবর্তী সময়ে তদন্তের অংশ হিসেবে আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়।
হত্যা মামলায় ১৫ জন আটক, তদন্তের দায়িত্ব ডিবির
মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
তিনি জানান, মামলাটির তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. দিদারুল ইসলাম জানান, অন্য একজনের মাধ্যমে তিনি কথিত ফোনালাপের বিষয়টি শুনেছেন। তবে তখন পর্যন্ত অডিও রেকর্ডটি নিজে শোনেননি।
বিষয়টি নিয়ে ডিবির তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। ফলে আলোচিত ফোনালাপটি তদন্তে নতুন কোনো তথ্য যোগ করবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভের ঘোষণা
নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে শনিবার (২৪ অক্টোবর) মিঠামইনে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। নতুন করে সামনে আসা কথিত ফোনালাপের কারণে মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তবে ফোনালাপের উৎস, কারাগার থেকে যোগাযোগের বিষয়টি, অডিওর সত্যতা এবং এতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বক্তব্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করতে হবে।
জাহাঙ্গীর হত্যা মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে ডিবির তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।








