কক্সবাজারে ৬ কোটি টাকার রিসোর্ট গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন চারতলা ‘বে হিলটন রিসোর্ট’ গুঁড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসন। প্রয়োজনীয় নির্মাণ অনুমোদনের কাগজপত্র দেখাতে না পারায় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নেতৃত্বে এ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। রিসোর্টটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও উদ্বোধনের আগেই সেটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরু হয়। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে প্রথমে সি-পার্ল হোটেলের দক্ষিণ পাশে নির্মিত বে হিলটন রিসোর্টটি ভেঙে ফেলা হয়। পরে আশপাশের আরও ৮ থেকে ১০টি দোকান উচ্ছেদ করা হয়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত হওয়ার নয় দিন পর এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো। ওই ঘটনার পর পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল ও রিসোর্টগুলোর অনুমোদন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কউকের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি বলেন, ইনানীতে উচ্ছেদ করা ভবনটি প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছিল। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভবনটিকে কেন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে মালিকপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করতে না পারায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে মেরিন ড্রাইভ এলাকার সব অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে রিসোর্টটির মালিক শহিদুল হক দাবি করেছেন, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমতি নিয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করেন তাঁরা। এতে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই রিসোর্টটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল তাঁদের।
বিজ্ঞাপন
মালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটির নিচতলায় কয়েকটি দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের থাকার জন্য কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু চালু করার আগেই ভবনটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
শহিদুল হক আরও দাবি করেন, তাঁরা চারটি নোটিশেরই জবাব দিয়েছেন এবং ভবন নির্মাণের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও রয়েছে। তবে তাঁর অভিযোগ, এসব নথি আমলে নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে কউকের বক্তব্য, ভবন নির্মাণের অনুমোদনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মালিকপক্ষ দেখাতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন
কউকের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুই পাশে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি রিসোর্ট নির্মাণে কউকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ এলাকায় তারকামানের মাত্র ২০ থেকে ২৫টি স্থাপনার নকশা অনুমোদন পেয়েছে বলে সংস্থাটির তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে দুই শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এসব স্থাপনার বেশিরভাগ কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এবং অনেকগুলোর অনুমোদনসংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও স্থাপনা অপসারণ না করায় যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।
গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর সামনে আসে, প্রতিষ্ঠানটি ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছিল। ভবনটির নকশার ক্ষেত্রে কউকের অনুমোদন ছিল না। ফায়ার সার্ভিস গত জুনে নোটিশ দিলেও প্রতিষ্ঠানটি তা আমলে নেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভ এলাকার অন্যান্য হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে উখিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু আব্দুল্লাহ, কউকের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি এবং সচিব সানজিদা বেগমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানে এসআরবি, পুলিশ, আনসার, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের শতাধিক সদস্য সহায়তা করেন।
মেরিন ড্রাইভ এলাকায় অনুমোদনহীন স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসনের এই অভিযান পর্যটন অবকাঠামোর নির্মাণ অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগের অংশ। তবে বে হিলটন রিসোর্টের মালিকের দাবি এবং কউকের বক্তব্যের মধ্যে অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।








