Logo

বান্দরবানে ইটভাটা বন্ধ, নির্মাণব্যয় বাড়ায় বিপাকে বাসিন্দারা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
বান্দরবান
৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১৩:৩৬
বান্দরবানে ইটভাটা বন্ধ, নির্মাণব্যয় বাড়ায় বিপাকে বাসিন্দারা
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত পার্বত্য জেলা বান্দরবানে নির্মাণসামগ্রীর সংকট, বাড়তি ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিজ্ঞাপন

জেলায় ইটভাটা স্থাপনের অনুমতি না থাকায় সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত নির্মাণকাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে স্থানীয়ভাবে ইট উৎপাদনের সুযোগ তৈরির দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, দেশের অন্যান্য জেলায় ইটভাটা থাকলেও বান্দরবানে কেন থাকবে না? পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি হলেও আধুনিক প্রযুক্তি ও নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় নিয়ন্ত্রিত ইটভাটা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, বান্দরবান সদর উপজেলার সোয়ালক, মাঝেরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়ের মাটি ও গাছ সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, কেরানীহাটসহ বিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। অথচ বাইরের এলাকায় উৎপাদিত ইট আবার বেশি দামে কিনে বান্দরবানে আনতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বান্দরবানে ইটভাটা না থাকার ফলে পরিবেশ সংরক্ষণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? পাহাড়ের মাটি ও গাছ অন্য এলাকায় ব্যবহৃত হলে নিষেধাজ্ঞার সুফল কারা পাচ্ছে এবং ক্ষতির বোঝা কারা বহন করছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

বান্দরবান সদর থেকে শুরু করে রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণে ইটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

কিন্তু স্থানীয়ভাবে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা না থাকায় বাইরের জেলা থেকে ইট সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও বাজারমূল্যের কারণে নির্মাণকাজে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হচ্ছে। এতে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাড়ি নির্মাণ ও সংস্কার আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের মতে, বান্দরবানের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে ব্যয় বেশি হয়। এ অবস্থায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর স্থানীয় ইট উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে উঠলে নির্মাণ খরচ কমানোর পাশাপাশি জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ইট উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে শ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, মাটি সরবরাহকারী, চালক ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবিকা জড়িত। কিন্তু বান্দরবানে স্থানীয়ভাবে ইটভাটা না থাকায় এ খাতকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় এ ধরনের কাজে যুক্ত থাকা অনেক মানুষ বর্তমানে বেকার সময় পার করছেন। কেউ কেউ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মতে, প্রতিটি উপজেলায় পরিকল্পিতভাবে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

লামা উপজেলার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, নিজের বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে বাইরে থেকে ইট আনতে হয়। ইটের দাম, গাড়িভাড়া ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে নির্মাণব্যয় অনেক বেড়ে যায়। বান্দরবানে যদি পরিবেশের ক্ষতি না করে নিয়ম মেনে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।

শ্রমিক বজলুল রশিদ বলেন, “কাজের সুযোগ থাকলে এলাকার মানুষকে বাইরে গিয়ে কাজ করতে হতো না। ইটভাটা চালু হলে শ্রমিক, গাড়িচালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট অনেক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো কাজ আমরা চাই না।”

রুমা উপজেলার মংক্যাচিং মারমা বলেন, আমাদের এলাকায় উন্নয়নকাজের পাশাপাশি মানুষের ঘরবাড়ি নির্মাণেও ইটের প্রয়োজন হয়। দূর থেকে ইট আনতে গিয়ে বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়। পরিবেশ রক্ষা করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য ভালো হতো।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় ব্যবসায়ী নোমান বলেন, বান্দরবানে নির্মাণকাজের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু ইটের জন্য বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সরবরাহ ও দামের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসবে।

বান্দরবানের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, নির্মাণসামগ্রীর সহজলভ্যতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব উঠেছে। জেলার কোন এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তুলনামূলক কম, কোথায় শিল্প স্থাপন করা সম্ভব এবং কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামাসহ পুরো জেলার উন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয়ভাবে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

পরিবেশ রক্ষার নামে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সম্ভাবনা যেন পুরোপুরি বন্ধ না হয়, আবার উন্নয়নের নামে পাহাড়-প্রকৃতিও যেন ধ্বংস না হয়—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা, পাহাড় ও পরিবেশ সুরক্ষিত রেখেই গড়ে উঠবে কর্মসংস্থান, নির্মাণশিল্প এবং উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD