টুপটুটে নিহত ১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর, নিখোঁজ শিক্ষিকার দেহাবশেষ উদ্ধার

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ১০ দিন পর নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে কয়েক ঘণ্টার তল্লাশি শেষে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ থেকে তাঁর দেহাবশেষ উদ্ধার করে পুলিশ। গলায় থাকা লকেট দেখে স্ত্রীকে শনাক্ত করেন স্বামী দেওয়ান ফয়সাল।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনায় রিসোর্টটিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। এর আগে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ১০ জনের মরদেহ মঙ্গলবার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সোমবার রাতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ওই ১০ জনের পরিচয় শনাক্তের তথ্য জানায়। তবে তাঁদের মধ্যে নিখোঁজ শিক্ষিকা মুক্তা ছিলেন না। স্বজনদের ডিএনএর সঙ্গে পরীক্ষার নমুনার মিল না পাওয়ায় তাঁর পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
এরপর মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত পুড়ে যাওয়া রিসোর্টে নতুন করে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। ধ্বংসস্তূপের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ ছাড়াও আশপাশের নালা ও ঝোপঝাড়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। একপর্যায়ে উদ্ধার হয় মুক্তার দেহাবশেষ।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, সোমবার রাতে ডিএনএ পরীক্ষার অনানুষ্ঠানিক তথ্য থেকে একজনের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। এরপর মঙ্গলবার সকাল থেকে আবারও তল্লাশি শুরু করা হয়।
বিজ্ঞাপন
সৈকতে গিয়েছিলেন দুই বান্ধবী, কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন মুক্তা
নাসরিন আক্তার মুক্তা ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের আশুলিয়ায় অবস্থিত স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে তাঁরা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন।
মুক্তার স্বামী দেওয়ান ফয়সালের ভাষ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের দিন ভোরে মুক্তার দুই বান্ধবী সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে বের হয়েছিলেন। সে সময় মুক্তা রিসোর্টের কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন। বাইরে থাকায় তাঁর দুই বান্ধবী প্রাণে বেঁচে গেলেও আগুনের মধ্যে আটকা পড়ে আর বের হতে পারেননি মুক্তা।
বিজ্ঞাপন
এরপর থেকেই স্বজনেরা তাঁর খোঁজে অপেক্ষা করছিলেন। একে একে অন্য নিহতদের পরিচয় শনাক্ত হলেও মুক্তার সন্ধান মিলছিল না। অবশেষে ১০ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের গলায় থাকা লকেট দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন ফয়সাল।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর মুক্তার সন্ধান মিললেও স্বজনদের জন্য তা ছিল গভীর শোকের মুহূর্ত।
ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত ১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর
বিজ্ঞাপন
মুক্তার দেহাবশেষ উদ্ধারের দিনই আগে শনাক্ত হওয়া ১০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরের পর কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গের হিমঘর থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান।
নিহত ১০ জনের মধ্যে ঢাকার দুটি পরিবারের সদস্য রয়েছেন। তাঁদের একটি পরিবারের চারজন এবং অন্য পরিবারের ছয়জন।
চার সদস্যের পরিবারটির সদস্যরা হলেন শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
অন্য পরিবারের নিহত ছয়জন হলেন মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তাঁর কাজিন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫) ও ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তাঁরা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন।
বিজ্ঞাপন
নাফিস তেহামি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। মৌলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেস বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। অন্যদিকে, লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।
সিআইডি স্বজনদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ নমুনার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহের নমুনা মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে ১০ জনের মরদেহ তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
টানা ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর মুক্তার দেহাবশেষ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো। তবে স্বজনদের কাছে প্রিয়জন হারানোর বেদনা ও এই মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি দীর্ঘদিন থেকে যাবে।








