Logo

সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়েও দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের বড় বড় বদ্বীপ

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২২ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:০৫
সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়েও দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের বড় বড় বদ্বীপ
ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ থাকলেও নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। নীল নদ, আমাজন ও গঙ্গার মতো বিশ্বের বৃহত্তম নদীগুলোর বদ্বীপ অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারের চেয়েও দ্রুতগতিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব বদ্বীপে ভূমি ক্ষয়, উপকূলীয় বন্যা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সাবসিডেন্স’ বা ভূমির অবনমন। অর্থাৎ সমুদ্র যত দ্রুত উঁচু হচ্ছে, তার চেয়েও দ্রুত হারে নিচের দিকে দেবে যাচ্ছে উপকূলীয় ভূমি।

গবেষকদের মতে, বদ্বীপ দেবে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নদীতে পলি প্রবাহ কমে যাওয়াও এই সংকটকে তীব্রতর করছে। সাধারণত নদীর মাধ্যমে পলি জমে বদ্বীপের ভূমি প্রাকৃতিকভাবে উঁচু হয়। কিন্তু বাঁধ ও নিয়ন্ত্রণমূলক অবকাঠামোর কারণে নদীতে পলির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে মাটির নিচের স্তরে চাপ সৃষ্টি হওয়ায় এই স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ভূমি দেবে যাওয়া—এই ‘দ্বিমুখী সংকটের’ মুখোমুখি। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জন্য ভয়াবহ বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ভিটেমাটি হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেকের জিওফিজিক্স ও রিমোট সেন্সিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষণার সহ-লেখক মানুচেহর শিরজাই এক ইমেইল বার্তায় লাইভ সায়েন্সকে বলেন, ‘‘আমাদের জানামতে, বিশ্বজুড়ে বদ্বীপগুলোর ভূমি দেবে যাওয়ার বিষয়ে এটিই এ পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত ও হাই-রেজোলিউশনের গবেষণা।’’

তিনি আরও জানান, আমরা যেসব বদ্বীপ বিশ্লেষণ করেছি, সেখানে দেখা গেছে যে মানুষের সৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের পরিবর্তনই ভূমি দেবে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শিরজাই এবং তার সহকর্মীরা ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৪০টি বড় নদী বদ্বীপে ভূমির অবনমন পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ কাজে তারা সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করেছেন। ১৪ জানুয়ারি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়, সেন্টিনেল-১ মূলত ভূমির উচ্চতার পরিবর্তন, পলি জমা এবং ভূমি ক্ষয়ের তথ্য সংগ্রহ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যালোচিত ৪০টি বদ্বীপের মধ্যে ১৮টিই বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে ৪ মিলিমিটার (০.১৬ ইঞ্চি) হারে দেবে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির যে গড় হার, এটি তার চেয়েও বেশি। ফলে এই অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রের পানি বাড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে মাটি নিচের দিকে দেবে যাচ্ছে।

গবেষণায় আরও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রিও গ্রান্দে বদ্বীপ বাদে পর্যালোচিত বাকি সবকটি বদ্বীপেরই কোনো না কোনো অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারের চেয়ে দ্রুতগতিতে দেবে যাচ্ছে। ৩৮টি বদ্বীপের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সেগুলোর অর্ধেকেরও বেশি (৫০ শতাংশ) এলাকা গবেষণাকালীন সময়ে নিচু হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ, নীল নদ ও মিসিসিপি বদ্বীপসহ ১৯টি বদ্বীপের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকাই বর্তমানে অবনমনের (সাবসিডেন্স) শিকার। অর্থাৎ এসব অঞ্চলের প্রায় পুরো অংশই ধীরে ধীরে নিচের দিকে দেবে যাচ্ছে।

গবেষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে থাইল্যান্ডের চাও ফ্রায়া, ইন্দোনেশিয়ার ব্রান্তাস এবং চীনের ইয়োলো রিভার বদ্বীপ। এসব অঞ্চলে ভূমি দেবে যাওয়ার বার্ষিক গড় হার প্রায় ৮ মিলিমিটার (০.৩ ইঞ্চি), যা বর্তমান বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারের দ্বিগুণ।

গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক শিরজাই দুটি প্রধান দিকের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রথমত, বর্তমান বদ্বীপগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চেয়ে ভূমি দেবে যাওয়ার বিষয়টিই বেশি প্রভাব ফেলছে। এর অর্থ হলো, কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, উপকূলীয় ঝুঁকি তার চেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

শিরজাই আরও বলেন, ‘‘দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি বড় অসমতা লক্ষ্য করা গেছে। যেসব বদ্বীপ সবচেয়ে দ্রুতগতিতে তলিয়ে যাচ্ছে, সেসব অঞ্চলে প্রতিকার বা অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে কম।’’

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৩৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন (৩৫ থেকে ৫০ কোটি) মানুষ নদী বিধৌত বদ্বীপ অঞ্চলে বসবাস করেন। বিশ্বের ৩৪টি মেগাসিটির মধ্যে ১০টিই এসব বদ্বীপে অবস্থিত। এ ছাড়া বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও এসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। ফলে ভূমি দেবে যাওয়া এবং সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলরেখা ছোট হয়ে আসা ও ঘন ঘন বন্যার মতো দুর্যোগের ঝুঁকি এখন অপরিসীম।

বদ্বীপ অঞ্চলগুলোর বিশাল জনসংখ্যা নিজেই এখন ভূমি দেবে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান নগরায়নের ফলে সুউচ্চ ভবন ও অবকাঠামোর বিপুল ওজন মাটির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে, যা মাটির স্তরকে সংকুচিত করে ফেলছে। এ ছাড়া বিশাল জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, যা মাটির গভীরের স্তরগুলোকে আরও দ্রুত দাবিয়ে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক শিরজাই বলেন, ‘‘দ্রুত নগরায়ন হওয়া বদ্বীপগুলোতে শহরগুলোর সম্প্রসারণ ভূমি দেবে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে। কেবল শহর নয়, বরং কৃষি ও শিল্পসহ সব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনই বিশ্বব্যাপী বদ্বীপ দেবে যাওয়ার প্রধান কারণ।’’

তিনি আরও যোগ করেন, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন যে স্থানীয়ভাবে ভূমি দেবে যাওয়ার কারণ, তা আগে থেকেই জানা ছিল। তবে এবারের গবেষণায় অবাক করার মতো তথ্য হলো—বিশ্বজুড়ে মানুষের তৈরি অন্যান্য সব কারণের মধ্যে পানি উত্তোলনই সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব বিস্তার করছে।

নদী দিয়ে আসা পলিপ্রবাহ কমে যাওয়াকে বদ্বীপ দেবে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, নদীর ওপর নির্মিত বাঁধ ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক অবকাঠামোর কারণে সাগরে আগের মতো পলি পৌঁছাতে পারছে না। স্বাভাবিক অবস্থায় এই পলি জমে বদ্বীপের উচ্চতা বাড়ে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভূমি দেবে যাওয়ার প্রভাবকে কিছুটা হলেও কমিয়ে রাখে। কিন্তু মানুষের তৈরি বিভিন্ন হস্তক্ষেপে এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

উদাহরণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, বাঁধ, কৃত্রিম বাঁধ এবং ভূমি ক্ষয়ের সম্মিলিত প্রভাবে ১৯৩২ সালের পর থেকে মিসিসিপি নদী বদ্বীপের প্রায় ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়ে গেছে।

তবে আশার আলোও আছে। অধ্যাপক শিরজাই মনে করেন, বদ্বীপ দেবে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো যেহেতু মানুষেরই তৈরি, তাই এটি নিয়ন্ত্রণের সুযোগও রয়েছে। তিনি বলেন, এই গবেষণার অন্যতম প্রধান বার্তা হলো—সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ভূমির এই অবনমন অনেক ক্ষেত্রেই রোধ করা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন অধ্যাপক শিরজাই। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, দেশগুলোকে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। এর বদলে বৃষ্টির পানি বা বন্যার পানি সংরক্ষণ এবং ব্যবহৃত পানি শোধন করে মাটির নিচের স্তরে (অ্যাকুইফার) পুনরায় প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

গবেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রিত বন্যা এবং পলি প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় পলি জমানোর হার বাড়ানো সম্ভব, যা ভূমি দেবে যাওয়ার গতি ধীর করবে। এ ছাড়া যেসব এলাকার মাটি বেশি দেবে যাচ্ছে, সেখানে ভারী অবকাঠামো নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপের পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

তবে গবেষকরা আশার কথাও জানিয়েছেন। অধ্যাপক শিরজাই বলেন, যেহেতু বদ্বীপ দেবে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো মানুষেরই তৈরি, তাই সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ সংকট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমানো, বৃষ্টির ও বন্যার পানি সংরক্ষণ, পরিশোধিত পানি পুনরায় মাটির নিচে প্রবেশ করানো এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে পলি প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভূমি অবনমনের গতি কমানো যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু অভিযোজন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে এসব উদ্যোগ যুক্ত করা গেলে বদ্বীপ অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

সূত্র : লাইভ সায়েন্স।

জেবি/এসডি
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD