হোটেলে কাজ করেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫, চিকিৎসক হতে চায় কৌশিক

“ক্ষুধার জ্বালা কী জিনিস, তা হাড়ের ভেতর টের পেয়েছি। অটোরিকশার ভাড়াও ছিল না অনেক দিন, হেঁটে ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছি। কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি।”
বিজ্ঞাপন
অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে সাফল্য অর্জন করা তরুণ বিশাল সরকার কৌশিক আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন। কুড়িগ্রামের এই মেধাবী শিক্ষার্থী চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। তাঁর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, ঋণ, অনিশ্চয়তা আর নিরন্তর সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারসংলগ্ন অন্যের জমিতে ছোট্ট একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস কৌশিকদের পরিবারের। টিনের চালের অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। চারপাশে বাঁশঝাড়ঘেরা সেই ঘরেই বেড়ে উঠেছে তাঁর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।
কৌশিকের মা কণা রানী স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে স্বল্প বেতনে চাকরি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে বাবা সুকুমার সরকার সপ্তাহে দুই দিন হাটবারে খোলা আকাশের নিচে ছোট একটি চায়ের দোকান পরিচালনা করেন। তাতেও সংসারের অভাব মেটে না। এনজিও ঋণ ও কিস্তির চাপে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দারিদ্র্যের কারণে নবম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো প্রাইভেট বা কোচিং করার সুযোগ পাননি কৌশিক। বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট ও জুতো পরেই শুরু হয় তাঁর স্কুলজীবন। কিন্তু প্রতিকূলতা তাঁর পড়াশোনার আগ্রহ কমাতে পারেনি।
পড়াশোনার খরচ জোগাতে দিনের বেলা পড়াশোনা আর সন্ধ্যার পর হোটেলে কাজ করতেন কৌশিক। কখনো খাবার পরিবেশন, কখনো টেবিল পরিষ্কার, আবার কখনো থালাবাসন মোছার কাজ করেছেন। অন্য শিক্ষার্থীদের মতো খেলাধুলা কিংবা অবসর কাটানোর সুযোগ ছিল না তাঁর। অনেক দিন অর্ধাহারে-অনাহারে কাটলেও পড়াশোনার লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি।
তাঁর মেধা ও অধ্যবসায় দেখে কুড়িগ্রামের কয়েকজন মানবিক শিক্ষক এবং স্থানীয় শুভাকাঙ্ক্ষী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ ও তাঁদের সহায়তায় কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে ভালো ফল অর্জন করেন কৌশিক। এবার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
কৌশিকের এই সাফল্যে পরিবারের সদস্যদের চোখে আনন্দের অশ্রু। তবে সামনে মেডিকেলে ভর্তি ও পড়াশোনার ব্যয় কীভাবে বহন করবেন, তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বড় ভাই কর্ণ সরকার ও মা কণা রানী তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।
কৌশিকের স্বপ্ন সাদা অ্যাপ্রোন পরে চিকিৎসক হওয়া। অবহেলিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে চান তিনি। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দারিদ্র্যের অন্ধকার পেরিয়ে কুড়িগ্রামের এই তরুণের সাফল্য প্রমাণ করেছে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম প্রতিকূলতার মধ্যেও পথ তৈরি করতে পারে। তবে তাঁর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন প্রয়োজন আর্থিক সহযোগিতা ও মানবিক সমর্থন।
বিজ্ঞাপন
সমাজের বিত্তবান, মানবিক ব্যক্তি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কৌশিকের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, অর্থের অভাবে এই মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন থমকে না যায়। যথাযথ সহযোগিতা পেলে কৌশিক একদিন চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবেন।








