স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় ১৫ বছর ধরে কবরস্থান পরিষ্কার করেন মওলা বক্স

দিনাজপুরের শহরের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা মোড়ে আধুনিক ভবন, সুউচ্চ সুপার মার্কেট আর বিত্তবৈভবের হাতছানি। তবে এসবের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ নেই ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মওলা বক্সের। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায়ও তাঁর প্রতিটি সকাল শুরু হয় প্রয়াত স্ত্রীর কবরের পাশে। গত ১৫ বছর ধরে প্রতিদিন সকালে নিজ হাতে স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন রাখছেন পুরো কবরস্থান।
বিজ্ঞাপন
মওলা বক্স দিনাজপুর জজ কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী। দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও প্রয়াত স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণার স্মৃতি তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর কবরস্থানে যান তিনি।
১৯৭০ সালে সামাজিক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক তরুণীকে বিয়ে করেন মওলা বক্স। তাঁর স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণা নিজের পরিবার, ধর্মীয় পরিচয় ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে মওলা বক্সের সঙ্গে সংসার শুরু করেন। দীর্ঘ চার দশকের দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং বাবার মতো আইন বিষয়ে এলএলবি সম্পন্ন করেছেন।
তবে ২০১১ সালে তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। স্ত্রীকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন মওলা বক্স। সেই শোককে সঙ্গী করেই শুরু হয় তাঁর নিয়মিত কবরস্থানে যাতায়াত।
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে কবরস্থানে গিয়ে স্ত্রীর আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করেন তিনি। এরপর নিজ হাতে পরিষ্কার করেন স্ত্রীর পাকা কবর। কবরের আশপাশে পড়ে থাকা শুকনো পাতা, ডালপালা ও আগাছা সরিয়ে রাখেন। একসময় স্ত্রীর কবর পরিষ্কারের পাশাপাশি পুরো কবরস্থানের হাঁটাচলার পথ ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গত ১৫ বছর ধরে ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীত—কোনো কিছুই তাঁর এই অভ্যাসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বলে জানা যায়। প্রতিদিনের এই কাজের মধ্যেই প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি খুঁজে পান মানসিক প্রশান্তি।
অ্যাডভোকেট মওলা বক্স শুধু একজন প্রবীণ আইনজীবী নন, বিরামপুর জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সভাপতি হিসেবেও তিনি পরিচিত। এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে আসছেন তিনি। তবে কবরস্থানে গেলে তাঁর পরিচয়ের ভিন্ন এক দিক সামনে আসে—সেখানে তিনি প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থাকা একজন স্বামী, যিনি নীরবে পরিচ্ছন্নতার কাজ করে যাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মওলা বক্স বলেন, ‘আমার প্রয়াত স্ত্রী সেদিন নিজের পরিবার, ধর্ম ও চেনা পরিবেশ ছেড়ে কেবল আমার ওপর বিশ্বাস রেখে ঘর বেঁধেছিল। তার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই। তার সেই আত্মত্যাগকে স্মরণ করেই প্রতিদিন কবরস্থানে আসি এবং নিজ হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করি।’
ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়।’
স্ত্রীর স্মৃতি ধরে রাখতে প্রতিদিন কবরস্থানে ছুটে যাওয়া মওলা বক্সের এই অভ্যাস যেন দীর্ঘ দাম্পত্যের ভালোবাসা আর হারানোর বেদনার এক নীরব প্রকাশ।
বিজ্ঞাপন








